একটা কাতর দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্যারিলাল বেরিয়ে এল।
শীতার্ত অনুর্বর মাঠ। ঘাসের তীক্ষ্ণ মুখ ঠাণ্ডায় যেন ছুরির ফলার মতো ধারালো হয়ে আছে। মানুষের খালি পা পড়লে কেটে ফেটে একশা হয়ে যাবে। তবু ওর ভেতর দিয়ে খালি পায়েই হেঁটে যায় মানুষ। তাদের পায়ের তলায় হুক ওয়ার্মের ক্ষতচিহ্ন, চামড়ার রং পোড়া কাঠের মতো কালো, নখগুলো যেন হাতুড়ি দিয়ে হেঁছে দিয়েছে কেউ। এই মাঠের ভেতর দিয়ে তারা হেঁটে যায়, ধারালো ঘাসের আগায় কালো রক্ত শুকিয়ে থাকে।
প্যারিলাল ওরই মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলল। তার পায়ে দামি পেটেন্ট লেদারের জুতো, হাঁটু পর্যন্ত টানা পশমি মোজা। পুরু ওভারকোটটার গায়ে হিমের কণা জমছে। ওপরে মেঘলা আকাশটা থমথম করছে যেন ভেঙে পড়বার সূচনায়।
এক ফালি টানা পথ ধরে প্রায় মাইলটাক এগিয়ে এলে গ্রাম; অথবা আগে গ্রাম ছিল। মন্বন্তরের ঝাপটা এখনও মিলিয়ে যায়নি। ধসে-পড়া চালা, পোড়ো ভিটে। মরা মানুষের দীর্ঘশ্বাসেই যেন রাশি রাশি বাঁশের পাতা উড়ে পথটাকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে।
রজনি, ও রজনি! আছ নাকি বাড়িতে?
একটা ছোটো চালার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক দিলে প্যারিলাল। মাটি দিয়ে মসৃণ করে লেপা পুরু দেওয়াল, তার ওপর গেরিমাটির রঙে আঁকা শঙ্খ-পদ্ম-লতা। একদিন সমৃদ্ধি যে ছিল সেকথাই ঘোষণা করছে প্রাণপণে। ওদিকে শণ-ঝরে-যাওয়া চালের ওপর দিয়ে আকাশ উঁকি মারছে আর সেই ফাঁকগুলোর ওপরে খানিকটা ধোঁয়া কিংবা কুয়াশা কুন্ডলী পাকাচ্ছে। ঘরের ধোঁয়াটা বাইরের ভারী হিমার্ত বাতাস ঠেলে বেরুতে পারছে না অথবা বাইরের কুয়াশা সবগুলো একসঙ্গে ভেতরে ঢোকবার জন্যে ঠাসাঠাসি করছে।
বলি, রজনি আছ নাকি?
ঠিকাদারবাবু ডাকছেন। ভেতর থেকে সারদার গলা।
আছি বাবু, আছি। সাড়া দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এল বুড়ো রজনি। অনাহারশীর্ণ উদভ্রান্ত চেহারা। হলদে রঙের চোখ দুটো যেন ঘুরছে। থুতনির নীচে খানিকটা বিশৃঙ্খল পাকা দাড়ি, সারা গায়ে একটা শতচ্ছিন্ন ধোকড়া জড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। শীতটা সত্যিই বড়ো বেশি পড়েছে এবার। বুড়োর হাতের আঙুলগুলো কী অস্বাভাবিক নীল।
তারপরে, ভালো আছ তো? একটা চুরুট ধরাতে ধরাতে প্যারিলাল জিজ্ঞেস করল। এটা ভদ্রতার ব্যাপার, আলাপের ভূমিকা।
ভালো? রজনি হাসবার চেষ্টা করল, আমাদের আর ভালো। এখনও মরিনি এইটুকুই যা ভালো বলতে হবে।
ওসব কথা কেন ভাবছ? একটা পা মাটিতে ঠুকতে ঠুকতে প্যারিলাল চুরুটের ধোঁয়া রিং করতে লাগল। যুদ্ধ থেমে যাবে, আবার ফসল উঠবে, সুখশান্তিতে ভরে যাবে দেশ। প্যারিলালের কণ্ঠ যেন দেবদূতের মতো উদাত্ত, তখন আবার এই বাংলা হবে সোনার বাংলা। কথাগুলো প্যারিলালের নিজের কানেই যেন ভালো লাগতে লাগল, বাস্তবিক মাঝে মাঝে সরস্বতী এসে যেন বাণী দেন তার গলায়। একটা স্বর্গীয় দৃষ্টিনিক্ষেপ করে রজনিকে সে অভিভূত করে দেবার চেষ্টা করলে।
কিন্তু রজনি তবু হাসে। দাঁত-ঝরে-যাওয়া মাড়ির ভেতর দিয়ে খানিক কালো হাসি বেরিয়ে এল। সোনার বাংলা? কবে ছিল? বুকের রক্ত জল করে আর চোখের জল না ফেলে দু-মুঠো ভাত কোনোদিন জোটেনি—দশ বছর আগেও নয়। বেগার ছিল, থানার দারোগা ছিল, উচ্ছেদের নোটিশ ছিল। বাড়তির মধ্যে এবার দুঃখের পাত্র পূর্ণ করে দিয়ে দু-মুঠো ভাতও অদৃশ্য হয়েছে। সেই লজ্জা আর অপমান-মেশানো রাঙা বাগড়া চালের ভাত আর লাফা শাকের তেতো চচ্চড়ি, এই কি সোনার বাংলার রূপ? হয়তো হবে!
কিন্তু ঠাণ্ডায় আর দাঁড়াতে পারছে না রজনি। মাঠের ওপার থেকে হাওয়া আসছে, হাড়ের ভেতর বাজছে ঝনঝনানি। গায়ের ধোকড়াটাও যেন বরফে তৈরি। অথচ সামনে দাঁড়িয়ে প্যারিলাল বক্তৃতা দিচ্ছে সোনার বাংলার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে। চুরুটের ধোঁয়া চাকার মতো গোল হয়ে তার মাথার চারদিকে যেন স্বর্গীয় দীপ্তিমন্ডল সৃষ্টি করেছে। ফার কোটের রোঁয়ার ওপরে জমেছে হিমের কণা; চিকচিক করে জ্বলছে, যেন অশরীরী জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
তারপর, কিছু ডিমের জোগান দিতে হবে যে।
ডিম! ডিম এখন পাওয়া বেজায় শক্ত বাবু।
তা হলে তো চলবে না। স্বর্গদূত আবার একটা মহিমময় দৃষ্টি প্রক্ষেপ করে রজনিকে বশীভূত করবার চেষ্টা করলে, দামের জন্যে আটকে থাকবে না।
কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে? দাঁতে দাঁতে ঠকঠক করে বাজিয়ে রজনি বললে, আর যে শীত! ঘর থেকে বেরুতে গেলে হাত-পা যেন ফেটে যায়। বৃষ্টিও পড়ছে।
ওই তো, ওই তো। প্যারিলাল ভঙ্গি করল, গায়ে অত বড়ো একটা চটের ধোকড়া, আবার শীত কীসের রে? ব্যাটারা বাবুয়ানি করেই গেলি। নে, আড়াই টাকা করে ডজন পাবি। কাল অন্তত তিন ডজন জোগাড় রাখবি—যেখান থেকে হোক, যেমন করে হোক।
কোটের জ্যোতির্ময় রোঁয়াগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে যেন ধোঁকা লেগে যায় রজনির। শরীরের সমস্ত অঙ্গগুলো অসাড় হয়ে এসেছে, চোখের সামনে ঘুরছে ধোঁয়ার কুন্ডলী।
চেষ্টা করব বাবু।
চেষ্টা নয়, চাই-ই চাই। মনে থাকে যেন। ভারী জুতোর শব্দ করে প্যারিলাল চলে গেল।
ঘরের মধ্যে সারদা ছেলেমেয়ে নিয়ে বিব্রত হয়ে আছে। বছর আটেক ছেলেটার বয়েস–ম্যালেরিয়ায় চুষে নিংড়ে খেয়েছে তাকে। পেটের পিলেটা এমন ফুলেছে যে, আশঙ্কা হয় একদিন ওটা তাকে হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। ক্যালশিয়ামের অভাবে অপুষ্ট হাড়গুলো প্যাঁকাটির মতো শীর্ণ, হঠাৎ একটুখানি ঘা লাগলে যেন মট করে ভেঙে যেতে পারে। একটা ছেড়া চট জড়িয়ে সেও থরথর করে কাঁপছে। মাঝে মাঝে মাটির একটা মালসা থেকে খানিক শুকনো ভাত থাবায় থাবায় মুখে পুরছে। ম্যালেরিয়ায় পথ্যই বটে।
