কিন্তু ঘোলাটে হলুদ রঙের সেই ছানিপড়া চোখ, সেই কাঁপা হাতটা, সেই ভাঙা গলার আওয়াজ–মুখটা বড়ো বেশি চেনা চেনা ঠেকছে। কিছুতেই মনে করতে পারছি না, অথচ…
তারপর নানা কাজের ফাঁকে ফাঁকে, অলস মুহূর্তের ছেড়া ছেড়া চিন্তায়, রাত্রে ঘুম আসবার আগে ওই মুখোনাকে জীবনের কোনো একটা অন্ধকার কোনা থেকে আমি খুঁজে বার করতে চেয়েছি। খুব-একটা আগ্রহ নিয়ে নয়, অবসর সময়ে ক্রসওয়ার্ডের শব্দ খোঁজবার মতো, জিগস পাজল মেলাবার মতো। উত্তরটা না পেলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু কেমন একটা অতৃপ্তি যেন আছে।
চেনা আধচেনা কত মুখ ভিড় করে এল। অচেনারাও বাদ গেল না। কেউ এল কোনো ট্রেনের কামরার সহযাত্রিণী হয়ে, কেউ এল প্রবাসের কোনো হোটেলের পাশের ঘর থেকে, কাউকে মনে পড়ল কোনো তীর্থের ধর্মশালায়। কোনো কোনো মুখের সঙ্গে দু-একটা রেখা হয়তো মিলল, কিন্তু শেষপর্যন্ত কারও সঙ্গেই সম্পূর্ণ মেলাতে পারলুম না।
মিলল না, কিন্তু ছবি আনল। যেন একটা পিকচার গ্যালারির মধ্য দিয়ে চলতে চলতে আমি একটি মুখের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লুম।
পারুলকাকিমার ছবি। অনেক বেশি করে চেনা, অথচ সবচাইতে ঝাপসা। আর সেই অস্পষ্টতার আড়াল পারুলকাকিমা নিজেই সবচেয়ে বেশি করে টেনে দিয়েছিলেন।
তাহলে ফিরে যেতে হল নিজেদের গ্রামে। তখন যাওয়া খুব শক্ত ছিল না। একটা ধু-ধু নদী, তার নাম আড়িয়াল খাঁ। সেখানে ছোটো একটি স্টিমারঘাট। সেই ঘাটে নেমে নৌকো। নদী বেয়ে কয়েক মাইল চলা, তারপর বাঁ-দিকে খাল। তার হলদে জল হিজল আর বেতবনের ছায়ায় কালো। তাতে জোয়ার-ভাটার আসা-যাওয়া, মাঝে মাঝে থালার মতো ভেসে-ওঠা কাছিম, কখনো নৌকোর ভেতরে লাফিয়ে-পড়া দু-একটা ছোটো মাছ, গোটা সাতেক বাঁক, সুপুরি আর নারকেল গাছের ফাঁকে আমাদের চন্ডীমন্ডপ আর নাটমন্দির, দাঁড়ে কয়েকটা টান, লগিতে গোটা কয়েক খোঁচা—আমাদের বাড়ির ঘাট।
ভূগোলের হিসেবে কলকাতা থেকে হয়তো দুশো মাইলের কিছু বেশি। কিন্তু এখন গ্রহান্তরের ওপারে।
সেই গ্রাম। আমার কৈশোর। আর পারুলকাকিমা।
পারুলকাকিমাদের বাড়ি খালের ওপারে। একটা বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে যেতে হত সেখানে। বাড়ির সামনে ছিল একটা থমথমে বাঁশবন। সেই বাঁশবনটার ভেতর দিয়ে যেতে দিনদুপুরেও কেমন ছমছম করত শরীর। হঠাৎ হাওয়া দিত এক-একটা, বাঁশের শুকনো পাতা পাক খেয়ে খেয়ে উড়তে থাকত, কাঁচা বাঁশের কেমন একটা গন্ধ ভেসে বেড়াত, হাওয়ার তালে তালে কটকট খড়খড় করে আওয়াজ উঠত। এই বাঁশবনের ভেতরেই একবার বিকেলে আমি একটা প্রকান্ড বনবেড়াল দেখেছিলুম। একটা শুকনো বাঁশের গায়ে নখ আঁচড়াচ্ছিল সে, কড়কড় করে আওয়াজ হচ্ছিল আর নখের টানা টানা দাগ পড়ছিল বাঁশটাতে। আমার পায়ের শব্দে চমকে সে ফিরে তাকিয়েছিল আমার দিকে। লাল টুকটুকে মুখটাকে ফাঁক করে ফ্যাঁস করে আওয়াজ তুলেছিল একটা, তারপর এক লাফে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। আর এক বার ফান মাসের সকালে যখন বাঁশবনের এখানে-ওখানে গুচ্ছে গুচ্ছে ভাঁট ফুল ফুটেছে, তখন আমি ওখানে মস্ত একটা খরিশ গোখরোর সঙ্গে একটা বেজিকে লড়াই করতে দেখেছিলুম। বেজিটা যেন ফুলে আট গুণ হয়ে উঠেছিল, থেকে থেকে সাপটার রক্তে বাঁশের শুকনো পাতাগুলো রাঙা হয়ে গিয়েছিল।
গ্রামের পুরোনো দিঘি, তাদের পাড়ে পাড়ে চিতার ওপর মঠ দেওয়া। কত সকাল দুপুর সন্ধ্যায় রাতে সেইসব নির্জন দিঘির ধার দিয়ে গেছি, শীতের ভোরে চুরি করেছি খেজুররস কোনোদিন ভয় পাইনি। কিন্তু পারুলকাকিমাদের বাড়ির সেই বাঁশবনটা ভরা দিনের আলোতেও সারাশরীরে কেমন একটা শিরশিরানি বইয়ে দিত।
জোরপায়ে বাঁশবাগান পেরিয়ে যেতুম, তারপরেই দেখতে পেতুম বলরামকাকাকে।
একটা জলচৌকিতে বসে তামাক টানতেন। পাশেই বাঁধা আছে বাড়ির সাদা ছাগলটা বুড়ি হয়ে গেছে, তার দাড়ির রংটা পর্যন্ত লাল। বলরামকাকা তামাক খাচ্ছেন আর মাঝে মাঝে হাত বোলাচ্ছেন তার গায়ে।
দেখেই জিজ্ঞেস করতেন, কী রে, কী চাই?
কিছু না।
ঘুরে বেড়াচ্ছিস শুধু শুধু? ইশকুল নেই? ইশকুল ছুটি।
কী ইশকুই হয়েছে সব! বলরামকাকা মুখটা বাঁকাতেন, লেখাপড়ার পাট তো উঠেই গেল দেশ থেকে। মাস্টারগুলো শুধু মাইনে নেবার জন্যেই মুখিয়ে রয়েছে সব। ছ্যাঃ!
বা রে, রবিবারেও ছুটি থাকবে না?
রেখে দে রবিবার। তোদের সব বারই সমান। লেখাপড়া কিছু করিস? কোটাকে নামিয়ে জলচৌকির আর একধারে ঠেকান দিয়ে রেখে জিজ্ঞেস করতেন, তুই তো ক্লাস নাইনে পড়িস তাই নয়? আচ্ছা বল দিকি এই ধাঁধাটার মানে কী? দেবরাজ ময়া দৃষ্টং বারিবারণ মস্তকে, ভয়তি অর্ঘ্যপত্রাণি, অহং চ বনহস্তিনী?
আমি বিরস দৃষ্টিতে বলরামকাকার দিকে তাকিয়ে থাকতুম। এইরকম গোটা কয়েক সংস্কৃত উদ্ভট শ্লোকই লোকটার পুঁজি। কতদূর লেখাপড়া করেছেন জানি না, নীচের দিকের কয়েকটা ক্লাসেরও চৌহদ্দি পেরিয়েছেন বলে শুনিনি। কোনো কালে পাঠশালার পন্ডিতের মুখে এগুলো শুনে থাকবেন—এদের ভাঙিয়েই আমাদের জব্দ করতে চেষ্টা করেন।
শ্লোকটা এবং ওর ব্যাখ্যানা আরও অন্তত পঞ্চাশ বার আমি শুনেছি, কিন্তু বলরামকাকার সঙ্গে কথা বাড়াতে আমার প্রবৃত্তি হত না। আসল কথা, লোকটাকে আমার কোনোদিন ভালো লাগেনি। কেমন মনে হত ওই বাঁশবনটা পেরিয়েই আমি ওঁকে দেখতে পাই, আর ওই বাগানটার ভয়-ধরানো রহস্যের সঙ্গে বলরামকাকারও কোথাও কী-একটা সম্পর্ক আছে। ওঁর বাঁ-হাতের আঙুলগুলো কখনো স্থির থাকত না, সবসময় নড়ত; আর তাই দেখে আমার খামোকা মনে হত যেন কোথা থেকে একটা হাঁস চুরি করে খেয়ে বনবেড়ালটা শুকনো বাঁশের গায়ে ঘষে ঘষে নখে শান দিচ্ছে।
