কিন্তু না। ঠিকাদারবাবুর জোগান। সাহেবদের নতুন বছর আসছে, তাদের উৎসব হবে, খানাপিনা হবে। ওদিকে দৃষ্টি দিলেও মহাপাতক। থাবায় থাবায় অখাদ্য ভাতগুলো গলার মধ্যে ঠেলে দিতে লাগল রজনি। অসহ্য শীতে পেটটা মোচড় দিচ্ছে, ঠেলে বমি উঠে আসছে যেন।
ছেলেটি আবার প্যানপ্যান করে উঠল, ডিম… কোথা থেকে কী হয়। রজনির মাথার মধ্যে রক্ত চড়ে গেল। ভাতের মালসাটাকে ছুড়ে ফেলে দিল দূরে, তারপর বিদ্যুতের মতো দাঁড়িয়ে উঠল। নিজের অতৃপ্ত লোভের জ্বালাটা বিস্ফোরকের মতো ফেটে পড়েছে, একটা অবলম্বন পেয়েছে সে।
দাঁতে দাঁতে পিষে রজনি বললে, ফের ডিম? আজ তোকে খুন করে ফেলব।
মুহূর্তে একটা হ্যাঁচকা টানে রজনি ছেলেটাকে কাছে টেনে নিয়ে এল, তারপর নীল একটা হিমার্ত থাবা ছেলেটার গলায় বসিয়ে দিলে নির্মমভাবে। মেরে ফেলবে।
আর্তকণ্ঠে সারদা চিৎকার করে উঠল, কী করছ?
লাল আগুনে রজনির চোখ ভয়ংকর দেখাচ্ছে। আগুনের চাইতেও বেশি করে জ্বলছে সেটা। শেষ করে দেব।
ছাড়ো, ছাড়ো, মরে যাবে যে।
মরুক।
কঠিন হাতের চাপে ছেলেটার চোখ বেরিয়ে যাচ্ছে। পাগলের মতো ছুটে এল সারদা, ঘরের কোণ থেকে লোহার শাবলটা তুলে নিয়ে প্রাণপণে ঘা বসাল রজনির মাথায়। অস্ফুট একটা কাতর আর্তনাদ। ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়ে রজনি তিন হাত দূরে ছিটকে পড়ল, ছিটকে পড়ল আগুনের ওপর। সমস্ত ঘরময় আগুন ফুলঝুরির মতো ছড়িয়ে গেল।
সারদা দাঁড়িয়ে রইল বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে। কী করবে কিছু বুঝতে পারছে না। ছেলেটা নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে মাটিতে, আর আগুনের শয্যায় মাথা রেখে তেমনি নিঃসাড় হয়ে শুয়ে আছে রজনি। গায়ের ধোকড়াটা জ্বলে উঠেছে। মরা সাপ পুড়বার সময় যেমন অন্তিম আক্ষেপে মোচড় দেয় শরীরটাকে, তেমনিভাবে একটা অসহায় চেষ্টা করেই রজনি স্থির হয়ে গেল। সারদা হতবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল, রজনির দাড়িটা পুড়ছে—ফটাস করে একটা শব্দ হয়ে খইয়ের মতো ফুটে উঠেই গলে গেল তার বিস্ফারিত ডান চোখটা। মানুষপোড়া গন্ধ কী বিশ্রী। মাঠের ওপারে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে প্যারিলাল দেখতে লাগল— সমস্ত গ্রামটা জ্বলছে, এই দারুণ শীতে আগুন পোয়াচ্ছে যেন! আর এত দূরে দাঁড়িয়েও হঠাৎ তার অত্যন্ত গরম লাগতে লাগল, কাশ্মীরি ফারের কোটটা বড়ো বেশি গরম।
তমস্বিনী
কালীঘাটের মন্দিরে যেতে হয়েছিল। দুর্বল গলায় বলেছিলুম, দ্যাখো সপ্তাহে একটা মাত্র রবিবার, সেদিনও যদি…
জবাব এল, রবিবার না হলে তোমাকে ধরা যায় নাকি?
বললুম, আমাকে ধর্তব্যের মধ্যে না-ই আনলে। তোমার পুণ্যে আমারও তো অর্ধেক দাবি আছে, তুমিই যাও; আমি বরং…
বরং কী? প্রাণের বন্ধুরা আসবে, বারোটা পর্যন্ত আড্ডা চলবে, চা-সিগারেটের শ্রাদ্ধ হবে–এই তো? চালাকি নয়, অনেক কষ্টে আজ তোমায় ধরেছি। ওঠো।
উঠতে হল। রবিবারের কাগজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়বার স্বর্গীয় বিলাসিতা, অলস সকালের আমেজ, দু-একজন বন্ধুবান্ধব এলে কিছুক্ষণ নিঃস্বার্থ পরচর্চা—সমস্তই গেল আজকের মতো। সান্ত্বনার বাণীও শুনতে পেলুম–সারাদিন তো আর কালীঘাটে বসে থাকতে হবে না, ঘণ্টা খানেক বাদেই ফিরে আসব।
ঘণ্টা খানেকের অর্থ আমি জানি। ফেরবার পথে দু-একজন আত্মীয়কে মনে পড়বে, অনেক দিন যাদের সঙ্গে দেখা হয় না। খুঁটিনাটি কেনাকাটাও বাদ পড়বে না। উদাস হয়ে এক লাইন ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি করতেই ঝাঁঝালো স্বরে শোনা গেল, কী বললে?
খেয়াল ছিল না ও-পক্ষেরও ইংরেজি জানা আছে। সামলে নিয়ে বললুম, কিছু না, কিছু না। চলো বেরুনো যাক।
তারপর যথানিয়মে পুজো, পান্ডা, সিঁদুরের টিপ, ফুলের মালা। বেরিয়ে আসবার সময় বিরক্ত হয়ে ভাবছিলুম, লেখাপড়া যা-ই শিখুক, মা-ঠাকুরমার ট্র্যাডিশনকে মেয়েরা কোনো মতেই ছাড়তে রাজি নয়। দেখলুম ভিখারিদেরও ব্যবস্থা আছে, খুবসম্ভব তিন-চার টাকার নয়া পয়সায় ব্যাগ ভরতি করে আনা হয়েছে সঙ্গে।
কিন্তু চাওয়া যেখানে অনন্ত, সেখানে মধ্যবিত্ত গৃহিণীর দাক্ষিণ্য কতক্ষণ চলে? এক লাফে গাড়িতে উঠে বললেন, দাঁড়িয়ে আছ কী? এরপরে গায়ের জামা ছিঁড়ে দেবে।
আমি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলুম সেকথা ঠিক। এক বুড়ি ভিখারিনির দিকে আমার দৃষ্টি পড়েছিল। কোথায় যেন দেখেছি, মুখটাকে ভারি চেনা চেনা ঠেকল।
বুড়ির চোখ দুটোতে ঘোলাটে হলুদ রং, ছানি পড়েছে মনে হল। বাড়িয়ে দেওয়া শীর্ণ। হাতটা অল্প অল্প কাঁপছে। ভাঙা গলায় বললে, গরিবকে কিছু দিয়ে যান বাবা, মা কালী
আপনাকে হাজারগুণ ফিরিয়ে দেবেন।
মা কালী কী দেবেন না-দেবেন সেকথা ভাববার দরকার ছিল না। এতক্ষণ ভিখারিদের আমি কিছুই দিইনি, সে-দায়িত্ব স্ত্রীই নিয়েছিলেন। কিন্তু এইবার আমি পকেটে হাত দিলুম, একটা আধুলি আঙুলে ঠেকল, সেইটেই বের করে ফেলে দিলুম বুড়ির হাতে।
স্ত্রী বললেন, কী হচ্ছে? তুমি আবার দানসত্র খুলে বসলে নাকি? রিজার্ভ ব্যাঙ্ক উজাড় করে দিয়েও কি ওদের খাঁই মেটাতে পারবে? ওঠো গাড়িতে।
বলবার দরকার ছিল না আধুলির প্রতিক্রিয়ায় তখন প্রাণান্ত হওয়ার উপক্রম। বিদ্যুদবেগে গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বললুম, অ্যাক্সিডেন্ট না ঘটিয়ে যত জোরে পারো চালাও।
পুরোনো গাড়ির বেসুরো কর্কশ আওয়াজের সঙ্গে রাজাবাবু বড়োবাবু-র আর্তরব ঘূর্ণির মতো মিলিয়ে গেল।
