কঙ্কালসার বুকের মধ্যে কাশছে মেয়েটা। মায়ের বুক শুকনো, চুষলে দুধ তো দূরে থাক, একবিন্দু রক্তও বেরিয়ে আসে না বোধ করি। ছেড়া কাপড়ের আঁচলে সারদার শীত কাটছে না, তবু গায়ের গরম দিয়ে সে কোনোমতে মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখবার চেষ্টা করছে। রজনির পুত্রবধূ সারদা। ছেলে নিবারণ শহরে গেছে রিকশা টানতে। আধিতে যা পেয়েছিল তাতে দু দিনও পেট চলে না। তাই শহর তাকে টেনে নিয়ে গেছে আজ দু-মাস। এ পর্যন্ত কোনো খবর নেই।
ঘরে ঢুকে একটা বিড়ি ধরাল রজনি। ধোকড়ার নীচে পরলে ছেড়া জামাটা, তবু শীত কাটে।
এক মালসা আগুন করবি বউ? শীতে যে জমে গেলাম।
আগুন? কী দিয়ে জ্বালব? সারদা ঝলসে উঠল।
ওই তো খড়ি আছে, খুঁটে আছে।
খড়ি আছে, ঘুটে আছে। সারদা ভেংচে উঠল, শ্বশুরের সম্মান রাখবার মতো গলার আওয়াজটা তার নয়। দিনে সব পুড়িয়ে শেষ করে দিলে রাত্তিরে কী হবে তখন। বাচ্চাকাচ্চাগুলো একটাও বাঁচবে না।
দুর্বল স্থবির দেহে যতটা সম্ভব শিখায়িত হয়ে ওঠবার চেষ্টা করলে রজনি!
কেন, বসে বসে নবাবি না করলে চলে না? দুটো খড়ি কুড়িয়ে রাখতে পারিসনে হারামজাদি!
ভাঙা কাঁসরের মতো গলায় অদ্ভুত স্বরে চেঁচিয়ে উঠল সারদা, যেন প্রেতিনির আর্তনাদ।
খড়ি! খড়ি আকাশ থেকে বৃষ্টি হয়, তাই না! তুমি মরলে চিতেয় দেবার জন্য খড়ি কুড়িয়ে রাখব।
বটে, বটে!
অসহ্য ক্রোধে রজনি কাঁপতে লাগল, একটা-কিছু করে ফেলবে—একটা কোনো ভয়ানক কান্ড। কিন্তু কিছুই করলে না, শুধু ধোকড়াটা গায়ে জড়িয়ে শিথিল গতিতে দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল।
এখন কোথায় চললে আবার?
মরতে। রজনি চলে গেল। দরজার ওপার থেকে বললে, চিতার কাঠ জোগাড় রাখিস।
বাইরে শীত পাথরের মতো পৃথিবীর বুকে চেপে বসেছে। মেঘলা আকাশে ধোঁয়ার মতো আরও মেঘ জমে উঠছে, পান্ডুর অন্ধকার যেন ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আড়ষ্ট পায়ে রজনি এগিয়ে চলল, ফাটা পা থেকে রক্ত চুইটে চুইয়ে পড়তে লাগল ক্ষুধার্ত বন্ধ্যা মাটিতে।
রজনি ফিরল যখন, তখন সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়েছে। সন্ধান বৃথা হয়নি। তিনখানা গ্রাম ঘুরে দু কুড়ি ডিম জোগাড় হয়েছে। ঠিকাদারবাবুর নামের মহিমা আছে। হাঁস-মুরগিগুলো পর্যন্ত খুশি হয়ে ডিম পাড়তে লেগে যায় যেন। ডজনপ্রতি তিন গন্ডা পয়সাও যদি প্যারিলাল তাকে কমিশন দেয়, তাহলে কমসে কম অন্তত দশ আনাতে এসে দাঁড়াত।
দশ আনা পয়সা, তিন-চারটি প্রাণীর এক বেলার খোরাক। প্যারিলালের অনুগ্রহ আছে। তার ওপরে, অস্বীকার করলে অধর্ম হবে। মাঝে মাঝে বাঁকা চোখে সারদার দিকে তাকায়, তা নইলে আপত্তি করবার বিশেষ কিছুই ছিল না।
কিন্তু দশ আনা পয়সা। তারজন্যে অনেকখানি খেসারত দিতে হয়েছে। পা দুটো জমে অসাড় হয়ে আছে, শুধু ফাটা জায়গাগুলো থেকে এক-একটা তীব্র জ্বালা বিদ্যুৎচমকের মতো শিউরে দিচ্ছে সমস্ত শরীরকে। ঠাণ্ডায় নাক দিয়ে জল পড়ে মুখটাকে ভাসিয়ে দিয়েছে, তার সঙ্গে চোখের জলও হয়তো মিশে রয়েছে খানিকটা।
ঘরে ঢুকেই কিন্তু মনটা খুশি হয়ে উঠল।
গনগনে আগুন জ্বালিয়েছে সারদা। বাইরের জগতের শীতজৰ্জর নিষ্ঠুরতার হাত থেকে যেন স্বর্গলোকে প্রবেশ। একটু আগেকার কুশ্রী কলহের কথা মনেও রইল না। লোভীর মতো আগুনের পাশে বসে পা দুটোকে মেলে দিলে রক্তিম শিখাগুলোর ওপরে।
টকটকে লাল আগুন—রক্তের মতো রং। মানুষের বুক থেকে যে-রক্ত শুকিয়ে গেছে তা রূপায়িত হয়েছে আগুনে। সমস্ত ঘরটা লাল ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। সারদার মুখটাকে দেখাচ্ছে অদ্ভুত আর অপরিচিত। পা দুটোকে আগুনের ওপর ধরে দিয়ে চুপ করে বসে রইল রজনি। অন্য সময় হলে পুড়ে ফোসকা পড়ে যেত, কিন্তু এখন এত বড়ো আগুনটাকেও যেন মনে হচ্ছে যথেষ্ট গরম নয়।
সারদা জিজ্ঞেস করল আস্তে আস্তে, পেলে ডিম?
হ্যাঁ, দু-কুড়ি। ভালো করে রেখে দে, সকালে ঠিকাদারকে দিতে হবে। দশ আনা পয়সা মিলবে।
ম্যালেরিয়াজীর্ণ ছেলেটা এক কোণ থেকে ঘ্যানঘ্যান করে উঠল, মা, আমি ডিম খাব।
খবরদার, খবরদার! রজনি হঠাৎ বাঘের মতো গর্জে উঠেছে, ডিম খাবে! একটা ডিম ছুঁয়েছিস কি মাথা দুখানা করে দেব।
ছেলেটার ঘ্যানঘ্যানানি তবু থামে না। অসুখে ভুগে ভুগে অসম্ভব লোভ বেড়ে গেছে। চোখ দুটো জ্বলছে ক্ষুধার্ত শেয়ালের মতো।
মা, আঁমি ডিঁম খাঁ—ব…
সারদা ছেলেকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে এল সস্নেহে। না বাবা, ডিম খায় না। গরিবের ডিম খেতে নেই।
রজনি চুপ করে রইল। মনটা ভারী হয়ে গেছে। গরিবের ডিম খেতে নেই। শুধু ডিম? কিছুই খেতে নেই। গরিব যদি খেতে পায় তাহলে পৃথিবী চলবে কেমন করে? সব ওলটপালট আর বিশৃঙ্খল হয়ে যাবে যে।
ছেলেটা তবু কাঁদছে। রজনির হাত নিশপিশ করে, একটা-কিছু করতে চায়। ইচ্ছে করে গলা টিপে ওটাকে থামিয়ে দেয় একেবারে। খেতে চায়, কেন খেতে চায়? কার কাছে খেতে চায়? শুকিয়ে মরে যেতে পারে নিঃশব্দে? নিজেও বাঁচে, পৃথিবীরও হাড় জুড়িয়ে যায়।
একটা মালসায় করে খানিকটা কড়কড়ে ভাত আর শাকচচ্চড়ি নিয়ে এল সারদা, খেয়ে নাও।
ঠাণ্ডা আধপচা ভাত, তেতো শাকের ঘণ্ট। গলা দিয়ে একগ্রাস নামে তো পেটের ভেতর থেকে শীতের প্রচন্ড শিহরণ উঠে মাথা পর্যন্ত ঝাঁকিয়ে দেয়—দাঁতে দাঁতে খট খট করে বাজতে থাকে। কেন কে জানে, ডিমগুলোর ওপরে দুর্দান্ত একটা লোভ এসে রজনির মনকেও আচ্ছন্ন করে দিলে। কতদিন সে ডিম খায়নি।
