বাইরে সোঁ সোঁ শব্দ। এদিকের ছেঁড়া কম্বলের পর্দাটা জোর হাওয়ায় দুলছে, আসছে বৃষ্টির ছাট। ঝড় চলছে। বেতবনের মধ্যে প্রচন্ড আলোড়ন, বাতাসে সাঁই সাঁই করে চাবুক পড়ছে একটা অকারণ আর নিষ্ফল আক্রোশে। শাল-পাইন-দেওদারের হাহাকার।
এক বার মুখ বার করেই সে চমকে মাথাটা ভেতরে ঢুকিয়ে নিলে। তীব্র শীতের উত্তাল হাওয়ায় নাক-কান ছিঁড়ে যেন উড়ে যেতে চায়। গুরগুর করে বাজের ডাকের মতো একটা ভয়ংকর শব্দ—সমস্ত গুহাটা কেঁপে উঠল। কোথায় যেন পাথর খসে পড়েছে।
আজ আর বাইরে বেরুনো অসম্ভব।
ছেঁড়া কম্বল মুড়ি দিয়ে সে চুপ করে বসে রইল।
কুকুরটা উঠে বসল। ধনুকের মতো পিঠটাকে বাঁকিয়ে আড়মোড়া ভেঙে নিলে বার কয়েক। ভোঁতা নাকটা দিয়ে তার কম্বল-জড়ানো হাঁটুটা খুঁকে নিলে দু-তিন বার, কুঁই কুঁই করে একটা অব্যক্ত শব্দ করতে লাগল। কালকের খাবার দুজনের পক্ষে যথেষ্ট ছিল না, তার খিদে পেয়েছে।
খিদের আগুন জ্বলছে গুম্ফালামার পেটের ভেতরেও। কিন্তু উপায় নেই। বাইরে প্রলয় চলেছে—আদিম হিমালয়ের বুকে আদিম হিংস্রতার আক্রোশ। যেন হাজার হাজার পাহাড়ি অজগর একসঙ্গে ফুসে উঠছে, তাদের বিষবাষ্প উড়ে চলেছে ঝড় হয়ে।
সুতরাং বেরুবার উপায় নেই। হয় ঝড়ে উড়িয়ে নেবে, নইলে হয়তো মাথার ওপরে গাছ উপড়ে পড়বে। উঁচু পাহাড়ের তুষারমন্ডিত চুড়োয় যে শুভ্রতার স্তূপ জমে আছে—একটা বিরাট ভাঙনের মধ্যে সেই শিলাপ নেমে এসে দুর্বিপাকও ঘটিয়ে দিতে পারে।
আস্তে আস্তে গুম্ফালামা কুকুরটার মাথায় থাবড়া দিতে লাগল।
চুপ লালু, চুপ। আজ আর কারও উপায় নেই দেখছিস না? তোরও না, আমারও না। মিছিমিছি কেঁদে কী করবি?
কুকুরটা কী বুঝল সেই জানে। কিন্তু আবার পায়ের কাছে চুপ করে শুয়ে পড়ল। এমন বিশ্বস্ত, এত সহজে খুশি হয়ে গেল। অথচ মাইলি খুশি হয়নি কেন? সে তো সব দিয়েছিল, তার যতটুকু সাধ্য সব। কিন্তু মানুষ পোষ মানে না। সাপের মতো তার স্বভাব।
বাইরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। গুহার মধ্যে কুদোর আগুনটা নিবে আসছে। শুধু জ্বলজ্বল করছে দু-জোড়া চোখ। মানুষের নয়, জানোয়ারের মতো নীলাভ আর পিঙ্গল।
পেটের মধ্যে অসহ্য ক্ষুধা নিয়ে দুটি প্রাণীর একটা দিন কেটে গেল।
আবার রাত শেষ হল, কিন্তু সূর্য উঠল না। আজ আরও বেশি অন্ধকার, বাইরে আরও বেশি ঝড়ের দাপট। মড়মড় করে গাছ ভাঙার শব্দ আসছে, গুরগুর করে পাথর নামছে ভূমিকম্প জাগিয়ে। গুহার শ্যাওলা চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে জল, সে-জল গায়ে লাগলে ঠাণ্ডায় ফোসকা পড়ে যায়।
কুকুর আর মানুষ কুন্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে একসঙ্গে। জন্তু আর জান্তব জীবন! খিদের কষ্ট সয়, কিন্তু অসহ্য শীত যেন হাড়ের পাঁজরাগুলোকে ঝম ঝমর করে ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে। সবচাইতে বিপদের কথা এই, সঞ্চিত শুকনো কাঠগুলো সব ফুরিয়ে গেছে, নিভে গেছে কুঁদোর আগুন। গুহার ভেতরে যেন তুষার মেরুর তুহিনতা এসে জমাট বাঁধছে।
দাঁতে দাঁতে ঠকঠক করে বাজছে।
লালু, লালু।
লালু জবাব দিলে, কুঁই কুঁই।
বল তো কী করি?
লালু শীতে যেন আরও ছোটো হয়ে গিয়ে গুম্ফালামার কম্বলের মধ্যে মাথা লুকোবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু না, আর পারা যায় না। খাবার না হোক, কিছু কাঠের জোগাড় করতেই হবে। সমস্ত শরীরের জড়তাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে গুম্ফালামা উঠে বসল, হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল গুহার বাইরে।
ওই বেরিয়ে আসা পর্যন্তই। তীক্ষ্ণহাওয়ায় ছুটে এল হাজারে হাজারে উড়ন্ত তরোয়াল, যেন সজোরে গুম্ফালামার মুখের ওপর আঘাত করে গেল। মনে হল নাক-মুখগুলো সব একসঙ্গে ফেটে গিয়ে টপ টপ করে রক্ত পড়তে শুরু করবে।
ভয়াতুর জানোয়ারের মতো ভেতরে পালিয়ে আসতে পথ পেল না গুম্ফালামা। ভেতরের শীতে হাড়-পাঁজরায় ঝাঁকুনি দিচ্ছে, কিন্তু বাইরের শীত মুহূর্তে একেবারে পাথর করে দেবে।
আবার কম্বলের মধ্যে এসে চুপ করে বসে পড়ল গুম্ফালামা। নাক-কান যেন আগুনে পোড়ার মতো জ্বলে যাচ্ছে। কম্বলের ধারালো কর্কশ রোঁয়াগুলো ঘষে ঘষে মুখটাকে গরম করবার চেষ্টা করতে লাগল। এ কী হচ্ছে? বাইরের ঝড় কি আর থামবে না। আজ পঁচিশ বছরের মধ্যে এমন দুর্যোগ আর তার চোখে পড়েনি। মনে হল পৃথিবী আর তাকে বাঁচতে দেবে না, চারদিকের হিমশীতল শিলাস্তূপের মধ্যে সেও জমে পাথর হয়ে যাবে।
লাল্লু আরও ছোটো হয়ে ক্রমে কম্বলের মধ্যে বেশি করে ঢোকবার চেষ্টা করছে। থাবা দিয়ে মাটি আঁচড়াচ্ছে, তার নখের ধারালো আঁচড় গুম্ফালামার পায়ে এসে লাগল। যেন কম্বলের ভেতর থেকে তাকে আশ্রয়চ্যুত করে নিজেই সেখানে অধিকারবিস্তার করতে চায়। হঠাৎ গুম্ফালামার মনে হল পৃথিবীসুদ্ধ সবাই লোভী, সবাই স্বার্থপর। আজ দার্জিলিং শহরে যারা দামি দামি পোশাকে আর লেপ-কম্বলের মধ্যে সর্বাঙ্গ ঢেকে ভালো ঘরের মধ্যে আরামে বসে আছে, যাদের চুলোয় গনগন করছে কাঠকয়লার চমৎকার আগুন, চা আর কফির চুমুকের সঙ্গে সঙ্গে যাদের শিরায় শিরায় জীবনবিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে, সেই মানুষেরা, সেই মাইলি, কিংবা পাহাড়িদের পাড়ায় ঘরের ভেতর শালের কুঁদো জ্বেলে পচাইয়ের জ্বলন্ত নেশায় শরীরকে যারা গরম রাখছে, তারা সবাই একদলের, তারা সকলে সমানভাবে তার সঙ্গে শত্রুতা করছে। এমনকী কুকুরটাও।
