কী অসম্ভব ভালো লাগছে। কোনোখানে আর এতটুকু যন্ত্রণা নেই—যেন ঘুমিয়ে পড়বে এক্ষুনি। একটা বিড়ি পেলে কাজ দিত; কাছাকাছি চেনা দোকানও আছে, কিন্তু বুলাকির উঠতে ইচ্ছে করল না আর। সিঁড়ির পেছন দিকে পোস্তার দেওয়াল ঘেঁষে বুলাকি লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।
বাতাসে আতর উড়ছে। গন্ধটা শুধু বুলাকির নাকে নয়, মুখের ভেতরেও ঢুকছে, যেন জিভটাকেও মিষ্টি করে তুলছে। স্বপ্নের মতো মনে পড়তে লাগল— মেহেরজান, ডালহাউসি স্কোয়ার থেকে শ্যামবাজারের ফিরতি ট্রাম, সেই পাঁচশো টাকার নোটে-ভরতি মোটা ব্যাগটা, তারপর…
তারপর বুলাকি ঘুমিয়ে পড়ল। নির্জন গঙ্গার ওপর ঘন হতে লাগল রাত্রি, ওপারে হাওড়ার আলোগুলো কৃষ্ণপক্ষের রাত্রির অতলে মিলিয়ে যেতে লাগল একে একে।
ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছিল…
নেশায় বেহুঁশ হয়ে সে মেহেরজানের দোরগোড়ায় এসে পড়েছে। মেহেরজান করেছে কী, কোথা থেকে এক বালতি ঠাণ্ডা জল এনে ওর মাথায় ঢেলে দিয়েছে আর তারসঙ্গে জোর পাখার হাওয়া। শীতে নেশা ছুটে গেছে, ধড়ফড় করে উঠে বসেছে সে।
সত্যিই ধড়ফড় করে উঠে বসল সে। অন্ধকার পোস্তা, অন্ধকার গঙ্গা। রাত কত হয়েছে। কে জানে। আকাশে অল্প অল্প মেঘ করছে, তারা ডুবে গেছে আর গঙ্গা থেকে উঠে আসছে জোর জোলো হাওয়া। নেশা করেনি বুলাকি, মেহেরজানও নয়, শুধু মারের জ্বালায় একটা অবসন্ন নিরুপায় শরীর নিয়ে সে রথতলা ঘাটের পোস্তায় ঘুমিয়ে পড়েছিল।
উঠতে যাবে এমনসময় চমক ভেঙে গেল।
চারদিকে ঘন অন্ধকার, তবু বুলাকির অভ্যস্ত চোখ দেখতে পেল সাদামতো কে একজন সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দ পায়ে গঙ্গার দিকে নেমে যাচ্ছে। সিঁড়ির পাশে ছায়ার মধ্যে বুলাকি তলিয়ে আছে, সুতরাং তাকে দেখতে পায়নি। রোমাঞ্চিত হয়ে বুলাকি শুনতে পেল সেই মূর্তিটা কাঁদছে। চাপা গলায় আকুল হয়ে কাঁদছে একটি মেয়ে। দ্বিধামন্থর শঙ্কিত পায়ে সে ক্রমেই এগিয়ে চলেছে, এগিয়ে চলেছে গঙ্গার দিকে।
সর্বনাশ!
একটা সম্ভাবনার কথা মনের ভেতর উঁকি দিয়েই বুলাকির স্নায়ুগুলো দিয়ে বিদ্যুৎ বয়ে গেল। মেয়েটা আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে না তো? এই নিশীথ রাত্রে নিরিবিলি গঙ্গার ঘাটে অমনভাবে একটি নিঃসঙ্গ মেয়ে গঙ্গার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কেন? এর অর্থ কী হতে পারে?
খট করে কাঠের পা-টা টেনে বুলাকি উঠে পড়ল। বললে, কে?
মেয়েটি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
কে?
তবু জবাব নেই, যেন একটা পাথরের মূর্তি। বুলাকির মনে হল মেয়েটা থরথর করে কাঁপছে।
বুলাকি এগিয়ে এসে গঙ্গা আড়াল করে মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
কে তুমি? কী করছ এখানে?
হঠাৎ উচ্ছ্বসিত একটা কান্নার জোয়ার। প্রবল ফোঁপানির সঙ্গে আকুল মিনতি শোনা গেল, ছেড়ে দাও আমাকে। দোহাই তোমার, আমাকে পুলিশে দিয়ো না।
বুলাকি সস্নেহে হাসল। আকস্মিক একটা করুণায় মনটা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। শুধু খুন নয়, শুধু গুণ্ডামি নয়, শুধু মাতলামি নয়, আজ রাত্রে আশ্চর্যভাবে একটা-কিছু ভালো করবার সুযোগ পেয়েছে বুলাকি। একটা-কিছু মহত্তর—একটা এমন কিছু যা সে জীবনে কখনো করেনি, যা করবার অবকাশ তার কোনোদিন ঘটেনি। বিচিত্র উত্তেজনায় রক্তে দোলা লেগে গেল বুলাকির। এই মুহূর্তে যেন সে নতুন মানুষ হয়ে উঠেছে।
না না, কোনো ভয় নেই মা। আমি পুলিশ নই।
পকেটে বিড়ি নেই, দেশলাইটা আছে। খস করে সেইটেই জ্বালাল বুলাকি। ভীতিবিহ্বল একটা পান্ডুর মুখ চকিতে দেশলাইয়ের আলোয় আভাসিত হয়ে উঠল। কুড়ি-বাইশ বছরের একটি ভদ্রলোকের মেয়ে। গায়ে গয়নার দীপ্তি। সাদা-কাপড়ে-জড়ানো একটা পুঁটলি বুকের ভেতরে আঁকড়ে ধরে আছে। গলায় সোনার হার, ভারী লকেটটা থেকে পলকের জন্যে বুলাকির চোখে একটা ঝিলিক জাগিয়ে কাঠিটা নিবে গেল। নিজের অজ্ঞাতেই বুলাকির মন বলে উঠল—মেহেরজান, অনেক টাকা দরকার, নির্জন গঙ্গার ঘাটে একটি নিঃসঙ্গ মেয়ের এক-গা গয়না, দুখানা লোহার মতো হাতের মুঠি বাড়িয়ে দিলেই…
কিন্তু না না, আজ একটা দুর্লভ মুহূর্ত পেয়েছে বুলাকি। দুর্লভ মুহূর্ত—বুলাকির জীবনে ভালো হওয়ার, ভালো করবার। আজ সে লোভ নিয়ে আসেনি, স্বার্থ নিয়েও আসেনি। এই মেয়েটিকে সে বাঁচাবে—রক্ষা করবে একটা অমূল্য জীবন।
বুলাকি জিজ্ঞাসা করলে, তোমার সঙ্গে ওটা কীসের পুঁটলি মা?
গলার স্বরে মেয়েটি বোধ হয় ভরসা পেয়েছে। দেশলাইয়ের আলোয় আরও দেখতে পেরেছে যে বুলাকি পুলিশ নয়। সন্ত্রস্ত শঙ্কিত স্বরে জবাব দিলে, আমার আমার ছেলে।
একেবারে কচি ছেলে। ওকে নিয়েই ডুবে মরতে যাচ্ছিলে?
অন্ধকারের ভেতরে মেয়েটি যেন শিউরে উঠল, জবাব দিলে না।
বুলাকি বলে, ছি মা, ডুবে মরবে কেন? এর চেয়ে কী আর পাপ আছে? গঙ্গাজিতে ডুবলেও নিস্তার নেই, জিন-পেতনি হয়ে থাকতে হবে। রামচন্দ্রজি যে-জান দিয়েছেন, সে কি নষ্ট করবার জন্যে?
কথাটা বলে নিজের মধ্যেই কৌতুক বোধ করলে বুলাকি। সে ধর্মকথা বলছে, উপদেশ শোনাচ্ছে। বুলাকিরাম, জীবনে এমন বদমায়েশি নেই যা সে করেনি। আজ গঙ্গার ধারে পরম বিস্ময়কর এই মুহূর্তটিতে তার জন্মান্তর হয়ে গেল না কি! দলের লোকেরা একথা শুনলে তাকে বলবে কী?
বুলাকি বললে, শোনো মা, আমিও তোমার ছেলে। আমার কাছে লজ্জা কোরো না। কী দুঃখ তোমার? তোমার স্বামী মাতাল, তোমাকে খুব কষ্ট দেয়, তাই না?
