লটারির টিকিট? আমি কিনব না–বেরোও।
স্যার, রাস্তার গনৎকার বলেছিল, এটা লাকি নাম্বার লাগবার চানস আছে। আপনি কপালে লোক, পেয়ে যাবেন। নিয়ে নিন। একসফাইভ এইট এইট
রাস্তার গনৎকার? জোচ্চোর।
স্যার, অত অবিশ্বাস করতে নেই। কিসে যে কী হয় বলা যায় না। নিতান্তই খিদের জ্বালায় এটা আপনাকে বেচতে এসেছি। বেশ– এক টাকা না দেন, বারো আনাই দিন।
বেরোও।
আজ্ঞে, আট আনা? ছআনা? অন্তত চার আনাই দিন তা হলে খিদেয় ভারি কষ্ট পাচ্ছি স্যার
গেট আউট গেট আউট।
ঘর ফাটিয়ে চিৎকার করলেন গোপেশবাবু। লোকটা হকচকিয়ে নেমে গেল রাস্তায়।
ঠিক সতেরো দিন পর। ঠিক বেলা এগারোটা। পাশের বাড়ি থেকে চেয়ে-আনা কাগজটা পড়তে পড়তে
হঠাৎ প্রবল একটি লাফ।
সেই লটারির ড্র। এবং প্রথম প্রাইজ তিন লক্ষ টাকা একস ফাইভ এইট এইট জিরো সেভেন। অবশ্য, ফাইভ এইট এইট পর্যন্ত শুনেছিলেন গোপেশবাবু লোকটাকে আর পাত্তাই দেননি।
কিন্তু কে বলতে পারে যে, তারপরে জিরো সেভেন ছিল না। আর রাস্তার গনৎকার বলেছিল, লাকি নাম্বার। লোকটা বলেছিল, আপনি কপালে লোক পেয়ে যাবেন।
গেল–গেল–গেল আমার তিন লক্ষ টাকা ডুকরে কেঁদে উঠলেন গোপেশবাবু।
দৌড়ে এল বাড়িসুদ্ধ লোক। চ্যাঁচাতে-চ্যাঁচাতে রাস্তায় বেরুলেন গোপেশবাবু ধরো-খোঁজো সেই লোকটাকে খাকী হাফ শার্ট রং কালো-রোগা–খেতে পায় না
— কিন্তু পনেরো দিন আগে যে এসেছিল আজ আর কে ধরবে তাকে কলকাতার রাস্তায়? বরং গোপেশবাবুকেই জাপটে ধরতে হল সবাইকে, নইলে একটা ডবল-ডেকারের তলায় চাপা পড়তেন ভদ্রলোক।
মুখে ফেনা তুলে চ্যাঁচাচ্ছেন তখনও : ধরো লোকটাকে আমার তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল।
এখন গোপেশবাবু বদ্ধ পাগল। মানে– দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হয় তাঁকে।
টুটুনের প্রতিজ্ঞা
এখন হয়েছে কী, ক্লাসে মাস্টারমশায় যেই ঠাট্টা করে বলেছেন, বেগুন মানে কোনও গুণ নেই, খেলে চুলকোনা হয়,–অমনি কথাটা বড়বড় কান পেতে শুনেছে টুটুন। আর যেই শুনেছে, অমনি কান থেকে কথাটা গিয়ে মাথার মধ্যে ঢুকেছে। বেগুনের কোনও গুণ নেই–বেগুন খাওয়া কখনও উচিত নয়।
ড্রয়িংয়ের খাতায় অনেক কালি-টালি ঢেলে অনেক কষট করে একটা বেগুন এঁকেছিল টুটুন। একটুখানি লাউয়ের মতো দেখতে হয়েছিল বটে, তবু ওটাকে বেগুন বলেই মনে হওয়া উচিত কারণ বেগুনে রঙের লাউ কি কোনও দিন কেউ দেখেছে? আজ স্কুল থেকে ফিরে ড্রয়িংয়ের খাতাটা খুলেই যেন টুটুনের সারা গায়ের মধ্যে চিড়বিড় করতে লাগল। তখুনি টুটুন ছবিটাকে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলল।
পরের দিনটা ছিল রবিবার। আর সেদিন খেতে বসেই একটা ভীষণ গণ্ডগোল বেধে গেল।
বাড়িতে একটা মস্ত ইলিশমাছ এসেছে আর টুটুন তো ইলিশমাছ খেতে ভীষণ ভালোবাসে। অবিশ্যি গাদার মাছে খুব কাঁটা, তা সে খেতে পারে না। মা তাকে পেটির মাছই দেন।
রবিবারে মা-ই রান্না করেন, ঠাকুর শুধু সেদিন জোগান দেয়। আজও মা ইলিশমাছের ঝোলটা নিজের হাতে যত্ন করে বেঁধেছেন আর একটা বড়ো পেটি দিয়েছেন টুটুনকে খেতে। কিন্তু সেই পেটির সঙ্গে কী সর্বনাশ–দুটুকরো বেগুন।
টুটুন অমনি লাফিয়ে উঠে বললে, আমি বেগুন খাব না।
মা বললেন, কচি বেগুন–খা। ভালো লাগবে।
টুটুন মাথা নেড়ে বললে, না–খাব না। বেগুন খেলে চুলকোনা হয়।
মা হেসে বললে, তোকে ডাক্তারি করতে হবে না, তুই খা।
না।
মা তখনও হাসছিলেন, বললেন, তোকে তো আর এক সের বেগুন পুড়িয়ে খেতে বলছে কেউ। খেয়ে নে টুটুন–গোলমাল করিসনি।
না–না।
মার হাসি বন্ধ হয়ে গেল।
খাবি না?
না।
মা এমনিতে ছোটখাটো আর হাসি-হাসি হলে কী হয়, কলেজে প্রফেসারি করেন কিনা–আসলে মেজাজটা খুব কড়া। তখুনি সেই মস্ত মাছের পেটিসুদ্ধ বাটিটাকে সরিয়ে নিলেন। বললেন, তবে খেয়ো না। কিন্তু বেগুন না খেলে মাছ পাবে না, এ-ও তোমাকে বলে দিচ্ছি।
টুটুনের দুঃখে কান্না আসছিল, কিন্তু তখন মনে পড়ল, তার এগারো বছর বয়েস হল, সে পুরুষ মানুষ, এখন তার জেদ হওয়া উচিত। বেশ, মাছ আমি খাবই না। চোখের জল চেপে, ডাল-তরকারি-ভাজা দিয়ে খেয়েই উঠে গেল সে।
তারপর সারাদিন মন খারাপ-ভীষণ মন খারাপ! মা-ও এমন যে তাকে আর একবার সাধলেন না পর্যন্ত। ঠিক আছে।–বেগুন সে আর খাবেই না সারাজীবন।
সেদিন বিকেলে টুটুন তাই ফরসা জামা পরল না, ভালো করে চুল আঁচড়াল না, যে দুধরুটি তার বরাদ্দ তার অর্ধেকটাই বাড়ির লোভী হুলো বেড়াল কার্তিককে খাইয়ে দিলে। (কার্তিক মাসে জন্মেছিল কিনা–তাই ওই নামটা) তার পরেই সুড়ৎ করে চলে গেল তার বন্ধু অতনুদের বাড়িতে।
অতনুর মা ওকে দেখে ভীষণ খুশি হলেন। বললেন, আয় আয়, তোর কথা ভাবছিলুম। তুই যখন বাড়ি যাবি, তখন একটা জিনিস সঙ্গে দেব তোর। তোর মাকে দিস।
এখন, অতনুদের দেশ হল জয়নগরে। সেখানে খুব ভালো মোয়া তৈরি হয় আর প্রায়ই এক-আধ হাঁড়ি দেশ থেকে আনা মোয়া টুটুনদের বাড়ি যায়। টুটুন তখন অতনুর সঙ্গে ক্যারাম খেলছিল। শুনেই তার টিপ ফসকে স্ট্রাইকারটা গর্তে গিয়ে পড়ল। টুটুন বললে, কী দেবেন মাসিমা, মোয়া বুঝি?
অতনুর মা হেসে বললেন, না, মোয়া নয়। আজ দেশ থেকে খুব বড় বড় বেগুন এসেছে–তাই গোটা চারেক দিয়ে দেব সঙ্গে।
বেগুন!
শুনেই টুটুনের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এখানেও সেই সর্বনেশে বেগুন! অতনুর মা পাটিসাপটা পিঠে ভাজছিলেন কিন্তু টুটুনের মনে হল, পাটিসাপটার চাইতে খারাপ জিনিস আর কিছু নেই। তক্ষুনি টুটুন উঠে পড়ল।
