তারপরেই গোটা কতক উদ্ভট শ্লোক, স্কুলের পড়ানোর নিন্দে আর তন্ত্রশাস্ত্রের আলোচনা। কথা বলতে বলতে বাঁ-হাতের সেই পানিজোঁকের মতো লিকলিকে আঙুল দিয়ে গা চুলকোতেন। রোগা কালো কালো খড়িওড়া পায়ে নখের দাগ পড়ে যেত, ঠিক মনে হত। একটা বনবেড়াল হাঁস চুরি করে খেয়ে শুকনো বাঁশের ওপর আঁচড় কেটে কেটে থাবায় শান দিচ্ছে।
আর একটি রবিবারের ছুটি। ওই বাঁশবন ছাড়িয়ে চলেছি ওপারের এক বন্ধুর বাড়িতে। এক বার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলুম বলরামকাকা ওখানে বসে নেই, জলচৌকিও নেই। শুধু বাড়ির বাচ্চা রাখাল আক্তার বসে বসে গোরুর জাবনা কাটছে। চলে যাচ্ছি, পিছন থেকে ডাক শুনলুম, অন্তু।
দেখি পারুলকাকিমা দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।
পারুলকাকিমা ডাকলে চলে যাওয়া যায় না। আমাকে ফিরতে হল। অর্ধচেতনভাবে আমি জানতুম, এই বাড়িতে দুটো দল আছে; একদিকে বলরামকাকা আর তারামাসিমা, আর একদিকে পারুলকাকিমা একা। আমিও মনে মনে পারুলকাকিমার সঙ্গে যোগ দিয়েছি, কিন্তু কেন দিয়েছি সে আমার নিজেরও জানা নেই। আর তারামাসিমা সেকথা জানে—তার চোখের দৃষ্টি দেখেই আমি তা বুঝতে পেরেছিলুম।
আমি কিছু বলবার আগেই পারুলকাকিমা বললেন, একটা চিঠি লিখে দিয়ে যাবি?
আচ্ছা।
তিন জনের এই বাড়িটি এমনিতেই নির্জন, আজকে আরও ফাঁকা ঠেকল। বলরামকাকাকে দেখতে পেলুম না, তারামাসিমাকেও নয়। দাওয়ায় বসে আমি জিজ্ঞেস করলুম, কাকা কোথায়?
একটু চুপ করে রইলেন পারুলকাকিমা। তারপর বললেন, শিষ্যবাড়ি গেছেন।
বছরে এক বার করে বলরামকাকা শিষ্যবাড়ি যেতেন। পূর্বপুরুষের কাছ থেকে এই ভাগ্যটুকু তাঁর পাওয়া। রবিশাল-ফরিদপুরে ক-ঘর শিষ্য তাঁদের ছিল, এক বার করে সেসব জায়গায় ঘুরে আসতেন। যা পেতেন দু-হাতে কুড়িয়ে আনতেন। তারপর বাড়িতে বসে জমির ধান, পুকুরের মাছ আর রাতদিন তামাক টানা। এই মাস দেড়েকই যা-কিছু নড়েচড়ে বেড়াতেন তিনি। কিন্তু…
আমি বললুম, এসময় তো কাকা শিষ্যবাড়ি যান না।
পারুলকাকিমা বললেন, না গিয়ে উপায় ছিল না।
কথার স্বরে আমি চমকে উঠলুম। পারুলকাকিমার মুখের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেছে, চোয়ালের হাড় দুটো শক্ত হয়ে উঠেছে। দাঁতে দাঁত চেপে হঠাৎ বলে উঠলেন, আমাকে খানিক বিষ এনে দিতে পারিস অন্তু?
কাকিমা!
তোকে আর চিঠি লিখতে হবে না, তুই যা।
আমি ভয় পেলুম। আমার মনে হল আসবার সময় বাঁশবনের ভেতর কেমন যেন একটা ভূতুড়ে হাওয়া দিচ্ছিল, বাঁশে-কঞ্চিতে কটকট খড়খড় করে আওয়াজ উঠছিল। কোথায় যেন একটা দাঁড়কাক রাক্ষুসে গলায় খা-খা-খা বলে ডেকে চলেছিল। আমি অনুভব করলুম বাঁশবাগান থেকে যেন কী-একটা অদ্ভুত ছায়া আমার সঙ্গে সঙ্গে এবাড়িতে চলে এসেছে। বাইরে আক্তার খস খস করে জাবনা কাটছিল, শুকনো হাওয়ায় সেই খড় কাটার আওয়াজ যেন বনবেড়ালের নখের আঁচড়ের মতো আমার কানে বাজতে লাগল।
আমি উঠে দাঁড়াতেই পারুলকাকিমা শক্ত করে আমার কাঁধটা চেপে ধরলেন। বললেন, তুই তো বড়ো হয়ে গেছিস, আমাকে এই নরক থেকে উদ্ধার করতে পারিস?
কী বলতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু চোখ তুলেই নামিয়ে নিলুম আমি। পারুলকাকিমার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। তারামাসিমার চোখেও অত আগুন আমি কোনোদিন দেখিনি।
পরক্ষণেই আমার কাঁধে একটা ধাক্কা দিয়ে বললেন, যা, বেরো। আর কখনো এখানে আসিস নি। এবাড়িকে পিশাচে পেয়েচে, তোর রক্ত শুষে খেয়ে ফেলবে।
সেদিন আমি দেড় মাইল ঘুরে বাড়ি ফিরেছিলুম। ওই বাঁশবনের ভেতর দিয়ে সাঁকো পার হতে আর আমার সাহস হয়নি।
সারা গ্রামে ঝড় উঠল তার পরের দিন। খুন। খুন হয়েছেন তারামাসিমা।
গ্রামের বুনো পাড়ার দুজন লোক বাঁশি তৈরি করবার জন্যে তলতা বাঁশ কাটতে গিয়েছিল বাঁশবনে। বাগানের যে-দিকটাতে সচরাচর কেউ যায় না, যে-দিকটাতে বাঁশবনের সঙ্গে ঝোপঝাড় আর বেতবন মিশে একাকার হয়ে গেছে, যেখানে খালের কালো জল চওড়া হয়ে বাঁক নিয়েছে একটা, পাশের ঢালু জমিতে একটুখানি জলার মতো সৃষ্টি হয়ে অজস্র কলমির ফুল ফুটেছে আর গজিয়ে উঠেছে হোগলার জঙ্গল, সেখানে–
সেখানে দিনে-দুপুরেই নরম কাদার ভেতর থেকে দু-তিনটে শেয়াল কী-যেন টেনে তুলছিল। বুনোরা পাশে ডিঙি ভিড়োতেই শেয়ালেরা ছুটে পালাল। তখন দেখা গেল কলমির ফুল রক্তে মাখা, হোগলার বনে রক্তের ছিটে, জায়গায় জায়গায় কাদার রং পোড়া ইটের মতো লাল। আর দেখা গেল প্রায় উলঙ্গ একটা মানুষের শরীর। টকটক করছে গায়ের রং, এক মাথা ছড়ানো চুলের গদির ওপরে যেন শুয়ে আছে সে। তার দীর্ঘ সাদা গলাটার বারো আনা অংশ মুরগি জবাই করার মত নিপুণ হাতে কাটা।
তাদের আকাশ-ফাটানো চিৎকারের দু-মিনিটে গ্রামের সব লোক জড়ো হয়ে গেল সেখানে। আমাদের স্কুলে ছুটি হয়ে গেল, পোস্টমাস্টার ছুটে এলেন ডাকঘর বন্ধ করে, এলেন ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার রায় জ্যাঠা, এল দফাদার, এল চৌকিদার। আরও কয়েক ঘণ্টা পরে দলবল নিয়ে দেখা দিলেন গৌরনদী থানার দারোগা।
সেই দুঃস্বপ্নের মতো বীভৎস দিনটার প্রত্যেকটা মুহূর্ত পর্যন্ত যেন আজ মনে করতে পারি।
দারোগা লাশ দেখলেন, লোক তাড়িয়ে সেখানে পুলিশ চৌকিদারের পাহারা বসালেন, তারপর সোজা চলে গেলেন বলরামকাকার বাড়ি।
সেখানে নাকি পারুলকাকিমা বলেছিলেন, বলরামকাকা চার দিন হল শিষ্যবাড়ি গেছেন। রাতের বেলা তারামাসিমা কখন কেন ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন আর ওই বাঁশবনেই-বা কেন গিয়েছিলেন তা তিনি জানেন না। তারামাসিমাকে কে খুন করতে পারে তাও তিনি বলতে পারেন না। তাঁদের কোনো শত্রু নেই। তারামাসিমা তাঁর দূর সম্পর্কের বোন— বালবিধবা। এ সংসারে পাঁচ-ছয় বছর ধরে আছেন, তাঁর স্বামীই অনাথা দেখে নিয়ে এসেছিলেন। না, কোনো ঝগড়াঝাঁটি ছিল না, তারামাসিমার সঙ্গে বাইরের কোনো যোগাযোগ ছিল কি না তাও তাঁর জানা নেই।
