চমকে বইঠা তুলে নিয়ে আমি বললুম, পারুলকাকিমা, ফিরে চলুন।
না।
আমার ভয় করছে।
তবে তুই নেমে চলে যা। আমি পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, নৌকো বাইতে জানি। আমিই নৌকো নিয়ে যাব।
এরপরে আর আমি কথা বাড়াইনি। খালের জলে ভাটার টান এসেছে, নৌকো এগিয়ে চলেছে, পশ্চিমের গাছপালার আড়ালে চাঁদ ডুব দিয়েছে। এখন জলের গন্ধ, কাদার গন্ধ, ভিজে গাছপালার গন্ধ, মাছের শব্দ, সাপের শব্দ, নৌকোর শব্দ, স্রোতের আওয়াজ, কুকুরের ডাক। চৌকিদারের হাঁক আর শোনা যায় না। আকাশে তারা জ্বলছে, ঝোপে জোনাকি জ্বলছে, কিন্তু বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে টর্চ হাতে আর কেউ পার হয়ে যাচ্ছে না।
এখন শুধু আমাদের ডিঙা। আমি, পারুলকাকিমা আর রাত্রির পৃথিবী।
বাঁকের পর বাঁক পেরিয়ে ওই অন্ধকারের ভেতরেও নদীর সাদা বুকটা সামনে জ্বলে উঠল। বইঠার আরও কয়েকটা টানে আমি একেবারে নদীর ভেতরে এসে পড়লুম। ঘুমন্ত গ্রামের ভেতর থেকে কুকুর ডেকে উঠল, নৌকোর সামনেই আমাকে চমকে দিয়ে পর পর দুটো শুশুক উলসে গেল।
নদীর ওপার নিশ্চিহ্ন, এপারের কালো কালো গাছপালার সার নিথর। কী আশ্চর্য রাত! এত বড়ো নদীর বুকেও এতটুকু হাওয়া নেই, চারদিক যেন নিশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে। জলের ওপর অসংখ্য তারা দুলছে, ফুলছে। ভেঙে ভেঙে একাকার হয়ে যাচ্ছে। আমি ভাটার টানে নৌকো ছেড়ে দিয়ে হাল ধরে বসে আছি। যেন নদী নয়, অদৃষ্টের স্রোত আমাদের টেনে নিয়ে চলেছে।
এতক্ষণ পরে পারুলকাকিমা আবার কথা কইলেন।
যেদিন সমস্ত রাত ওর রক্তমাখা কাপড় কেচেছিলুম, সে-রাতও এমনি…
আমার হাতের হাল কেঁপে উঠল, একটা দারুণ ঝাঁকুনি লাগল নৌকোয়। কোথা থেকে মস্ত একটা কাঠের গুড়ি এসে ডিঙিতে ধাক্কা দিয়েছে। আমি বললুম, পারুলকাকিমা?
পারুলকাকিমা প্রায় নিঃশব্দ গলায় বললেন, কী করব বল? তান্ত্রিক স্বামীর পুণ্যের ভাগ নিতে হবে না?
আমার মাথার ভেতরে বিদ্যুৎ চমকে গেল। তবে কি বলরামকাকাই তারামাসিমাকে…
পারুলকাকিমা জবাব দিলেন না।
কিন্তু বলরামকাকা যে শিষ্যবাড়িতে…
সন্ধে বেলা লুকিয়ে চলে এসেছিলেন। দিদিকে বলেছিলেন, তোমাকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়ে কিছুদিন রাখব যেখানে কেউ জানতে পারবে না। তন্ত্রসাধনার ফল ফলেছিল কিনা— দিদি যে ওঁর ভৈরবী হয়েছিল। পারুলকাকিমার গলায় কেউটে সাপের ফোঁসানির মতো আওয়াজ উঠতে লাগল, একজন না চাইতেই সন্তান পেল, তাই মরতে হল তাকে। আর একজন সাত বছর চেয়েও পেল না, তাই তাকে বেঁচে থাকতে হল। বেঁচে থাকতে হল মরবার সাহস নেই বলে।
এক মুহূর্তে সমস্ত জিনিসটা তার কুৎসিত উলঙ্গ সত্যটা নিয়ে আমার সামনে ফুটে উঠল। মনে হল নৌকো থেকে এখনি মাথা ঘুরে আমি পড়ে যাব জলের ভেতর। ঢেউয়ে ঢেউয়ে যে অসংখ্য তারা ফুলছিল, দুলছিল, ভেঙে ভেঙে একাকার হয়ে যাচ্ছিল—আমার চোখের সামনে তারা চাপ চাপ রক্তে পরিণত হয়ে গেল। আমি শুধু বিকৃত গলায় একটা চিৎকার করলুম।
পারুলকাকিমা আবার বললেন, অনেক বেশি পুণ্য নিয়ে ওবাড়িতে আমাকে জোর করে বাঁচতে হয়েছিল। এবার দেখব সব পুণ্যের বোঝা নামিয়ে মরে বাঁচতে পারি কি না। অন্তু, নৌকো পাড়ে ভিড়িয়ে দে।
সে কী কাকিমা! এ তো স্টিমারঘাট নয়!
তা হোক, এখানেই আমি নামব। স্টিমারের দরকার নেই, এখান দিয়ে গয়নার নৌকো যায়–তাতেই আমি চলে যাব।
পারুলকাকিমা, মেয়েরা তো গয়নার নৌকোয়।
কথা বাড়াসনি, আমাকে নামিয়ে দে এখানেই।
আপনার ভয় করবে না?
না, ভয় আমার কাউকে নেই।
আমি শেষ বার বললুম, পারুলকাকিমা, আপনি সত্যিই কি খলিশাকোটায় যাবেন?
পারুলকাকিমার শুকনো একটা হাসির আওয়াজ আমরা কানে এল। হ্যাঁ, খলিশাকোটাতেই আমি যাব।
আজ কত বছর পরে সেই দিনগুলোকে যখন ভাবছি, তখন আরও মনে পড়ছে, খলিশাকোটার পথ ওদিকে ছিল না। যে-স্রোত অজানা সমুদ্রে যায়, সেই স্রোতেই পারুলকাকিমা ভেসে গিয়েছিলেন। আর যে-জল এক বার চলে যায় সে যেমন কখনো ফেরে না, তেমনি পারুলকাকিমাও আর আমাদের গ্রামে কখনো ফিরে আসেননি।
শুধু আমি ভোর হওয়ার আগেই নিঃশব্দে ফিরে এসেছিলুম। বলরাম চক্রবর্তীর স্ত্রীর পালিয়ে-যাওয়া নিয়ে গ্রামে যে তুফান উঠেছিল, তাতে একটি কথাও আমি বলিনি।
তারপর আজ কালীঘাটে এই বুড়িকে আমি দেখলুম।
দুটো মুখের রেখায় কি মিল আছে? হয়তো আছে—হয়তো নেই।
পারুলকাকিমা কেন এসে শেষে ভিক্ষার জন্যে হাত পেতেছেন কালীঘাটে? তান্ত্রিক স্বামীর পুণ্যফলই কি শেষপর্যন্ত তাঁকে এখানে পৌঁছে দিয়েছে?
মন মানতে চাইল না। যে-ঋণ শোধ করবার জন্যে পারুলকাকিমা সেই অন্ধকারের পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেই ঋণ কি সারাজীবনেও তাঁর শোধ হবে না? হতে পারে না, এমন হতেই পারে না। তার চাইতে অন্ধকারের নদী বয়ে চলুক সমুদ্রে। সেই সমুদ্রে সব জল, সব প্রাণ, সব ঋণ মুক্তি পায়। পারুলকাকিমাও নিশ্চয় সেই সমুদ্রেই তাঁর বোঝা নামিয়ে দিতে পেরেছেন পেয়েছেন তাঁর ছুটি।
তালিয়াৎ
বর্ধমান থেকে ফিরে আসছিলুম। আমি আর হাবুল সেন।
একে কনকনে শীতের রাত, তায় শেষ ট্রেন। ছোট কামরাটায় যাত্রী নেই বললেই চলে। শুধু লাঠি হাতে মোটাসোটা এক ভদ্রলোক উঠেছিলেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বাঙ্কে চেপে কম্বল মুড়ি দিয়েছেন।
শক্তিগড় স্টেশনে আর-এক ভদ্রলোক উঠলেন। রোগা লম্বা চেহারা-গায়ে বেমানান ধুমসো ওভারকোট। কান-মাথা একটা খাকী রঙের মাফলারে জড়ানো। মুখে সরু গোঁফের রেখা–চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা।
