বিহ্বল গলায় মেয়েটি জবাব দিলে, হুঁ।
বুলাকি হেসে উঠল, হেসে উঠল পরম পরিতৃপ্তভাবে। আজ তার জন্মান্তর। শুধু অবিচ্ছিন্নভাবে অন্যায়ই নয়, সে ভালো করতে পারে। শুধু দুঃখ দিতে পারে তাই নয়, দুঃখ মোচনও করতে পারে।
এই দুঃখে তুমি মরে যেতে চাও? ছি ছি! আমার নাম জেনে রাখো মা, আমি বুলাকিরাম, আমি মুরগিহাটার নামদার গুণ্ডা। এককথায় আমি মানুষ খুন করতে পারি।
অন্ধকারের ভেতরে মেয়েটির অস্ফুট আর্তনাদ শোনা গেল।
মিষ্টি করে হাসতে গিয়েও বুলাকি তীব্র কর্কশ গলায় হেসে ফেলল, না না, তোমার কোনো ভয় নেই। আমি তোমাকে মা বলেছি। তোমার স্বামীর নাম আমাকে বলল, এমনভাবে শাসিয়ে দেব যে কখনো তোমার গায়ে হাত তুলতে ভরসা পাবে না। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি।
শীতের হাওয়ায় মেয়েটি কাঁপছে, থরথর করে কাঁপছে। গঙ্গার জলে ঢেউয়ের কলধ্বনি। পোস্তার ওপরে কয়েকটা বিচ্ছিন্ন অন্ধকার গাছের ডালে-পাতায় বাতাস সোঁ সোঁ করছে। ভীত অস্পষ্ট আওয়াজ এল, থাক।
ওঃ, ভয় করছে? আমি গুণ্ডা, হাতের ঠিক নেই, তোমার স্বামীকে হয়তো মেরে বসতে পারি—তাই না? বুলাকি একসারি সাদা দাঁত বার করে বললে, স্বামীর জন্যে এত দরদ, আর তার জন্যেই ডুবে মরতে যাচ্ছিলে মা? মেয়েমানুষ এমনই তাজ্জব জানোয়ারই বটে! নিজের রসিকতায় ঝামা-ঘষার মতো শব্দ করে সে হাসতে লাগল।
মেয়েটি জবাব দিলে না।
আচ্ছা যাক, মায়ের যখন অত ভয়, তখন বাবাকে আমি এ যাত্রা কিছু আর বলব না। কিন্তু আমার ঠিকানাটা জেনে রাখো মা। যখনই বিপদে পড়বে, খবর দিয়ো। যদি জেলে না থাকি, যা পারি আমি করব। বুলাকি ঠিকানাটা বললে। মনে থাকবে তো? মনে থাকবে তো মা?
আশ্চর্য দরদ আর আন্তরিকতা বুলাকির গলায়। নিজের যে-মাকে কোন ছেলেবেলায় হারিয়েছিল, স্মৃতির ভেতরে বহু বার হাতড়েও যার মুখখানা বুলাকি কখনো মনেও করতে পারেনি। নিশীথ রাত্রির মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকার গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে আজ তাকেই সে ফিরে পেল না কি! সামনে ভরা ভাটার বিশাল জলস্রোত কলকল করে ছুটে চলেছে, দু-পাড়ে নি :সাড় ঘুমের মধ্যে মূৰ্ছিত হয়ে আছে মহানগরী, আকাশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে লঘু মেঘ বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। অন্ধকারের ভেতরে নিজের শরীরটাকে যেমন সে ভালো করে দেখতে পাচ্ছে না, তেমনি নিজের মনটাকেও কি সে হারিয়ে ফেলল? সে বুলাকিরাম!
তবু অদ্ভুত ভালো লাগছে, অপূর্ব একটা আনন্দে সমস্ত চৈতন্য পরিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তবু ভালো, আজ নেশা করেনি বুলাকি, নিজের শিরাগুলোকে জ্বালিয়ে রাখেনি দেশি মদের তরল আগুন দিয়ে। তাহলে কী হত কে জানে! দেশলাইয়ের আলোয় ওই সোনার লকেটটার ঝলক আভাসে তাকে সেই কথাই বলে দিয়েছে। নিঃশব্দে একটা নির্বিঘ্ন খুন করে হাওয়া হয়ে যেতে তার কতক্ষণ লাগত! সামনে গঙ্গার খরধারা ছিল, ভোর হওয়ার আগে হয়তো মড়াটা গিয়ে ডায়মণ্ডহারবারেই ভেসে উঠত।
না না, নিজেকে বিশ্বাস নেই। আর দেশলাই জ্বালবে না। প্রশ্রয় দেবে না নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা শয়তানটাকে। এই রাত্রিটা বুলাকির জীবনে ব্যতিক্রম। এমন মুহূর্ত কাল আর আসবে না, এমন রাত্রিও না। শুধু কাল কেন, কোনোদিনই হয়তো আসবে না। অনাগত রাতগুলোকে অভ্যস্ত নিয়মে পরিপূর্ণ করে রাখবে জুয়ার আড্ডা, মদের গেলাস, অনেক অনেক অকীর্তি, অনেক মারামারি আর সাপের মতো মেহেরজানের আলিঙ্গন। সেইসব সময়ে, সেইসব মত্ততার অবকাশে যখন একটুখানি নিজের মধ্যে ফিরে আসবে বুলাকি, তখন হয়তো এই রাতটাকে মনে পড়বে, মনে পড়বে তার হঠাৎ-পাওয়া ভালো করে না-দেখা মাকে, মনে পড়বে ক্ষিপ্রগতিতে বয়ে-যাওয়া ধ্বনি-মুখরিত এই নিশীথ গঙ্গাকে, মনে পড়বে অকারণ হাসির মতো আঁধার ডালপালার শনশন সোঁ-সোঁ শব্দটাকে—
বুলাকি যেন আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। নেশা করেনি, তবু এ এক নতুন নেশা, ভালো হওয়ার নেশা; একটা বিচিত্র ব্যতিক্রমের রাতকে চেতনার মধ্যে সঞ্চারিত করে নেবার নেশা।
স্নেহসিক্ত কোমল গলায় সে আবার বললে, মনে থাকবে মা? মনে থাকবে তো?
মেয়েটি মাথা নাড়ল। দেখা গেল শীতে সে কাঁপছে, যেন আর দাঁড়াতে পারছে না।
তাহলে ফিরে চলো। বাড়ি চলো।
মেয়েটি নড়ে না।
চলল, ফিরে চলো।
মেয়েটি তবুও স্তব্ধ।
ভয় করছে? বেশ, আমি তোমায় এগিয়ে দিচ্ছি। আমি বুলাকিরাম, যতক্ষণ সঙ্গে আছি কেউ তোমার গা ছুঁতে পারবে না। তোমাকে মা বলেছি, ছেলে থাকতে তোমার ভাবনা কী?
মেয়েটি দ্বিধা করছে। কেমন বিহবল বোধ করছে, কেমন বিচলিত হয়ে গেছে। ফিরে যেতে তার পা উঠছে না যেন। এবার যেন বুলাকি কেমন একটা নৈরাশ্য অনুভব করলে। এতক্ষণ ধরে কথা বলছে, এমনভাবে আশ্বাস দিচ্ছে, তবু তার মা ভালো করে সাড়া দিচ্ছে না, খুশি হয়ে উঠছে না, একটা পাথরে-গড়া প্রতিমূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে আছে।
আকস্মিক একটা তিক্ততা মনের ভেতর ঠেলে উঠেছিল, বলতে ইচ্ছে করল, তবে মরো গে যাও! কিন্তু নিজেকে সামলে নিলে বুলাকি। আজকের রাতটা সে নষ্ট করতে দেবে না, কিছুতেই এই অপূর্ব মুহূর্তটার সুর কাটতে দেবে না। বুলাকি আবার বললে, চলো চলো।
কিন্তু… একটা জড়িত স্বর।
আর কিন্তু নেই, তোমাকে ফিরে যেতে হবে। কেমন যেন জেদ চেপেছে বুলাকির। চলো মা, চলো। তোমার বাড়িটা আমি দেখব। তুমি নিজে কিছু না বলো, তোমার দুঃখের প্রতিকার আমিই করব।
