কিন্তু কেন?
গুম্ফালামা নিজেই জানে না। শুধু এইটুকুই জানে কাউকে তার প্রয়োজন নেই, তাকে দিয়েও কারও কোনো দরকার নেই। কতকাল ধরে সে একা, আশ্চর্যভাবে নিঃসঙ্গ। মানুষ তাকে দেখে ভয় পায়, তাকে দেখে আতঙ্কে শিউরে উঠে। মাঝে মাঝে নিশীথ রাত্রে যখন পাহাড়িদের পাড়া থেকে ঝমর ঝর করে ঝাঁকড়ির শব্দ কানে আসে, ভূত আর অপদেবতা তাড়াবার জন্যে উদ্দাম চিৎকার করে ওরা, তখন গুম্ফালামার মনে হয় যেন ওই ঝাঁকড়ির শব্দ অশরীরী কাউকে তাড়া করে আসছে না—ছুটে আসছে তারই পেছনে পেছনে। মানুষ তার শত্রু।
গুম গুম শব্দ করে রেলগাড়ি চলেছে, ঘুরে ঘুরে চলেছে পাহাড়ের কোলে। কোথায় যায় রেলগাড়ি? সে কেমন দেশ? গুম্ফালামা মনে মনে ছবি দেখে বাঁধানো পথ, বড়ো বড়ো বাড়ি, বিজলির রোশনাই, মোটরের ভেঁপু। কোনোদিন কি ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের পথ বেয়েই সে ওখানে গিয়ে পৌঁছেছিল?
ঘর-র-র ঘেউ-উ-উ…
গুম্ফালামার পেছনে কুকুরটা হঠাৎ গজরে উঠল, চমক ভেঙে গেল মুহূর্তে। পাহাড় বেয়ে বিদ্যুৎগতিতে অজগর নেমে যাচ্ছে। বিরাট শরীর বয়ে চলেছে ঝড়ের মতো আলোড়ন জাগিয়ে, পাথরের টুকরো ছিটকে পড়ছে চারদিকে। কুকুরের ডাক সে শুনতে পেল কি না কে জানে, কিন্তু চক্ষের পলক পড়তে-না-পড়তেই অদৃশ্য হয়ে গেল।
যেন গুম্ফালামারও মনের ভেতর দিয়ে অমনি করে সাপ নেমে গেল একটা। আকাশে মেঘের পরে মেঘ, সাদা কুয়াশা দমকা হাওয়ায় পাক খাচ্ছে, চোখে-মুখে লাগছে শীতের তীব্র চাবুক। লক্ষণ ভালো নয়, দুর্যোগের আসন্ন সম্ভাবনা দিকে দিকে।
পাহাড়ের চূড়া থেকে গুম্ফালামা যেখানে নেমে এল সেখানে সামনেই একটা কালো গর। এই গহ্বরে বা গুম্ফাতে বাস করে বলেই তার এই নামকরণ হয়েছে। বহুকাল আগে কোনো খেয়ালি পাহাড়ি ঝরনা নেমেছিল এই পথ দিয়ে, তারপর বহুকাল আগেই শুকিয়ে গিয়েছে। এই পাথরকাটা গুহাটা তারই গতিধারার চিহ্ন। কিন্তু ঝরনা এদিক দিয়ে আজকাল আর আসে না, শুধু গুম্ফালামার আশ্রয়টাই স্থায়ী হয়ে আছে।
গুহায় ঢুকে গুম্ফালামা প্রথমেই কাঠকুটরো দিয়ে খানিকটা আগুন জ্বালাল। গুহার শ্যাওলা সবুজ অসমতল গা থেকে কনকনে পাথুরে ঠাণ্ডা বেরুচ্ছে, মোটা কম্বলের ছেঁড়া ক্রুপের ভেতর দিয়ে ঠেলে উঠছে শীত। আগুনের আভায় দেখতে দেখতে গুহার সংক্ষিপ্ত পরিসরটা তীব্র রক্তোজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভেতরের ধোঁয়া বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘনীভূত কুয়াশার ন্যূহ ভেদ করতে। গুম্ফালামার রেখায়িত বেগুনি মুখখানায় লাল আলো পড়ে চিনা-ভাস্কর্যে-গড়া ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তির মতো দেখাতে লাগল।
ছেঁড়া কম্বলের ওপর ধ্যানস্থ হয়ে বসল গুম্ফালামা, পায়ের কাছে ঘন হয়ে বসল তার কুকুরটা। মাথার মধ্যে যেন এখনও রেলগাড়ির শব্দটা বেজে উঠছে গুম গুম করে। স্বপ্ন নয়। ওই দার্জিলিং শহর, ওখানকার আলো, ওখানকার পথ, মোটর সবই সে একদিন দেখেছিল বাস্তব চোখেই। তারপর…
তারপর মনটা উড়ে চলে গেল প্রায় ত্রিশ বছর আগেই। বেশ সুখেই ছিল, অনেক কষ্টে বিয়ে করেছিল বরাশ ফুলের মতো সুন্দরী একটা মেয়েকে। কী নাম? কী যেন নাম ছিল তার?
মাইলি।
হ্যাঁ, মাইলিই তো। গুম্ফালামার বুকের ভেতরেও যেন সামনেকার আগুনটার মতো পট পট শব্দে কী পুড়ে যেতে লাগল। সেই মাইলি। পাগলের মতো ভালো বেসেছিল, এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করতে পারত না তাকে। অথচ মাইলি—তার এত কামনার ধন—শেষপর্যন্ত রাত কাটাতে আরম্ভ করলে কুঁজো কালো একটা বাঙালির সঙ্গে।
তারও পর শানানো কুকরির ঝলক। হিমালয়ের বুকে মেঘভাঙা চাঁদের আলো ঘরে এসে পড়েছে কাচের জানলা দিয়ে। মাথাটা ধড় থেকে ছিটকে মেঝেয় আছড়ে পড়ল আর একটা প্রচন্ড আর্তনাদ করে মাইলি দৌড়ে বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে।
কতদিন? ত্রিশ বৎসর। কিন্তু এখনও ভয় কাটেনি। পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে রেলগাড়ি চলে, ওই গাড়ির যারা যাত্রী তারা যেন তাকে দেখলেই চিনে ফেলবে, ধরে নিয়ে সোজা লটকিয়ে দেবে ফাঁসিতে। আর মাইলি? মাইলি কী করে এখন? কার কোলে শুয়ে কাচের জানলার ভেতর দিয়ে দেখে সাদা পাহাড়ের চুড়োয় মেঘভাঙা চাঁদের আলো?
হঠাৎ চমকে উঠল গুম্ফালামা। পায়ের ওপরে একটা মাংসের উত্তপ্ত অনুভূতি, যেন সজীব দেহের ক্ষীণ কোমল হৃৎকম্পন। বুকের ভেতরে রক্ত ছলকে উঠল। ত্রিশ বছরের ওপার থেকে তার কোলের ভেতরে কে ফিরে এল? সেই বিশ্বাসঘাতিনী? ফুলের ভেতরে সেই সাপ?
কিন্তু কোথায় মাইলি? পায়ের মধ্যে কুন্ডলী পাকিয়ে কুকুরটা ঘুমুচ্ছে। ওর জীবনের একমাত্র সঙ্গী—একমাত্র সহচর। মাইলির চাইতে অনেক বেশি বিশ্বস্ত, অনেক বেশি অন্তরঙ্গ। গুম্ফালামার নিভৃত নিঃসঙ্গতায় পৃথিবীর একমাত্র প্রেম।
ছোটো একটা মেটেপাত্রে সে মাধুকরীর চাল ক-টা চাপিয়ে দিলে। গনগনে আগুনের আঁচে টগবগ করে ফুটে উঠল ভাত। তাদের দুজনের খাদ্য, দুটি প্রাণীর সংসার। পায়ের কাছে ঘুমন্ত ক্ষুধার্ত কুকুরটা নড়েচড়ে মাথা খাড়া করে উঠে বসল।
পরদিন যখন গুম্ফালামা কম্বলের ভেতর থেকে মুখ বার করলে, গুহার মধ্যে তখনও অন্ধকার। কাঠের কুঁদোটা হালকা আগুনের আলোয় তখনও ঝকমক করছে। জমাট বেঁধে আছে ধোঁয়ার রাশি। নিশ্বাস টানতে কষ্ট হয়, ধোঁয়ায় যেন রুদ্ধ হয়ে গেছে হৃৎপিন্ড।
