অতনু খেলায় জিতছিল কিনা, তাই টুটুনকে টেনে ধরল।
–এই কোথায় যাচ্ছিস?
–একটা ভুল হয়ে গেছে ভাই এক্ষুনি আসছি
— বলেই দৌড়। এমন দৌড় যে, রাস্তার একটা রিকশাওয়ালা তাকে ভীষণ বকল।
এই খোকাবাবু, অ্যাইসা দৌড়ো মৎ রাস্তামে কেতনা গাড়ি হ্যায়—
কিন্তু টুটুন কোনও কথা শুনল না। ছুটতে ছুটতে ছুটতে শেষে হৃষীকেশ পার্ক পেরিয়ে একেবারে বিদ্যাসাগর স্ট্রিটে ছোটপিসিমার বাড়িতে।
অবিশ্যি ছোটপিসিমার বাড়িতে টুটুনের যেতে বারণ নেই। মোটে একটা বড় রাস্তা পেরুতে হয় কিনা। আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেখানে থেকে ফিরে আসা চলে।
পিসেমশাই সেদিন কোথায় যেন মাছ ধরতে গেছেন ফিরতে রাত হবে। তাই ছোটপিসিমা একা একা তাঁর দেড় বছরের ছেলে–মানে টুটুনের পিসতুতো ভাই কিংকংকে নিয়ে বসেছিলেন আর উল বুনছিলেন। অবিশ্যি কিংকং নাম বলে সে আসলে দেখতে খারাপ নয়–তার ভালো নাম দীপঙ্কর বেশ মিষ্টি আর গোলগাল চেহারা।
কিংকং একটা কাঠের বাঘ নিয়ে তার মুণ্ডটা চিবুচ্ছিল, আর তার মুখ থেকে লাল পড়ছিল। একটু আগেই কেঁদেছিল নিশ্চয়, তাই কাজল-টাজল গলে গালে-টালে লেগে গিয়েছিল। ছোটপিসিমা একটা বেতের মোড়ায় চটি পায়ে দিয়ে বসে উল বুনছিলেন–কিংকং মধ্যে মধ্যে চটি ধরে টানাটানি করলে আঃ বলে পা সরিয়ে নিচ্ছিলেন।
ছোটপিসিমা বললেন, আয় টুটুন–আয়। বৌদি ভালো আছে–ছোটা ভালো আছে? বৌদি টুটুনের মা আর ছোটদা তার বাবা।
টুটুন জানাল, সবাই ভালো আছে, এমন-কি কার্তিক পর্যন্ত ভীষণ ভালো আছে। তার পর টুটুন অনেকক্ষণ পর্যন্ত খেলা দিল কিংকংকে হালুম হালুম করে বাঘের ডাক ডেকে তাকে ভয় দেখাতে চাইল। কিন্তু কিংকং কি আর ওতে ভয় পায়? শাদা শাদা ছোট-ছোট দাঁতে তার কী খিলখিল হাসি।
তার পরে যখন ছোটপিসিমার ঝি মণিমালা এসে কিংকংকে জোর করে দুধ খাওয়াতে নিয়ে গেল, তখন ছোটপিসিমা উল রেখে উঠলেন। বললেন, খিদে পেয়েছে টুটুন?
খিদে নিশ্চয় পেয়েছে। এমনিই তো দুপুরে ভালো করে সে খায়নি, বিকেলে রুটি-দুধ তো সবটাই গেছে কার্তিকের পেটে। তবু টুটুন বললে, না, খিদে পায়নি।
ছোটপিসিমা বললেন, আচ্ছা–বোস। আমি আসছি।
তিনি রান্নাঘরে উঠে গেলেন, স্টোভ জ্বাললেন, কী যেন ভাজতে লাগলেন। টুটুনের খিদেটা ক্রমেই বাড়তে লাগল, একবার ইছে হল তিনি কী ভাজছেন দেখে আসে। কিন্তু টুটুন জানে, পুরুষ মানুষের রান্নাঘরে যেতে নেই। টুটুন বসে বসে পিসেমশায়ের একটা ইংরেজী পত্রিকা নিয়ে তার রঙিন ছবি দেখল। একটা সাদা কালো বেড়াল যাচ্ছিল প্রাচীর দিয়ে তাকে চুক চুক-আ-আ করে ডাকল, সে একবার ম্যা-আও বলে সাড়া দিয়ে কোথায় যেন লাফিয়ে চলে গেল। আর টুটুনের খিদে বাড়তে লাগল–দারুণ বাড়তে লাগল, মনে হল, কতদিন যেন তার খাওয়া হয়নি।
তখন ছোটপিসিমা একটা প্লেটে কী যেন গরম ভাজা নিয়ে ঢুকলেন। তার গন্ধেই টুটুনের মন দুলে উঠল। পিসিমা হেসে বললেন, ভালো বেগুন এসেছে, কটা বেগুনি ভাজলাম তোর জন্যে।
এখানেও বেগুনি! টুটুন গুম হয়ে রইল।
তার পরে কী হল? টুটুন এক দৌড়ে পালিয়ে গেল সেখান থেকে? আর নানা! খিদের মুখে কি আর অমন প্রতিজ্ঞা রাখতে পারে কেউ?
আর তা ছাড়া কে না জানে–গরম বেগুনি খেতে ভালো লাগে, ভীষণ ভালো লাগে।
টোপ
সকালে একটা পার্সেল এসে পৌঁছেছে। খুলে দেখি এক জোড়া জুতো।
না, শত্রুপক্ষের কাজ নয়। এক জোড়া পুরোনো হেঁড়া জুতা পাঠিয়ে আমার সঙ্গে রসিকতার চেষ্টাও করেনি কেউ। চমৎকার ঝকঝকে বাঘের চামড়ার নতুন চটিা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়, পায়ে দিতে লজ্জা বোধ হয় দস্তুর মতো। ইচ্ছে করে বিছানায় শুইয়ে রাখি
কিন্তু জুতোজোড়া পাঠাল কে? কোথাও অর্ডার দিয়েছিলাম বলেও তো মনে পড়ছে না। আর বন্ধুদের সব কটাকেই তো চিনি, বিনামূল্যে এমন এক জোড়া জুতো পাঠানোর মতো দরাজ মেজাজ এবং ট্যাঁক কারো আছে বলেও জানি না তাহলে ব্যাপারটা কী?
খুব আশ্চর্য হব কি না ভাবছি, এমন সময় একখানা সবুজ রঙের কার্ড চোখে পড়লো। উইথ বেস্ট কমপ্লিমেন্টস অব রাজাবাহাদুর এন. আর. চৌধুরী, রামগঙ্গা এস্টেট!
আর তখুনি মনে পড়ে গেল। মনে পড়ল আট মাস আগেকার এক আরণ্যক ইতিহাস, একটি বিচিত্র শিকার-কাহিনী।
রাজাবাহাদুরের সঙ্গে আলাপের ইতিহাসটা ঘোলাটে, সূত্রগুলো এলোমেলো যতদূর মনে হয়, আমার এক সহপাঠী তার এস্টেটে চাকরি করত তারই যোগাযোগে রাজাবাহাদুরের এক জন্মবাসরে আমি একটা কাব্য-সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করেছিলাম। ঈশ্বর গুপ্তের অনুপ্রাস চুরি করে যে প্রশস্তি রচনা করেছিলাম তার দুটো লাইন এই রকম —
ত্রিভুবন-প্রভাকর ওহে প্রভাকর,
গুণবান মহীয়ান হে রাজেন্দ্রবর।
ভূতলে অতুল কীর্তি রামচন্দ্র সম—
অরাতি-দমন ওহে তুমি নিরুপম।
কাব্যচর্চার ফললাভ হল একেবারে নগদ নগদ। পড়েছি—আকবরের সভাসদ আবদুর রহিম খানখানান হিন্দী কবি গঙ্গের চার লাইন কবিতা শুনে চার লক্ষ টাকা পুরষ্কার দিয়েছিলেন। দেখলাম সে নবাবী মেজাজের ঐতিহ্যটা গুণবান মহীয়ান অরাতিদমন মহারাজ এখনো বজায় রেখেছেন। আমার মতো দীনাতিদীনের ওপরেও রাজদৃষ্টি পড়ল, তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন, প্রায়ই চা খাওয়াতে লাগলেন, তারপর সামান্য একটা উপলক্ষ্য করে দামী একটা সোনার হাতঘড়ি উপহার দিয়ে বসলেন এক সময়ে সেই থেকে রাজাবাহাদুর সম্পর্কে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হয়ে আছি আমি। নিছক কবিতা মেলাবার জন্য বিশেষণগুলো ব্যবহার করেছিলাম, এখন সেগুলোকেই মন-প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতে সুরু করেছি।
