অরুণ প্রাতের তরুণদল
চল রে চল রে চল
সেই টিকটিকির মতো মুখওলা কালো চশমা-পরা ভদ্রলোক সেই-যে আমাদের গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে কথা বন্ধ করলেন, আর তাঁর সাড়াশব্দ নেই। খালি ঝকরঝকর করে গাড়ি চালাচ্ছেন আর ভ্যাঁপাক-ভ্যাঁপাক করে হর্ন দিচ্ছেন। মাইলপাঁচেক বোধ হয় এই রকম কাটল। তারপর
তারপর সামনে একটা শুকনো নদী। রাস্তাটা তার মধ্যে গিয়ে নেমে তারপর আবার একটা উঁচু ডাঙায় গিয়ে ঠেলে উঠেছে। গাড়িটা ঝাঁকুনি খেতে-খেতে গড়গড়িয়ে নদীতে বেশ নেমে গেল, এক আঁজলা জল আর একরাশ নুড়ি পেরিয়ে নদীর এপারেও চলে এল, তারপর উঁচু ডাঙাটার সামনে এসেই ক্যাচাং। মানে ডেড-স্টপ!
আমরা বললুম, কী হল মশাই, থেমে গেল যে!
আবার পোকা-খাওয়া তিনটে দাঁত বের করে ভদ্রলোক হাসলেন, এই ইয়ে– ক্র্যাচটা ঠিক ধরছে না মনে হচ্ছে। তোমরা যদি নেমে একটু
-মানে, ঠেলতে হবে? আমি ব্যাজার হয়ে জিজ্ঞেস করলুম।
নইলে, ইয়ে মানে, গাড়িটা অতখানি উঠতে পারবে মনে হচ্ছে না। মানে, আমি স্টিয়ারিং ধরছি, তোমরা পাঁচজন রয়েছ, ঠেলে একটু তুলে দাও
নিশ্চয়-নিশ্চয় বলে গজা লাফিয়ে পড়ল। আমাদের দলে ওই সব চাইতে জোয়ান, জিমনাস্টিক করে, এ-সব ঠেলাঠেলির ব্যাপারে ওর বেশ উৎসাহ আছে।
কী করা, আমরাও নামলুম। ভদ্রলোক বিনি পয়সায় মোটর-গাড়িতে চাপাচ্ছেন, তাঁর জন্য অন্তত এটুকু না করলে কি আর ভদ্রতা থাকে।
অতএব মারো জোয়ান হেঁইয়ো! আউড় ঘোড়া হেঁইয়ো। শাবাশ জোয়ান হেঁইয়ো।
খাড়া পাড়ি, ঠেলতে গিয়ে পাঁচজনের স্রেফ কালঘাম ছুটে গেল। মনে হল, পেটের আধপোড়া খিচুড়ি আর আধসেদ্ধ তরকারি একেবারে গলায় উঠে আসছে। তবু জয় বাবা যণ্ডেশ্বর বলে চিৎকার ছেড়ে আমরা গাড়িটাকে একেবারে পাড়ির ওপর তুলে দিলুম।
ঘাম-টাম মুছে, হাঁপিয়ে-টাপিয়ে নিয়ে আমরা গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি– ভদ্রলোক হাঁ-হাঁ করে উঠলেন। বললেন, আরে আরে, উঠছ কেন? আমি তো চাঁইবাসা যাব না– যাচ্ছি ট্যাঁকখালি স্রেফ অন্যদিকে।
তার মানে? ন্যাদা চেঁচিয়ে উঠল : তবে আমাদের গাড়িতে ওঠালেন কেন?
নইলে পাড়ির ওপর ঠেলে তুলত কে? বলেই খ্যাঁকখ্যাঁক করে তিনটে পোকারা দাঁতে হেসে ভদ্রলোক বললেন : গাড়ি ঠেলবার জন্যে কি আর তোমরা সঙ্গে আসতে? এখন বাঁ দিকে মাইল তিনেক হাঁটলে একটা স্টেশন পাবে, আর যদি অরুণ প্রাতের তরুণদল গাইতে-গাইতে জোর পায়ে হেঁটে যাও, তা হলে ঘণ্টা তিনেকের ভেতরে চাঁইবাসাই পৌঁছে যাবে। টা—টা–
গজা গর্জন করে বললে, জোচ্চোর। আমাদের চাঁইবাসায় পৌঁছে না দিয়ে– বলেই, লাফিয়ে উঠতে গেল গাড়িতে। কিন্তু তার আগেই গজার মুখে একরাশ দুর্গন্ধ ধোঁয়া আর এক খাবলা ধুলো ছড়িয়ে ঝকর-ঝকর ঝকাং ঝকাং করতে করতে সেই ঝরঝরে গাবদা গাড়িটা ত্রিশ মাইল স্পিডে জঙ্গলের রাস্তায় হাওয়া হয়ে গেল।
আর অনেক দূর থেকে যেন একবার ভেসে এল থ্যাঙ্কিউ–টাটা—
টর্চ
ইনসপেকটর রাজেশবাবু এসে দেখলেন, নন্দবাবুর হাত-পা-মুখ কষে কাপড় দিয়ে বাঁধা। চোখের তারা কপালে তুলে তিনি গোঁ গোঁ করছেন।
সঙ্গের কনস্টেবল তাঁর বাঁধন খুলে দিল। নন্দবাবু তখনও কথা বলতে পারছেন না–হাঁপাচ্ছেন।
রাজেশবাবু একটু জিরিয়ে নেবার সময় দিলেন। ঢকঢক করে পুরো এক ঘটি জল খেয়ে নন্দবাবু ধাতস্থ হলেন একটু। তারপর হঠাৎ গেঙিয়ে উঠলেন, আমার ভাই মুকুন্দ? তার–তার কী হয়েছে?
একটু বিষণ্ণ মুখে রাজেশবাবু বললেন, আপনাকে দুঃসংবাদ দিচ্ছি, কিছু মনে করবেন না–তিনি খুন হয়েছেন। তাঁর বুকে ছোরা বেঁধানো।
অ্যাঁ!–একটা চিৎকার করে নন্দবাবু অজ্ঞান হয়ে গেলেন!
কিন্তু বেশিক্ষণ পুলিশের সামনে অজ্ঞান হয়ে থাকা যায় না, কাজেই উঠে বসতে হল একটু পরে। রাজেশবাবু পকেট থেকে নোটবই আর পেন্সিল বের করলেন।
দেখুন, লোক ধরবার সময় পরে অনেক পাবেন। কিন্তু হত্যাকারীকে আগে ধরবার চেষ্টা করা দরকার। সুতরাং দয়া করে আমাদের একটু সাহায্য করুন।
ধরা গলায় নন্দবাবু বললেন, বলুন।
আপনি তো পাটের দালালি করেন, আর আপনার ছোট ভাই মুকুন্দবাবু?
ওর একটা জুয়েলারি দোকান আছে রাধাবাজারে। মাঝে-মাঝে দুএকটা হীরে-টিরে সঙ্গে করে বাড়িতে আনত–কী সব পরীক্ষা করত এনে। আমি অনেকবার বলেছি মুকুন্দ, বাড়িতে আমরা দুভাই মোটে থাকি, ওসব সর্বনেশে জিনিস আনিসনি, তা বলতে বলতে নন্দবাবু আবার ডুকরে কেঁদে উঠলেন : আমি বুঝেছি, কালও ওই রকম একটা কিছু বাড়িতে এনেছিল, আর কেউ তাকে ফলো করে
বাধা দিয়ে রাজেশবাবু বললেন, তাই সম্ভব? কিন্তু ওসব পরে হবে। তার আগে বলুন, কাল রাত্রে কী হয়েছিল।
তখন রাত সাড়ে নটা। খেয়ে-দেয়ে আমরা দুভাই শুতে গেলাম। আমরা বরাবরই তাড়াতাড়ি শুই, ভোরে উঠি।
বাড়িতে আর কে থাকে?
কেউ না। আমরা ব্যাচেলর।
থানায় যে-খবর দিয়ে এল–দরজা হাট করে খোলা, আপনি মুখ বাঁধা পড়ে, আপনার ভাই খুন হয়েছেন–আপনাদের সেই চাকরটি কোথায় থাকে?
খ্যাংরাপটিতে। আমাদের রান্নাবান্না করে দিয়ে, নটার মধ্যেই ও খেয়ে বাড়ি চলে যায়। আমি কাল ঠিক নটায় ও চলে গেলে সদর বন্ধ করেছি।
ঠিক নটা? খেয়াল থাকল কী করে?
তখুনি কোথায় একটা পেটা ঘড়িতে নটা বাজছিল।
ঠিক আছে। তারপর বলুন।
তখন দশটা-সাড়ে দশটার বেশি নয়। আমার ঘুম এসেছিল। হঠাৎ পাশে মুকুন্দর ঘর থেকে যেন একটা ধ্বস্তাধ্বস্তি-গোঁ গোঁ আওয়াজ কানে এল। উঠে আলো জ্বালাতে গেলাম জ্বলল না, মেন অফ করে দিয়েছে কেউ। দিনকাল তো জানেন, যখন-তখন কারেন্ট বন্ধ হয়ে যায়। আমার বালিশের নীচে ছোট্ট একটা দু-সেলের টর্চ থাকে, সেইটে জ্বেলে আমি মুকুন্দর ঘরের দিকে ছুটে গেলাম।
