হয়, হয়। আমি তান্ত্রিক, সাধনার জোরে সব করতে পারি।
ভ্রুকুটি করে তারামাসিমা বলতেন, মরণ!
আর কখনো কখনো দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াতেন পারুলকাকিমা। স্থির শান্তদৃষ্টিতে চেয়ে থাকতেন এঁদের দিকে। মাঝে মাঝে নিঃশব্দে সরে যেতেন, কখনো-বা আমাকে ডেকে বলতেন, অন্তু আমার একটু কাজ করে দিবি?
বলরামকাকার বকুনির হাত থেকে বাঁচবার জন্যেই আমি তৎক্ষণাৎ উঠে পড়তুম, চলে যেতুম বাড়ির ভেতরে।
পারুলকাকিমা আমাকে ডেকে নিয়ে যেতেন চিঠি লেখার জন্যে।
নিজে লেখাপড়া একেবারে জানতেন না তা নয়, কিন্তু হাতের লেখা ছিল কাঁচা আর বড়ো বড়ো। একখানা পোস্টকার্ডে কয়েক লাইনের বেশি ধরত না। আর আমি খুব খুদে খুদে অক্ষরে অনেক কথা লিখতে পারতুম—পোস্টকার্ডের দেড় পিঠেই একখানা এনভেলপের কাজ হয়ে যেত। শুধু পারুলকাকিমারই নয়, পাড়ার অনেকেরই চিঠি লেখায় আমার ডাক পড়ত।
বাড়ির ভেতরে ডেকে নিয়ে গিয়ে আমাকে চিড়ের মোয়া, নারকেলের নাড় আর গঙ্গাজলি —এইসব খেতে দিতেন। খাওয়া হয়ে গেলে বলতেন, আমাকে একখানা চিঠি লিখে দে।
চিঠি লিখতেন তাঁর বাবার কাছে। গ্রাম খলিশাকোটা, জিলা বাখরগঞ্জ। আমি বাখরগঞ্জের বদলে বরিশাল লিখতুম। ইশকুলে পড়তে গিয়ে আমি জেনেছিলুম, আজকাল আর বাখরগঞ্জ লেখার রেওয়াজ নেই, বরিশাল লিখতে হয়।
কী লেখা হত চিঠিতে?
বাবা, তুমি এক বার অবশ্য আসিবে। আজ কতদিন তোমাকে দেখি না। আমারও সংসার ফেলিয়া যাইবার উপায় নাই। মরণ না হওয়া পর্যন্ত এখান হইতে আমি নিস্তার পাইব না। ইহারা আমাকে নিয়া যাইবে না।
এই পর্যন্ত লিখে আমার খারাপ লাগত। কলম থামিয়ে জিজ্ঞেস করতুম, আপনি কেন বাপের বাড়ি যান না কাকিমা? বলরামকাকাকে বললেই তো পারেন।
ও যাবে না।
কেন যাবেন না? কাজকর্ম তো কিছুই নেই, বসেই তো রয়েছেন রাতদিন।
একথা অনেক বার আমি জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু পারুলকাকিমা কোনোদিন জবাব দেননি। এড়িয়ে গিয়ে বরাবর বলেছেন, অত কথায় তোর কী দরকার? যা বলছি, লিখে যা।
এরই মধ্যে আমি দেখতুম তারামাসিমা উঠোন দিয়ে চলে যাচ্ছেন। যেতে যেতে চেয়ে দেখলেন আমাদের দিকে, রোদ লেগে চোখের নীলচে তারা দুটো তাঁর জ্বলে উঠল এক বার, যেন ছড়িয়ে পড়ল কয়েকটা আগুনের ফুলকি। মনে হয়েছে পারুলকাকিমা যেন এক বার দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরলেন, যেন শ্বাস বন্ধ করে বসে রইলেন কয়েক সেকেণ্ড, তারপর তীব্র স্বরে ফিসফিসিয়ে বললেন, লিখে যা অন্তু, লিখে যা। তাড়াতাড়ি লেখ।
অস্বীকার করব না, বলরামকাকার সংসার নিয়ে একটা চাপা সন্দেহ আমার মনের মধ্যে ফেনিয়ে উঠছিল। আমি তখন সেই বয়েসে পা দিয়েছি, যখন জীবনের আর একটা উপকূল চোখের সামনে ছায়ার মতো ফুটে উঠেছে আর তার অস্পষ্ট আভাসের ওপর আমার মনের রং পড়ছে। আমি উপন্যাস পড়তে শুরু করেছি। মতিবিবি আর কপালকুন্ডলার সম্পর্ক অনেকটা অনুমান করতে পারি, বড়োদের কথাবার্তার ভেতর থেকে অনেক ইঙ্গিত তখন খুঁজে পাই। একদিন দুপুরে আমাদের বাড়িতে মেয়েদের আসর বসেছিল, আমি বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকতে গিয়ে শুনতে পেয়েছিলুম রায় বাড়ির রাঙাজেঠিমা চিৎকার করে বলছেন, পারুল বলেই সহ্য করে, আর কেউ হলে এতদিন ঝাঁটা মেরে ওই বলাকে…
আমাকে ঢুকতে দেখেই তিনি থেমে গিয়েছিলেন। মা বলেছিলেন, অন্তু, যা এখান থেকে। মেয়েদের কথার ভেতর পুরুষমানুষের দাঁড়াতে নেই।
সেইদিন থেকে আমি অনেকটা সচেতন হয়ে উঠেছিলুম। কতগুলো ছায়া আমার সামনে রূপ নিতে লাগল। মানুষের মনের অরণ্য সেই প্রথম তার জটিল অন্ধকারে আমাকে আকর্ষণ করল। বলরামকাকাকে এর আগে আমার ভালো লাগত না, এরপর থেকে যেন তাঁর সম্পর্কে একটা তীব্র বিদ্বেষ আমি অনুভব করতে আরম্ভ করলুম। ডাকলেও আমি আর বসতুম না, কাজ আছে বলে জোরপায়ে পেরিয়ে যেতুম জায়গাটা। তারামাসিমা বিশেষ কথা বলতেন না আমার সঙ্গে, শুধু মনে হত তাঁর নীলচে উগ্র চোখ দুটো থেকে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে জ্বলে উঠত। বুঝতে পারতুম আমাকে তিনি পছন্দ করেন না।
হয়তো একটু কারণ ছিল। একবার শ্রাবণ মাসে আমাকে ডেকে বলেছিলেন, আজ সন্ধে বেলা এসে এক বার একটু মনসামঙ্গল পড়ে দিয়ে যাস তো। আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। কাল থেকে, পড়তে পারছি না। ওদিকে সংক্রান্তি তো এসে গেল।
পয়লা শ্রাবণ থেকে আমাদের দেশে মনসামঙ্গল পড়বার রেওয়াজ। সংক্রান্তিতে মনসা পুজোর দিনে সে-পড়া শেষ করতে হয়। সন্ধের পরে ওই বাঁশবন পেরিয়ে এই বাড়িতে আসতে আমার প্রচুর আপত্তি ছিল, সংক্ষেপে বললুম, সন্ধের সময় আমার স্কুলের পড়া আছে, আমি আসতে পারব না।
তারামাসিমার নীলচে চোখ দুটো ধকধক করে উঠল। সেই অদ্ভুত কর্কশ গলায় বললেন, তা পারবি কেন? পারবি কেবল ঘণ্টার পর ঘণ্টা পারুলকাকিমার চিঠি লিখতে। তাতে তোর লেখাপড়ার একটুও ক্ষেতি হয় না।
আমি জবাব দিইনি। চলে আসতে আসতে দুটি মিষ্টি সম্ভাষণ শুনেছিলুম পিছন থেকে লক্ষ্মীছাড়া, বাঁদর।
বলরামকাকার বাড়িতে যাওয়ার জন্যে আমার যে বিন্দুমাত্রও আকর্ষণ ছিল তা নয়। ওদের সঙ্গে আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়তাও ছিল না। কাকা ডাকতুম নিতান্তই গ্রাম সুবাদে। ওদের ওখানে আমার আসা-যাওয়াও বাড়ির লোকে পছন্দ করত না। আমিও ইচ্ছে করে যেতুম না, কিন্তু খাল পেরিয়ে কোথাও যেতে গেলেই বলরামকাকার বাড়ির ওপর দিয়ে পা বাড়াতে হত আর সঙ্গে সঙ্গেই ডাক পাড়তেন, এই শোন শোন, আয় এদিকে।
