লালু একটা অব্যক্ত শব্দ করে কম্বলের মধ্যে ঢোকবার চেষ্টা করছে। ছেঁড়া কম্বল একজনের পক্ষেই যথেষ্ট নয়। অত বড়ো একটা কুকুরকে তার ভেতরে আশ্রয় দিলে নিজেরই আত্মরক্ষার উপায় থাকবে না। জীবনে মাইলি যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, আজ কুকুরটাও কি তাই করতে চায়?
অসহ্য ক্রোধে পা তুলে গুম্ফালামা একটা লাথি বসিয়ে দিলে কুকুরটার পেটে। ঘ্যাঁক করে কাতর একটা শব্দ। দু-হাত দূরে ছিটকে পড়ল লাল্লু।
আয়, আয় এদিকে। দাঁতে দাঁত চেপে গর্জন করতে লাগল গুম্ফালামা, খুন করে দেব একদম।
লালু উঠে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যে শোনা যাচ্ছে তার বড়ো নিশ্বাসের শব্দ।
বাইরে ঝড় চলেছে। সামনে হয়তো-বা আরও প্রবল বেগে। এই গুহার বাইরে যে-পৃথিবী ছিল, নিরবচ্ছিন্ন তুষারঝড়ের মধ্যে সেটা নিশ্চিহ্ন হয়ে মিলিয়ে গিয়েছে। হাঁটু পর্যন্ত জমে পাথর হয়ে উঠেছে যেন। কম্বলের খসখসে রোঁয়া ঘষে ঘষে গায়ের ছাল উঠে যাচ্ছে, কিন্তু এতটুকু উত্তাপও সঞ্চারিত হচ্ছে না শরীরের মধ্যে। গুহার গা বেয়ে আরও বেশি করে চুইয়ে পড়ছে বরফগলা জল। গুম্ফালামা মরে যাচ্ছে, গুম্ফালামা জমে যাচ্ছে। এতদিন পরে সত্যিই মরে যাচ্ছে গুম্ফালামা—এই ষাট বছর পরে। মরতে দুঃখ ছিল না, কিন্তু এই সময়ে যদি মাইলিকে হাতের কাছে পাওয়া যেত…
যেন ঝিমিয়ে পড়ছিল, যেন আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ পায়ে তীব্র আঁচড় লাগল, শানিত ধারালো নখের আঁচড়। গুম্ফালামার চমক ভাঙল। লালু ঢোকার চেষ্টা করছে, প্রাণপণে ঢোকবার চেষ্টা করছে। এই কম্বলে দুজনের জায়গা হবে না—হয় জন্তুর অথবা জান্তব মানুষের।
লালু!
প্রচন্ড বেগে ধমক দিলে গুম্ফালামা। কিন্তু চিরকালের আজ্ঞাবহ লাল্লু আজ তার আদেশ শুনল না। যেমন করে হোক সে ঢুকবেই।
আবার একটা প্রচন্ড লাথি, আবার কুকুরটা ছিটকে পড়ল তিন হাত দূরে। কিন্তু এবারে আর কাতর আর্তনাদ নয়। লাল্লু স্থির হয়ে দাঁড়াল। তার পিঙ্গল চোখ দুটো বাঘের মতো ঝিকিয়ে উঠল নির্মম হিংসায়। যেমন করে পাহাড়ি অজগরকে দেখে সে গজরে উঠেছিল, তেমনিভাবেই তার গলা দিয়ে এবার গর্জন উঠতে লাগল। গরর-র-র
গুম্ফালামা সোজা উঠে বসল এবারে। লাল্লুকে সে বুঝতে পেরেছে। প্রভু-ভৃত্যের সম্বন্ধ আর নেই, এবারে দুজনে দুজনার প্রতিদ্বন্দ্বী। কুকুরটার মধ্যে জেগে উঠেছে তার আদিম পাশব হিংস্রতা। যেমন করে পাহাড়ি অজগরের ওপর সে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে চায়, ঠিক তেমনি করে যেন তারও ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। মারো কিংবা মরো।
অন্ধকারেও গুম্ফালামা যেন দেখতে পেল, কুকুরটার লেজ নড়ছে, কান খাড়া হয়ে উঠেছে; উত্তেজিত নিশ্বাস পড়ছে, চোখ দুটোতে আগুন জ্বলছে। গুম্ফালামার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। বাঘের মতো তেজি কুকুর, ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে তাকে।
গরর-র-র!
আর সময় নেই। বিদ্যুদবেগে গুম্ফালামা হাতের কাছ থেকে ভারী একটা পাথর তুলে নিলে, প্রাণপণ বলে ছুড়ে মারল কুকুরের মাথায়। একটা কাতর আর্তনাদ করে কুকুরটা পড়ে গেল মাটিতে। গুম্ফালামার শীতার্ত শরীরে যেন আগুন বয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তে উঠে পড়ল সে, লাথির পর লাথি মেরে গুহার বাইরে ঠেলে দিলে কুকুরটাকে। বাইরে ঝড়ের তরোয়াল তেমনি উড়ে চলেছে, কিন্তু এবারে আর সে মুখের ওপর তার তীক্ষ্ণ স্পর্শ অনুভব করতে পারল না। দু-হাতে মাথার ওপর কুকুরটাকে তুলে ধরে সে ছুড়ে গড়িয়ে দিলে ঢালু পাহাড়ের গায়ে, যেখানে হাজার দেড় হাজার ফুট নীচে তরাইয়ের ঘন অরণ্য আবর্তিত বৃষ্টির কুয়াশায় দৃষ্টির বাইরে মিলিয়ে গিয়েছে।
তারপরে এক ঘণ্টা সময়ও কাটল না। খেয়ালি পাহাড়ি ঝড় আপন খেয়ালেই থেমে গেল আকস্মিকভাবে। পাহাড়ের মাথা থেকে মেঘের জাল সরিয়ে দিয়ে হেসে উঠল দ্বিপ্রহরের সূর্য। তার উষ্ণ মধুর আলো গুম্ফালামার গুহার মাথায় শান্ত ভালোবাসার মতো ছড়িয়ে পড়ল।
আর সেই সূর্যের দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল গুম্ফালামা। কানের কুন্ডলে আর রেখাসংকুল বেগুনি মুখের ওপর আলো ঝিকিয়ে উঠতে লাগল। কী করল, এ সে কী করল?
আজ সে নিঃসঙ্গ। এতদিন পরে বিরাট পৃথিবীতে সে নিঃসঙ্গ।
পাহাড়ের টিলায় উঠে গুম্ফালামা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। দূরে বাতাসিয়া লুপে রেলগাড়ির গর্জন শোনা যাচ্ছে। গুম গুম গুম। সূর্যের আলোয় স্নান করছে পৃথিবী, পাহাড়ের চূড়ায় জ্বলছে যেন সোনার মুকুট।
বুকের মধ্যে যেন আগুন জ্বলছে। লালু—লালু! লালু তো মাইলি নয়। তার জীবনের একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র সান্ত্বনা। সে এ কী করল?
লাল্লু!
কাতর আহ্বান পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরতে লাগল। কিন্তু লালু এল না, চিরদিনের বিশ্বস্ত কুকুর আজ আর সাড়া দিলে না মনিবের ডাকে। শুধু দূর বস্তিতে পাহাড়িরা শুনতে পেল দিকে দিকে একটা অমানুষিক কণ্ঠস্বর বাজছে–লাল্লু…লাল্প!
অতলস্পর্শ পাহাড়ের খাড়াই, তার নীচে তরাইয়ের কালো বন। সূর্যের আলোয় ভিজে বন জ্বলে উঠছে। গুম্ফালামা স্থির অনিমেষ দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল। ওখান দিয়েই লাল্লুকে গড়িয়ে দিয়েছে—গড়িয়ে দিয়েছে নীচে। কিন্তু লাল্লু কি সত্যিই মরে গিয়েছে? না না, বিশ্বাস হয় না।
সূর্যের আলোয় পাথর গরম হয়ে উঠছে। খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে গুম্ফালামা অভ্যস্ত পদক্ষেপে নীচে নামতে লাগল—পাথর আঁকড়ে, গাছের শিকড় ধরে। তার মন বলছে লালু মরেনি, ওইখানেই আছে, ওই জঙ্গলেই আছে। শুধু পাহাড় বেয়ে তার কাছে উঠে আসতে পারছে না।
