তাই আট মাস পরে এই চমৎকার চটি-জোড়া উপহার এসেছে। আট মাস আগেকার সে রাত্রি এখন স্বপ্ন হয়ে যাওয়াই ভালো, কিন্তু এই চটিজোড়া অতি মনোরম বাস্তবা পায়ে দিয়ে একবার হেঁটে দেখলাম, যেমন নরম, তেমনি আরাম।
ডিম
নদীর ওপারে বড়ো জংশনটার পাশে মিলিটারি কলোনি। আগে প্রায় ষাট-সত্তর বিঘে জুড়ে ধু-ধু করত অনাবাদি জমি—প্রকৃতির অভিশাপ লাগা মরা মাটি। ধান-পাট দূরে থাক, একমুঠো কলাই বুনেও ওখান থেকে কেউ ঘরে তুলতে পারত না। তবু পৃথিবীতে যাদের প্রাণশক্তি সবচাইতে বেশি, সেই ঘাসের বিবর্ণ আর কুশের আগার মতো তীক্ষ্ণঅঙ্কুরগুলো ইতস্ততভাবে সমস্ত মাঠখানাকে আকীর্ণ করে রাখত। হাড়-বের-করা গোরুর পাল খিদের জ্বালায় ওখানে খাদ্যের সন্ধান করত। ধারালো ঘাসের আগায় মুখ কেটে গিয়ে টপ টপ করে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ত আর তৃষ্ণার্ত মাটি চোঁ চোঁ করে এক চুমুকে সেই রক্ত শুষে নিত।
সেই মাঠ। বিশ্বকর্মার হাতুড়ির ঘা পড়েছে। দেহাতি মানুষগুলো দূর থেকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। একপাল চখাচখির মতো সাদা সাদা তাঁবু আর খড়ের চালাগুলো যেন ঝাঁক বেঁধে আকাশ থেকে উড়ে পড়েছে ওখানে। রাত্রে বিদ্যুতের ঝলমলে আলো-মায়াপুরী।
ওদেরই দাবি। সামগ্রিক যুদ্ধের দাবি। রোজ পাঁচশো করে ডিম জোগাতে হবে। কোথায় পাওয়া যাবে এত ডিম? পেটের দায়ে তোক হাঁস-মুরগি বেচে খেয়েছে, তিনখানা গ্রাম ঘুরলে এক কুড়ি জোগাড় করা যায় না। মেজাজ যেদিন চড়ে যায় সেদিন প্যারিলাল ভাবে, মানুষ কেন ডিম পাড়তে পারে না? আর ঘোড়া? তা হলে পাঁচশোর জায়গায় পঞ্চাশটা দিয়েই ওদের রাক্ষুসে পেটগুলো ভরানো চলে।
বড়দিন আসছে, হ্যাপি নিউ ইয়ার। ক্রিসমাস কেক চাই, আর চাই নববর্ষের প্রীতিভোজ। সুতরাং ডিমের দাবি দাঁড়িয়েছে এক হাজারে। প্যারিলাল বিড়বিড় করে বকতে লাগল। ডিম যেন তার দিন-রাত্রের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে। রাত্রে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে— আকাশে তারা নেই, শুধু রাশি রাশি জ্যোতির্ময় ডিম ওখানে আলোকবিস্তার করছে। মাটি দিয়ে মানুষ চলছে না, শুধু হাত-পাওয়ালা একদল ডিম মিলিটারি ভঙ্গিতে মার্চ করে চলেছে— রাইট-লেফট, অ্যাবাউট টার্ন, কুইক মার্চ।
খেপে গিয়ে প্যারিলাল হাত-পা ছুঁড়তে লাগল। কী হয় একরাশ চিল-শকুনের ডিম সাপ্লাই দিলে? কামান আর বোমা যারা অক্লেশে হজম করতে পারে, শকুনের ডিম তো তাদের কাছে নস্যবিশেষ। কিন্তু তাই-বা পাওয়া যাবে কোথায়? রেললাইনের ধারে বসে যে-শকুন কাটাপড়া সাপ আর কুকুরের মাংস নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করত, কিংবা টেলিগ্রাফের তারে যেসব চিল নীচের জলা থেকে মাছের আশায় ধ্যানস্থ থাকত, মিলিটারি টার্গেট প্র্যাকটিসের চোটে তারা প্রায় নির্বংশ হয়েছে। এখন এই দুর্দান্ত দুঃসময়ে মানুষে যদি কিছু কিছু ডিম পাড়তে পারত, তাহলে এই মহাসংকট থেকে উদ্ধার পেত প্যারিলাল।
মেজর সাহেব পিঠ চাপড়ে দিয়ে প্যারিলালকে যেন জল করে দিলে।
ট্রাই, ট্রাই গুড বয়, ট্রাই এগেন।
সাহেবের সামনে নিতান্তই ক্রাই করা যায় না, তাহলে কাপুরুষ বলে বাঙালি জাতির দুর্নাম হবে। ডিমের সন্ধানেই যাত্রা করতে হল।
শীতের বিকেল। সমস্ত আকাশটা যেন মূৰ্ছিত হয়ে আছে মেঘের চাদর মুড়ি দিয়ে। টিপটিপ করে মাঝে মাঝে বৃষ্টি পড়বার চেষ্টা করছে, আবার কনকনে হাওয়ায় জলের বিন্দুগুলো উড়ে যাচ্ছে দিগন্তে। পায়ের নীচে পাশাপড়া ঘাসে যেন তুলোর আঁশ জড়িয়ে রয়েছে। মনে হয় অসহ্য ঠাণ্ডায় শরীরের হাড়-মাংসগুলো সব আলাদা হয়ে যাবে।
পায়ে দুটো মোটা মোটা মোজা পরলে প্যারিলাল। দু-হাতে পুরু দস্তানা। মাফলারটাকে কানে আর গলায় শক্ত করে জড়িয়ে একটা গেরো বাঁধলে বুকের ওপর। তারপর গায়ে চড়াল ফিকে নীল রঙের মোটা ওভারকোটটা। ব্যাস, শীতের সাধ্য কি এইবারে তার কাছে ঘেঁষতে পারে।
ওভারকোটের ওপর সস্নেহে এক বার হাত বুলিয়ে নিলে প্যারিলাল। সত্যিই খাসা জিনিস। কাশ্মীরি ফার, যেমন মোলায়েম, তেমনি গরম। এক বার গায়ে ওঠাতে পারলে বাংলা দেশের শীত তো দূরের কথা, উত্তর মেরুতে গিয়ে অবধি নিশ্চিন্ত থাকা চলে। এই যুদ্ধের বাজারে দুশো টাকা ধরে দিলেও এখন এমন একটা কোট পাওয়া যাবে না। মিলিটারি মাল, একটু কাঁচা বা খেলো কারবার নেই কোনোখানে।
কোটটা পরতে পরতে প্যারিলালের মন অকারণেই অত্যন্ত খুশি হয়ে উঠল। জীবনে কোনো দুঃখই অবিমিশ্র নয়, সব কিছু বিড়ম্বনারই সান্ত্বনা আছে একটা। মেজর সাহেবের বিশ্বগ্রাসী ডিমের ক্ষুধা তাকে বিব্রত করে তোলে বটে, কিন্তু একথাটাও কোনোমতে ভুললে চলবে না যে, এই কোটটা তিনিই তাকে বকশিশ করেছেন। তাঁর কাছে প্যারিলালের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
কিন্তু কোথায় ডিম? আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের দৈত্যটা যদি এখন তার সামনে এসে দাঁড়ায় তাহলে একটি মাত্র প্রার্থনাই তার করবার আছে। ঐশ্বর্য নয়, ধনসম্পত্তি নয়, চীন দেশের বোঁচা নাক রাজকন্যাও নয়–ডিম দাও প্রভু, ডিম দাও। জোগাড় করতে না পার, পেড়ে দাও। একটা নয়, দুটো নয়, এক কুড়ি নয়, পাঁচ কুড়িও নয়। হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি, অবুদ অবুদ—এমন একটা ডিমের পাহাড় খাড়া করে দাও যে, তার চুড়োটা যেন মাউন্ট এভারেস্টের চুড়োকেও ছাড়িয়ে ওঠে। হায় আলাদিন! রক পাখির ডানার সঙ্গে সঙ্গে সে-দিনগুলোও উড়ে গেছে চিরকালের মতো!
