একটু দাঁড়ান। মুকুন্দবাবুর ঘরের দরজা খোলা ছিল?
বরাবরই থাকে। আমরা দুভাই-ই দরজা খুলে ঘুমোই।
মারাত্মক অভ্যেস, এ কাজ কখনও করা উচিত নয়। সে যাক, তারপরে কী দেখলেন?
টর্চ ফেলে দেখি, একটা ঘুসকো জোয়ান লোক মুকুন্দর বুকে চেপে বসেছে, সে গোঁ গোঁ করছে। আমি কিছু করবার আগেই অন্ধকারে কারা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, হাত-মুখ বেঁধে ফেলল, আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম। যখন জ্ঞান হল, কত রাত জানি না। টের পেলাম বারান্দায় পড়ে আছি। উঠতে পারলাম না, কিছু করতেও পারলাম না–ছটফট করলাম সমানে। আবার জ্ঞান হারালাম। সকালে কখন যে বনমালী, মানে আমাদের চাকরটা এসেছে, সব দেখেছে, আপনাদের খবর দিয়েছে
ভালো কথা, আপনার টর্চ কী হল?
ধ্বস্তাধ্বস্তির সময় আমার হাত থেকে ঠিকরে পড়ে গিয়েছিল জ্বলন্ত টর্চটা। ওই ঘরেই কোথাও আছে নিশ্চয়।
হাঁ, সেটাকে আমারা ও-ঘরের একটা কোণায় পেয়েছি। এখন আর দুএকটা কথার জবাব দিন। বাইরে থেকে আপনাদের বাড়িতে লোক ঢুকল কী করে? সদর তো আপনি নিজের হাতেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ওরা নয় খুলেই বেরিয়ে গেছে, কিন্তু ঢুকল কোন্ রাস্তা দিয়ে?
পাশেই তো কানাগলি। বাড়ির রেন-ওয়াটার পাইপ সেখানে। সেটা বেয়ে লোকটা ছাতে উঠেছে। ছাতের দরজা বন্ধ করা হয়নি। আমরাও তো ঘর খুলেই রাখি।
ঠিক। তাহলে মুকুন্দবাবু হীরে এনেছিলেন কাল?
সেই রকমই বলছিল। কোন্ রানীর হীরে–খুব দামী, যাচাই করতে দিয়েছিল। বোধহয় সেই লোভেই
হ্যাঁ, সেই লোভেই।–মৃদু হেসে রাজেশবাবু বললেন, সেই লোভেই নিজের ভাইকে আপনি খুন করেছেন নন্দবাবু। তারপর চাকর বনমালীকে দিয়ে হাত-মুখ বাঁধিয়ে নিতে বেশি অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।
নন্দবাবুর মুখটা ঝুলে পড়ল। হঠাৎ তারপরেই তিনি চেঁচিয়ে উঠলেব : কী বলছেন আপনি পাগলের মতো? নিজের ভাই মুকুন্দকে আমি খুন করব?
লোভ নন্দবাবু, লোভ। মানুষ পশু হয়ে যায়। কিন্তু নিজেকে নিজেই ধরিয়ে দিয়েছেন আপনি। টর্চের কায়দা না করলেই পারতেন।
অ্যাঁ?-নন্দবাবু হাঁ করে রইলেন।
নন্দবাবু, ঘটনাটা রাত সাড়ে দশটার। বেলা সাড়ে সাতটা এখন। আপনার টর্চ এখনও পুরো তেজে জ্বলছে। কোনও ছোট্ট দুসেলের টর্চে অমন অলৌকিক ব্যাটারি থাকে না নন্দবাবু। অতএব দয়া করে উঠুন এবং থানায় চলুন। আপনার বনমালীকেও সহযাত্রী করতে হচ্ছে, কারণ সেও আপনার সহযোগী– হীরে বিক্রির ভাগ সেও পেত নিশ্চয়ই।
মাথায় শিকড়-পড়া সাপের মতো নন্দবাবুর ঘাড় নুয়ে এল।
টিকেট
গোপেশ্বরবাবু পাগল হয়ে গেলেন।
পাগল হওয়ার পাত্র তিনি নন– বলাই বাহুল্য। খুব ঠাণ্ডা মাথার লোক, বেজায় হিসেবি। আর এতই হিসেবি যে বাড়ির চাকর বাজার করে এনে পাঁচ পয়সার হিসেব ভালো করে দিতে পারেনি বলে তার মাস-মাইনের তিন টাকা কেটে তাকে তাড়িয়ে দিলেন তিনি।
যেমন অগাধ টাকা, তেমনি কৃপণ। একজোড়া জুতোয় পাঁচ বছর চলে, একটি জামায় এক বছর। ছেলে সস্তায় একটা গোটা ইলিশ কিনে এনেছিল বলে রেগে আগুন।
অ্যা– একটা আস্ত ইলিশ। পাঁচ টাকা দিয়ে। তুই তো আমায় ফতুর করবি দেখছি। বেরো– এক্ষুনি বেরিয়ে যা বাড়ি থেকে
চটবার কথাই। যে বাড়িতে হপ্তায় একদিন দুশো গ্রাম কুচো চিংড়ি আসে, সেখানে একটা গোটা ইলিশ! ছেলে রেগেমেগে মিলিটারিতে চাকরি নিয়ে হায়দ্রাবাদে রওনা হল। গোপেশবাবু বললেন, বাঁচা গেল।
এহেন গোপেশবাবু পাগল হয়ে গেলেন। কিন্তু কেন গেলেন, সেইটেই বলি।
সেদিন বেলা এগারোটা নাগাদ তিনি বাইরের ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। কাগজটা পাশের বাড়ি থেকে চেয়ে-আনা- নিজে অবশ্যই তিনি পয়সা দিয়ে কাগজ কেনেন না।
এমন সময় একটি লোক। গায়ে ময়লা হাফশার্ট, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, পরনে হাঁটু পর্যন্ত ছোট ধুতি এবং পায়ে জুতো নেই। রং ঘোর কালো, রোগা চেহারা।
দেখেই গোপেশবাবু বুঝে নিলেন।
মাপ করো বাবা, এখানে কিছু হবে না।
লোকটি বললে, ভয় পাবেন না সাহায্য চাইতে আসিনি।
তবে কী জন্যে? চাকরি? আমার বাড়িতে কাজের লোক দরকার নেই এখন।
আজ্ঞে, আমি চাকরি চাই না।
তবে।–আশ্চর্য হয়ে গোপেশবাবু বললেন, আমাকে দেখতে এসেছ নাকি?
লোকটি ফিক করে হাসল : আজ্ঞে, দেখবার মতো লোক তো আপনি বটেই। করতেন ফুটপাথে আলু বিক্রি এখন সাতখানা বাড়ির মালিক। একেই বলে চলে কর্মবীর! আপনার মতো লোককে দেখলেও তো পুণ্যি হয়।
গোপেশবাবু ভাবলেন, খুশি হওয়া উচিত, কিন্তু ফুটপাথে আলু বিক্রির কথাটা মনে করিয়ে দেওয়া তাঁর ভালো লাগল না।
বললেন, ঠিক আছে- ঠিক আছে দর্শন তো হল। এবার কেটে পড়ো।
সে বললে, জলেই জল বাধে টাকাই টাকা আনে। একখানা লটারির টিকিট কিনবেন স্যার! আপনি কপালে লোক, নির্ঘাত পেয়ে যাবেন।
লটারির টিকিট। শুনেই গোপেশবাবু শক্ত হলেন। তিনি এসবে বিশ্বাস করেন না। আর কোনও কারণ নয়, তাঁর ধারণা– ওগুলো স্রেফ ধাপ্পাবাজি। ওদের সব নিজেদের লোকের সঙ্গে সাঁট থাকে তাদেরই দিয়ে দেয়। আর যত বোকারা আশায়-আশায় টিকিট কিনে টাকা নষ্ট করে।
অ, তুমি বুঝি লটারির এজেন্ট? দোকান বসিয়ে কুলোয় না- তাই বাড়ি বাড়ি হানা দাও? যাও যাও ও-সবের মধ্যে আমি নেই।
না স্যার আমি এজেন্ট নই। কাল এক টাকা দিয়ে একটা কিনেছি। কিন্তু বেকার লোক স্যার আজ দেখছি এ-বেলা যে দুখানা রুটি কিনে খাব, তারও সংস্থান নেই। সেই টিকিটটা আপনাকে বেচতে চাই– পকেট থেকে একটা টিকিট বের করল :একস-৫৮৮
