বলরামকাকার চোখ এক ধরনের অদ্ভুত খুশিতে পিটপিট করত।
কী রে, বলতে পারলিনে তো?
পারি। আপনার কাছেই শুনেছি অনেক বার।
শুনেছিস নাকি? ও! তাহলে এইটে কী বল তো?
আর একটা উদ্ভট শ্লোক এবং সেটাও পঞ্চাশ বার শোনা। বিরক্ত হয়ে চলে যাওয়ার উপক্রম করতেই বলতেন, যাচ্ছিস কোথায়? ওই তো একটা মোড়া রয়েছে ওখানে, একটু বস-না, গল্প করি।
গল্প করার নোক বেশি তাঁর জুটত না। বলরামকাকা ঠিক অসামাজিক ছিলেন কি না জানি, কিন্তু গ্রামের লোক সাধ্যমতো তাঁকে এড়িয়ে চলত। তা ছাড়াও তিনি নাহয় সারাদিন হুঁকো হাতে বসে থাকতে পারেন—আর সকলেরই কিছু-না-কিছু কাজকর্ম আছে। কাজেই আমাদের কাউকে পেলে আর ছাড়তে চাইতেন না। আমাদের দারুণ খারাপ লাগত, কিন্তু এড়িয়ে চলার উপায় ছিল না, বসেই যেতে হত খানিকক্ষণ।
বলরামকাকা হুঁকোয় টান দিয়ে একটা উঁচুদরের আলোচনা শুরু করতে চাইতেন।
বল দিকি, শাস্ত্রের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কী?
ক্লাস নাইনে পড়ি, পৈতে হয়েছে অনেক দিন। জবাব দিতুম, বেদ।
হল না। শাস্ত্রের সেরা হচ্ছে তন্ত্র।
তর্ক করার বিদ্যে নেই, নিরুপায় ক্রোধ নিয়ে চুপ করে থাকতুম। আর বলরামকাকা গলা নামিয়ে বলে যেতেন, বুঝলি, তন্ত্র হচ্ছে সাধনার সবচেয়ে কঠিন রাস্তা, তাই ওর নাম হল বীরাচার। মানে, একমাত্র বীরেরাই ওই সাধনার অধিকারী। আর জপতপ, পুজো এসব হল দুর্বলের ধর্ম, সেইজন্য এদের পশ্বাচার বলে। সেইজন্যেই তো আমি তান্ত্রিক-হু-হুঁ!
আমি এক বার চোখ তুলে চেয়ে দেখতুম বলরামকাকার দিকে। তিনি তান্ত্রিক একথা বলে দিতে হয় না বাইরে থেকে। সবসময়েই হাঁটু পর্যন্ত একটা লালকাপড় পরে থাকেন, গলায় আর বাহুতে মোটা মোটা রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে খানিকটা গলানো সিঁদুর লেপটানো যেন রক্ত-মাখানো রয়েছে মনে হত। কিন্তু এতসব ভয়ংকর সাজপোশাকেও বলরামকাকাকে যথেষ্ট ভীতিকর বোধ হত না। রোগা, হাড়-বের-করা কালো চেহারা, শীতকালে হাঁপানির টানে কষ্ট পেতেন। সেই বয়সেই বঙ্কিমের কপালকুন্ডলা পড়া হয়ে গিয়েছিল আমার। বালিয়াড়ি শিখরে সেই দীর্ঘকায় মনুষ্যমূর্তির সঙ্গে বলরামকাকার সাদৃশ্য কল্পনা করা কঠিত হত। আমার শুধু ওঁর বাঁ-হাতের কালো কালো রোগা আঙুলগুলোকে পানিজোঁকের মতো কিলবিল করতে দেখে ঠিক ভয় করত না, একটা বিশ্রী অস্বস্তিতে শরীর শিরশিরিয়ে উঠত। জিজ্ঞেস করতুম, শবসাধনা করেছেন আপনি?
এখনও করিনি, কিন্তু করব। মুশকিল কী জানিস, তার বায়নাক্কা অনেক। চন্ডালের শব চাই, তার অপঘাতে মরা চাই, জুতমতো অমাবস্যার রাতে পাওয়া চাই, তার সঙ্গে আরও কিছু চাই। মানে সেসব তোকে বলা যাবে না। যদি কোনোদিন শিষ্য হস তখন জানতে পারবি। একগাল হাসতেন বলরামকাকা, কী রে, চ্যালা হবি আমার?
আপনি তো আগে সিদ্ধিলাভ করুন, তারপর দেখা যাবে।
ও, আমার কথায় বুঝি বিশ্বাস হল না? দাঁড়া, দেখবি, দেখবি। কোটায় টান দিতে গিয়েই দেখতেন আগুন নিবে গেছে। তখন ডাক ছাড়তেন, তারা, তারা। তারিণী—
দুটো কাজ হত একসঙ্গে। একদিকে ব্রহ্মময়ী ডাক পেতেন, অন্যদিকে বেরিয়ে আসতেন। তারামাসিমা। তারামাসিমা জিজ্ঞেস করতেন, কী হল? এত চেঁচামেচি কেন?
কলকেটা একটু বদলে দেবে?
সারাদিন তামাক খাওয়া আর বকবক করা—ভালোও লাগে!
কী আর করব বল? মিহি গলায় জবাব দিতেন বলরামকাকা, মানে ঠিক বকবক করা নয়, একটু তন্ত্র নিয়ে আলোচনা করছিলুম ওর সঙ্গে।
চুলোয় যাক তন্ত্র! তারামাসিমা কুটি করতেন, নিজে তো গোল্লায় গেছই, এই বাচ্চা ছেলেটারও মাথা খেতে চাও?
কালী— কালী! কী যে বল! বলরামকাকা নিবে যেতেন এসব কথা আবার কেন? যাও-না লক্ষীটি, চট করে একটু তামাক সেজে আনো।
এরই মধ্যে আমি লক্ষ করতুম, কখন দরজার সামনে পারুলকাকিমা এসে দাঁড়িয়েছেন। প্রায়ই কোনো কথা বলতেন না; যেমন নিঃশব্দে এসে দাঁড়াতেন, তেমনিই আস্তে আস্তে ছায়ার মতো সরে যেতেন। কেন আসতেন, কী দেখে চলে যেতেন, সেকথা তিনিই শুধু বলতে পারেন।
পারুলকাকিমা বলরামকাকার স্ত্রী। বয়েস কত জানি না, কিন্তু বলরামকাকার পাশাপাশি অনেক বেশি ছেলেমানুষ বলে মনে হত তাঁকে। ছেলেপুলে ছিল না—রান্না করে, দাওয়া নিকিয়ে, ধান সেদ্ধ করে, চিড়ে কুটেই তাঁর দিন কাটত। তারামাসিমা ছিলেন তাঁরই দূর সম্পর্কের বোন। তারামাসিমা কী করে এই সংসারে এসেছিলেন জানি না, কী কাজ যে তিনি করতেন তাও বলতে পারি না। শুধু মনে হত বলরামকাকাকে তামাক জোগানোই তাঁর একটি মাত্র উদ্দেশ্য। যতদূর মনে পড়ে, আমি কোনোদিন পারুলকাকিমাকে তারামাসিমার সঙ্গে কথা কইতে পর্যন্ত দেখিনি।
পারুলকাকিমাকে সুন্দরী বলা যায় না, মোটামুটি শান্তশিষ্ট গেরস্থ মেয়ের চেহারা। কিন্তু তারামাসিমাকে এক বার দেখলে ভোলা শক্ত। আগুনের মতো গায়ের রং, টানা টানা চোখ, চুলের গোছা পিঠ ছাপিয়ে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে। চোখের তারা দুটোয় কেমন একটা নীলচে আভা, মনে হত সে-দুটো সবসময় ঝকঝক করছে। আর আশ্চর্য রুক্ষ আর চড়া ছিল তাঁর গলার আওয়াজ। মেয়েদের অমন কঠিন নীরস স্বর জীবনে আমি কখনো শুনিনি।
মাকে বলতে শুনেছি— অতি বড়ো সুন্দরী না-পায় বর। তাই বিয়ের এক বছরের মধ্যে ওর সোয়ামিকে সাপে কাটল। তারামাসিমা ছিলেন বিধবা। খুবসম্ভব তিনকুলে কেউ ছিল না তাঁর, তাই আশ্রয় নিয়েছিলেন বলরামকাকার সংসারে। কিন্তু খুব চোটপাটেই থাকতেন। বলরামকাকাকে ঘন ঘন তামাকের জোগান দিতেন; ধমক দিয়ে বলতেন, রাতদিন হুঁকো মুখে বসে থাকা আর বকবকানি—পেটের ভাত হজম হয় কী করে?
