আরও কার কার সব জবানবন্দি নিয়ে দারোগা চলে গেলেন। সঙ্গের নৌকোয় চলল কলাপাতা আর কয়লার গুঁড়ো দিয়ে জড়ানো একটা অদ্ভুত জিনিস। শুধু কলাপাতার ফাঁক দিয়ে তা থেকে খানিকটা জটবাঁধা এলোচুল বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। তারামাসিমার লাশ।
বলরামকাকা নাকি কী করে খবর পেয়ে দিন সাতেক পরে ফিরে এসেছিলেন। নৌকো থেকে নেমেই—কী সর্বনাশ হল বলে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পুরো তিন ঘণ্টা পরে তাঁর জ্ঞান ফিরে আসে।
দারোগা তাঁকেও ডেকে পাঠিয়েছিলেন গৌরনদী থানায়। বলরামকাকা কী বলে এলেন জানি না, দারোগাকে আরও বার দুই আমাদের গ্রামে দেখা গেল। তারপর সমস্ত ব্যাপারটাই ধামাচাপা পড়ল। আর গ্রামের লোকের মুখে নানা জল্পনা ক্রমে ফিকে হতে হতে শেষপর্যন্ত একেবারে মুছে গেল। তারামাসিমা বলে কোথাও যে কেউ ছিল, আর তার গলা কেটে খুন করে তাকে হোগলা-কলমির বনের তলায় পুঁতে দেওয়া হয়েছিল, সেই কথাটা পর্যন্ত হারিয়ে গেল গ্রাম থেকে।
আর আমার মনের সামনে ওই বাঁশবনটা যেন তার সমস্ত হিংস্র তাৎপর্যে স্পষ্ট হয়ে উঠল। সেই বনবেড়াল, সেই বেজির থাবায় খড়িশ গোখরোর রক্তমাখা ছেড়া ছেড়া শরীর, সেই দুপুরের ভূতুড়ে হাওয়ার শুকনো পাতা আর বাঁশের শব্দ, কখনো-বা ঘুণধরা বাঁশের ফুটো থেকে বাতাসের ধাক্কায় আর্তনাদের মতো একটা তীক্ষ্ণ ধ্বনি—সব মিলে একটা যোগফল টেনে আনল।
তারামাসিমার খুন।
এরপর থেকে ও-পথে চলাই আমি ছেড়ে দিলুম। নেহাত দরকার হলে দেড় মাইল ঘুরে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কাঠের সাঁকো পার হয়েছি, কিন্তু ওই বাঁশবন দিয়ে আর নয়। আমি জানতুম—যেকোনো নির্জন দুপুরে যেকোনো নিঃসঙ্গ বিকেলে একটা রাক্ষুসে দাঁড়কাক হঠাৎ খা-খা খা করে ডেকে উঠলে ওই বাগানের ভেতর তারামাসিমার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যেতে পারে। যে-তারামাসিমার গলার বারো আনা জবাই করার মতো কাটা, অথচ যার উগ্র নীল চোখ থেকে ঘৃণার হলকা ছুটে আসছে আমার দিকে।
এইখানেই পারুলকাকিমার সঙ্গে সম্পর্ক আমার শেষ হতে পারত। হল না।
আরও এক বছর পরে একটি রাত। এগারোটা বেজে গেছে, গ্রাম ঘুমিয়েছে অনেক আগেই। শুধু খালের ধারে ধারে চাপবাঁধা জোনাকি, দূরে দুটো-চারটে দপদপানো আলেয়া, কোথাও বাঁশের সাঁকোর ওপর এত রাতেও হঠাৎ কেউ পার হয়ে যাচ্ছে—তার টর্চের আলো। জলের শব্দ, নৌকোর শব্দ, খালের জলে নুয়ে-পড়া বনের ভেতর সাপ আর মাছের শব্দ, কুকুরের ডাক আর অনেক দূর থেকে চৌকিদারের আওয়াজ জাগো হো—জা-গো…।
আমি ঘাট থেকে খুলে নিয়েছি আমাদেরই একটা এক-মাল্লাই নৌকো। সেই নৌকোয় পারুলকাকিমা একা যাত্রী। আমি তাঁকে চুপি চুপি পৌঁছে দিতে চলেছি স্টিমারঘাটে। বলরামকাকা বেরিয়েছেন শিষ্যবাড়ি, সেই ফাঁকে কাকিমা এক বার মা-বাপকে দেখতে যাচ্ছেন।
আক্তারের হাতে চিঠি পাঠিয়ে আমাকে ডেকেছিলেন পারুলকাকিমা। যাব না বলে প্রতিজ্ঞা করেও না গিয়ে পারিনি। সেই দেড় মাইল পথ ঘুরেই আমি তাঁর কাছে গিয়েছিলুম।
পারুলকাকিমা বলেছিলেন, তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, কিন্তু এরপরে আর কোনো দিন জ্বালাব না। এবার শুধু একটুখানি উপকার কর আমার। তুই আমায় স্টিমারঘাটে পৌঁছে দে। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ আমি দত্তদের ঘাটলার কাছে হিজলতলায় দাঁড়িয়ে থাকব, তুই ডিঙি করে এসে আমায় তুলে নিবি।
আমার খটকা লেগেছিল, বাপের বাড়ি যাবেন, এত লুকিয়ে কষ্ট করে কেন? দরকার আছে। তুই বুঝতে পারবি না। আমি চুপ করে গিয়েছিলুম। পারুলকাকিমা আবার বলেছিলেন, তোর বুঝি সাহস হচ্ছে?
সাহস হচ্ছিল না সত্যি কথাই। বুঝতে পারছিলুম সমস্ত ব্যাপারটাই কেমন গোলমেলে।
তবু সেকথা আমি বলতে পারিনি। একটু পরে জবাব দিয়েছিলুম, আচ্ছা আসব।
চুপি চুপি বিছানা ছেড়ে উঠে চুরি করে ডিঙি নিয়ে এসেছিলুম। দূর থেকে দেখেছিলুম, দত্তদের হিজলতলায় অন্ধকারে একটা সাদা কাপড়পরা মূর্তি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক বারের জন্যে আমি চমকে উঠেছিলুম, এক বারের জন্যে মনে হয়েছিল কাছে গিয়ে যদি দেখি পারুলকাকিমার বদলে তারামাসিমাই ওখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন? যদি…
ঘাটে নৌকো ভিড়োতে প্রথমে আমার সাহস হয়নি। কিছুক্ষণ আমি ইতস্তত করেছিলুম। তারপর খালের পশ্চিম দিকে ডুবে-যাওয়া চাঁদের এক ঝলক রাঙা আলো হঠাৎ এসে হিজলতলায় পড়ল, আমি পারুলকাকিমাকে চিনতে পারলুম।
নৌকো কাছে এগিয়ে নিয়ে এলুম। সম্পূর্ণ পাড়ের কাছে আনবার আগেই পারুলকাকিমা এগিয়ে এলেন, উঠে পড়লেন পাটাতনে। শুধু একটি কথা বললেন, চল।
স্টিমারঘাটে যাব তো?
হুঁ, স্টিমারঘাট।
কিন্তু এত রাতে তো স্টিমার নেই।
সকালে আছে। রাতটা বসে থাকব ওখানেই।
খালের জলে জোয়ার-ভাটা থমথম করছিল। আমি বইঠাতে টান দিয়ে বললুম, কিন্তু কোথায় বসে থাকবেন কাকিমা? নদীর ধারে তো একটা চালাঘর ছাড়া কিছুই নেই। ঘাটবাবুর ঘর বন্ধ, সকালের আগে সে আসবে না।
চালাঘরেই বসে থাকব। নৌকোর ছইয়ে ঠেসান দিয়ে, হাতের ছোটো পুঁটলিটা কোলের ওপর রেখে পারুলকাকিমা বললেন, আমার কাছে এখন সব সমান।
বাপের বাড়ি যাওয়ার মতো গলার সুর এ নয়। সেই মুহূর্তে আমার মনে হল, খালের এই কালো জল যে-নদীতে গিয়ে পড়েছে, সে-নদী কোথায় কোন সমুদ্রে হারিয়ে গেছে সেকথা যেমন কেউ জানে না, তেমনি পারুলকাকিমার খলিশাকোটাও এই রাত্রে, এই অন্ধকারে যেখানে তলিয়ে আছে, বাখরগঞ্জ জেলার কোনো ভূগোল আজও তার সন্ধান পায়নি।
