নগাধিরাজের কোলে কোলে বিচ্ছিন্ন উপত্যকা। চারিদিকের দুর্গমতার মাঝখানে যেন প্রকৃতির সযত্নলালিত এক-একটি আশ্রয়। পাথরের সিঁড়ি কেটে যে-মানুষগুলো ওঠা-নামা করে, ঝোরা থেকে কলসি ভরে আনে, তাদের মুখ থেকে শুরু করে শরীরের সমস্ত পেশিগুলো পর্যন্ত যেন পাথরে তৈরি। পাহাড় ধসে, শাল-পাইন-দেওদারের বনকে উত্তাল উতরোল করে দিয়ে ঝড় আসে, বুনো জানোয়ার ঘুরে বেড়ায়, বেতবনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ঝিমন্ত পাহাড়ি অজগর, তার মধ্যেই ওদের দিন কাটে। সুখে-দুঃখে, প্রেমে-বিরহে এবং সংঘাতে—জান্তব জীবন।
কিন্তু এমন যে মানুষগুলো, আজ তারাও ঘরের মধ্যে গুটিশুটি হয়ে বসে আছে।
ডান দিকে উঁচু পাহাড়, তার মাথা হালকা তুষারে ধূসর। বাঁ-পাশে পাহাড়ের গা প্রায় খাড়াই হয়ে হাজার দেড় হাজার ফুট নীচে নেমে গেছে। সেখানে একটা রাক্ষুসে মাথার উচ্ছঙ্খল কোঁকড়ানো চুলের মতো কালো জঙ্গল—তরাইয়ের অরণ্যসীমা। আজ সেই তুষারধবল পাহাড়ের চুড়োর উপর একটা ঝাপসা কুয়াশা এসে জমেছে, সেটা যেন হারিয়ে গেছে দৃষ্টির আড়ালে। নীচে তরাইয়ের জঙ্গল দেখা যাচ্ছে না। খাড়াই পাহাড়ের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় খানিকটা সাদা ধোঁয়া যেন ঘূর্ণির মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। থমথমে আকাশ, এক-একটা দমকা বাতাসে বৃষ্টির রেণু। আজ তুষার পড়বে। দুর্যোগের সম্ভাবনা যেন চারদিকে ঘনিয়ে রয়েছে।
নিতান্ত দায়ে না পড়লে এমন দিনে পাহাড়িরাও বাইরে বেরুতে চায় না। ঘরের ভেতরে বড়ো বড়ো শাল গাছের গুড়ি বা কুঁদো জ্বালিয়ে গোল হয়ে বসে আছে তারা। এবার অসময়ে বড়ো বেশি শীত পড়েছে, ধেনো মদ আর বিড়ির সঙ্গে সেই আলোচনাই চলছিল।
এমন সময় বাইরে শব্দ উঠল— ডুগ ডুগ ডুগ…
চঞ্চল হয়ে পাহাড়িরা কান পাতল। একি সত্যিই! কিন্তু না, ভুল হওয়ার কোনো কারণ নেই। শীত-বাপে আচ্ছন্ন ভারী বাতাসের নীচে অবরুদ্ধ গলার আর্তনাদের মতো বাজতে লাগল ডুগ ডুগ ডুগ…
পাহাড়িদের মুখের রেখাগুলো বদলে গেল মুহূর্তে। ভয় আর সংশয় ফুটে উঠল স্পষ্ট এবং প্রত্যক্ষ হয়ে। গুম্ফালামা। এদেশের দুর্বোধ্য রহস্য এবং দুর্বোধ্য ভয়। সে মানুষ কিংবা অপদেবতা অথবা আর কিছু, এ সম্বন্ধেই যথেষ্ট সন্দেহ তথা সংশয় আছে। তার আবির্ভাবের মধ্যে যেন অশরীরী কিছু-একটা প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকে—কোনো দুর্যোগ, কোনো দুর্বিপাক।
ডুগ ডুগ ডুগ…
অনিবার্য আহ্বান। একে একে কুটিরের বাইরে সার দিয়ে বেরিয়ে এল ওরা। সামনে দাঁড়িয়ে গুম্ফালামা। নানা রঙের উলের টুকরো সেলাই-করা ছিন্নবিচ্ছিন্ন জরাজীর্ণ আলখাল্লা। দুই কানে দুটো প্রকান্ড রুপোর মাকড়ি-কুন্ডল। ঝুলে-পড়া মুখের চামড়া। শীতে, বৃষ্টিতে আর বয়সে ট্যান-করা সেই বেগুনি চামড়ায় অসংখ্য কিলবিলে রেখা। এক হাতে ডুগডুগি, তাতে তিন-চারটে নানা রঙের লাল-সবুজ-হলদে রঙের কাপড়ের টুকরো ঝুলছে। আর এক হাতে নরকরোটির ভিক্ষাপাত্র।
ঝাপসা ছায়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে অমানুষিক মানুষ। পাথরের মতো ভাবের চিহ্নমাত্রহীন প্রকান্ড মুখে দুটো চোখ আগুনের টুকরোর মতো জ্বলছে, সে-চোখের দিকে তাকাবার মতো ধৃষ্টতা বা দুঃসাহস নেই কারও। নরকঙ্কালের ভিক্ষাপাত্র বাড়িয়ে দিয়ে সে মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে আছে, আর তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একটা প্রকান্ড কুকুর। ঝাঁকড়া লোমওয়ালা পাহাড়ি কুকুর নয়, নীচের থেকে সংগ্রহ করে আনা বাংলা কুকুর। সাদায়-লালে-মেশানো বাঘের মতো রং, বাঘের মতো তেজি আর ভয়ানক। শীতে তার গায়ের লোমগুলো সব কাঁটার মতো খাড়া হয়ে আছে, পিঠের ওপরে গোল-হয়ে-আসা লেজটা নড়ছে টুক টুক করে।
কোনোখানে কারও মুখে একটি কথা নেই। শুধু আস্তে আস্তে গুম্ফালামার করোটিপাত্র পূর্ণ হয়ে উঠল। তারপরে আবার ডুগ ডুগ ডুগ। ঘন-হয়ে-আসা কুয়াশায় শুধু দেখা গেল গুম্ফালামা আর তার কুকুরের প্রেতচ্ছায়াটা একটা উতরাইয়ের মাথায় মিলিয়ে যাচ্ছে।
পাহাড়িরা এ-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।
এই সময়ে গুম্ফালামা!
আর একজন ভয়ার্তমুখে বললে, নিশ্চয় ভয়ানক কিছু-একটা ঘটবে।
আচ্ছা, লোকটা সত্যি সত্যিই মানুষ তো?
সেকথায় কেউ জবাব দিলে না। জবাব কেউ জানত না।
কিন্তু ওরা যে যাই বলুক, গুম্ফালামা সত্যি সত্যিই মানুষ। তবে কতদিনের যে মানুষ সেকথা গুম্ফালামার নিজেরও স্মৃতি থেকে বোধ হয় মিলিয়ে গিয়েছে। ভাবলেশহীন মুখ, ভাবলেশবর্জিত মন। অতীতটা পাঁচ হাজার ফুট গভীর একটা খাদের মতো অন্ধকার, ভবিষ্যৎটা পাহাড়ের বুকে ঘনিয়ে-আসা সাদা কুয়াশার মতো অস্পষ্ট।
পাহাড় বেয়ে বেয়ে অনেকখানি উতরাইয়ের পথ উঠে একখানা প্রকান্ড গ্র্যানাইটের চাঙাড়ের ওপরে দাঁড়াল গুম্ফালামা। বহুদূরে আর বহু নীচে বোধ হয় বাতাসিয়া লুপ ঘুরে ঘুরে চলেছে দার্জিলিঙের রেলগাড়ি। পাহাড়ের গায়ে গায়ে গুম গুম করে তার শব্দ উঠছে। বার কয়েক তীক্ষ্ণ বাঁশির সুর কানে ভেসে এল। অকারণে একটা তীক্ষ্ণ হিংসায় গুম্ফালামার মুখের মধ্যে দাঁতগুলো কড়াক্কড় করে বেজে উঠল।
কী ইচ্ছে করে? ইচ্ছে করে পাহাড়ি ঝরনার আঘাতে যেখানে প্রকান্ড প্রকান্ড পাথরের চাঙড় রেললাইনের মাথার ওপরে নিরবলম্বভাবে ঝুলে রয়েছে, ওরই একটাকে এক ধাক্কায় নামিয়ে নীচে আছড়ে ফেলে দিতে। আর পরক্ষণেই একটা ভয়ংকর শব্দ। ছোটো রেলগাড়িটা গুঁড়ো হয়ে গিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে হাজার হাজার ফুট গভীরতার মধ্যে গড়িয়ে পড়বে। শুধু মুহূর্তের জন্য শোনা যাবে মানুষের প্রবল আর্তনাদ, আর তারপরেই একেবারে সব ফাঁকা?
