পঞ্চু পিসে ছাতের পরে
ভূতের সাথে কুস্তি লড়ে!
রাত ঝমঝম অন্ধকার
হুতোম প্যাঁচা আম্পায়ার।
পঞ্চু পিসে মারল ল্যাং
মটকে গেল ভূতের ঠ্যাং।
ভূতটা তখন বললে কাঁদি
গোবর আনো–পট্টি বাঁধি!
এই য়ে করুণ পদটা–মানে, মটকে গেল ভূতের ঠ্যাং–এটাকে খাসা ত্ৰিতালে ফেলা যায়।–বলেই টকাটক সুটকেসে বাজাতে লাগলেন–না ধিনা ধিনা ধানা ধিনা–মানে, এই তালটা
ঠিক সেই সময় আচমকা গাড়ির ভেতরেও তাল পড়ল। মনে হল একটা নয়, এক কাঁদি এসে পড়ল!
বাঙ্কে যিনি ঘুমুচ্ছিলেন সেই মোটা ভদ্রলোক এক লাফে নেমে পড়েছেন। ইয়া তাগড়াই চেহারা, লাল টকটকে বড়-বড় চোখ রাগে দপদপ করে জ্বলছে।
ওভারকোটের তাল বাজানো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, মোটা ভদ্রলোক বাজখাঁই গলায় ওভারকোটকে বললেন বলি, কী হচ্ছে এসব? এর মানে কী? অনেকক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে সয়েছিলুম…সব কিছুর একটা সীমা আছে!
ওভারকোট কেমন সিঁটিয়ে গেলেন। চিঁ চিঁ করে বললেন–এদের একটু তাল শেখাচ্ছিলুম।
–তাল। ওর নাম তাল? আমি পুরুলিয়ার অরবিন্দ মাহাতো, মরিস কলেজে গান শিখেছি, কাশীর কণ্ঠে মহারাজার ছাত্র আমার সামনে তাল নিয়ে এয়ার্কি? এদের ছেলেমানুষ পেয়ে ওস্তাদি?
ধিনি কেটে ধা–কার্ফা? পাকা খেজুর খা–চৌতাল?
–আজ্ঞে
-শাট আপ!–মোটা ভদ্রলোক সিংহনাদ করলেন : তালের বিন্দুবিসর্গ জানেন আপনি? সাত বছর গুরুজীর পায়ের কাছে বসে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তাল শিখেছি–আর তাই নিয়ে নষ্টামো? মটকে গেল ভূতের ঠ্যাং ত্রিতাল? আর তাল হল লাঠির গাঁট? তবে লাঠির গাঁটই দেখুন…
বলেই মোটা লাঠিটা তুলে নিলেন বাঙ্ক থেকে।
–এইবার এই লাঠির এক-এক ঘায়ে এক-একটা তাল বোঝাচ্ছি, আপনাকে। দেখি, কোন তালে আপনি আছেন। প্রথমেই দাদরা
লাঠি তুললেন, কিন্তু দাদরা বাজানোর আর সময় পেলেন না। ওভারকোট তার মধ্যেই সুড়ৎ করে চলে গিয়েছেন দরজার কাছে। ট্রেন তখন একটা স্টেশনে থামতে যাচ্ছিল, এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়লেন প্ল্যাটফর্মে।
আমরা এতক্ষণ থ হয়ে যেন ম্যাজিক দেখছিলুম! এইবার হাবুল চেঁচিয়ে উঠল।–বুঝছি, বুঝছি–এইটার নাম ঝাঁপতাল!
তিন আনার আমের জন্যে
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি আর হারুবাবু ঝোলা-লাগানো আঁকশি দিয়ে একটার পর একটা পাকা আম পাড়ছেন। খাসা আমগুলো! এত দূরে দাঁড়িয়েও আমের গন্ধে আমার প্রাণমন উদাস হয়ে যাচ্ছে।
আর-একটা সোনালি রঙের আমকে ঝুড়িতে সাজিয়ে রেখে হারুবাবু বললেন, কী হে প্যালারাম, অমন জুলজুল করে তাকিয়ে দেখছ কী–অ্যাঁ?
আমি বললুম, কিছু না।
–কিছু না?–হারুবাবু এমন হেঁ হেঁ করে হাসলেন যে, আমার পিত্তি পর্যন্ত জ্বলে গেল; মিথ্যে নজর দিয়ে কষ্ট পাচ্ছ কেন শুনি? এ-আমগুলো বাজারে পাঠাব–টাকায় ছটা করে। বিক্রি হবে।
–হোক না বিক্রি–আমার কী? আমি ব্যাজার হয়ে জবাব দিলাম।
–তোমার কী? তা বটে। বেল পাকলে কাকের কিছু আসে যায় না বটে। হারুবাবুর মুখে আবার সেই গা-জ্বালানো হাসি।
আমার অপমানবোধ হল। হাঁড়ির মতো মুখ করে বললুম, ও-আম আমি খাই না।
–পেলে তো খাবে? যাও–যাও–মিথ্যে এখেনে দাঁড়িয়ে থেকে আর কষ্ট পেয়ো না–বলে আবার আঁকশি দিয়ে আর-একটা পাকা আম নামাতে লাগলেন।
আমি গেলুম না। বাগান হারুবাবুর বটে, কিন্তু রাস্তাটা তো মিউনিসিপ্যালিটির। সুতরাং আমি যতক্ষণ ইচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকব, যত খুশি নজর দেব। হারুবাবু বললেই যাচ্ছি আর কি। যেতে বয়ে গেছে আমার।
বিচ্ছিরি কিপটে এই লোকটা! টাকার আণ্ডিল–অথচ প্রাণে ধরে একটা পয়সা খরচ করবে না। আমাদের এই শহরে ভিখিরিরা পর্যন্ত ওঁর দোরগোড়ায় যায় না–পাছে ঝুলি ফেঁসে যায়। সরস্বতী পুজোর চাঁদা চাইতে গেলে বেরিয়ে আসে স্রেফ দুটো নয়া পয়সা। তা হলেই বোঝো।
হারুবাবু আমাকে আম খেতে দেবেন এ-আশা আমার কোনও দিনই ছিল না। কিন্তু অমন খাসা টুকটুকে আম–গন্ধে চারদিক ম-ম করছে, প্রাণভরে দেখতে দোষটা কী! আমিও তাই দেখছিলুম আর মনে মনে ভাবছিলুম, একটা নিরেট কাঁচা আম যদি অনেক উঁচু থেকে টপাক করে ওঁর টাকের ওপর পড়ে–বেশ হয় তা হলে!
এক-একটা করে পাকা আম হারুবাবুর আঁকশির ঝোলায় নামছে, আমি হাঁ করে দেখছি ঠিক তখন
রামছাগলটা কখন গুটিগুটি পায়ে ঝোপের আড়াল থেকে এগোচ্ছিল আমরা কেউই দেখতে পাইনি। কিংবা ছাগলের গতিবিধি কে-ই বা দেখতে পায়! ছোট ছোট চারটে পা, একগাল দাড়ি আর দু ইঞ্চি একটা ল্যাজ নিয়ে চিরকাল ওরা আমার কাছে এক দারুণ রহস্য। ওরা পৃথিবীর সব জিনিস খেয়ে থাকে, কিন্তু বাঘ ধরে খেতে পারে না কেন এবং বাঘেই বা পালটা ওদের ধরে খায় কেন–এ-সমস্যার সমাধান আমি কখনও করতে পারিনি।
হঠাৎ হারুবাবুর হায় হায় চিৎকারে আমার চমক ভাঙল।
ধরো ধরো প্যালারাম নিলে–আম নিয়ে গেল–তিন আনার আম নিয়ে গেল একটা–
তাকিয়ে দেখি সেই চিররহস্যময় ছাগল। একটা আম গালে পুরে সে ছুটছে, তার মিহি দাড়ি ফুরফুর করে উড়ছে হাওয়ায়, দু ইঞ্চি ল্যাজটা রেলের টিকিটের মতো উঁচু করে মেল ট্রেনের মতোই সে ধাবমান।
ধরো প্যালারাম–তারস্বরে ডাকলেন হারুবাবু। ছুটতে ছুটতে আমায় বললেন, ধরতে পারলে কেটে খাব ব্যাটাকে-তোমাকেও ভাগ দেব।
এটা ভালো প্রস্তাব। আমারও উৎসাহ এসে গেল।
কিন্তু ছুটন্ত ছাগলকে বিশেষ করে রামছাগলকে কে ধরতে পারে উড়ন্ত পাগল ছাড়া? আর পাগল কখনও উড়তে পারে কিনা তাতেও আমার সন্দেহ আছে। কারণ কোনও উড়ন্ত পাগল আমি কোনওদিন দেখিনি।
