মড়ার মতো অসাড় পায়ে নিরুপায়ের মতো চলতে শুরু করলে মেয়েটি।
অন্ধকার স্ট্র্যাণ্ড রোড দিয়ে দুজনে এগিয়ে চলল। কেউ কোনো কথা বলছে না। মেয়েটি কী ভাবছে কে জানে! কিন্তু মেয়েটির কথা গুণ্ডা বুলাকি ভাবছে না, তার নিজের মধ্যেই সে তলিয়ে গেছে। কী আশ্চর্য! একটা বিপুল অনুভূতি, যেন জন্মান্তর-বুলাকির জন্মান্তর।
রেললাইনটা পেরিয়ে একটা গলির মুখে মেয়েটি থমকে দাঁড়াল।
কী মা, চলতে পাচ্ছ না? কষ্ট হচ্ছে? আচ্ছা, তোমার ছেলে আমার কোলে দাও। দূরে একটা ল্যাম্পপোস্টের অস্বচ্ছ আলো। তাতে দেখা গেল, মেয়েটি যেন শিউরে উঠল। বুলাকি হাসল, ভয় নেই, ভয় নেই। গুণ্ডার হাত, কিন্তু ছেলে ধরতে পারব। তেমনি জড়িত গলায় মেয়েটি বললে, ঘুমুচ্ছে।
ঘুমোক, জাগাব না। বুলাকি হাত বাড়িয়ে সযত্নে পুঁটলিটা বুকের মধ্যে টেনে নিলে। কাপড়ের ভেতরে একটা নরম শিশুদেহের আভাস পাওয়া গেল।
আবার মেয়েটির অস্পষ্ট স্বর, আমি আগে হাঁটতে পারছি না, ভয় করছে।
বেশ, আমি আগে আগে যাচ্ছি।
বুলাকি চলতে শুরু করলে। গলির পর অন্ধকার গলি।
পরম স্নেহে বুলাকি শিশুটিকে বুকের মধ্যে ধরে রেখেছে, একটু ব্যথা না লাগে, ঘুম না ভাঙে। মনের ভেতরে তেমনি একটা অপূর্ব কৌতুক বোধ করছে সে। নামদার গুণ্ডা বুলাকিরাম ছেলে আগলে নিয়ে চলেছে, অত্যন্ত যত্নে, অত্যন্ত সাবধানে। দলের লোকেরা যখন শুনবে…
না না, কেউ শুনবে না। আজ রাত্রে বুলাকি সম্পূর্ণ আলাদা লোক। আজ তার একটি ব্যতিক্রমের মুহূর্ত। এ তার নিভৃত মনের মধ্যেই লুকোনো রইল।
অন্ধকার গলির মধ্যে কতক্ষণ চলেছে খেয়াল নেই, হঠাৎ মুখের ওপর টর্চের ঝাঁঝালো আলো। কড়া গলায় ধমক এল, কৌন হ্যায়?
সামনে এসে পড়েছে একটা সার্জেন্ট আর দুজন কনস্টেবল।
এই কেয়া হ্যায় তুমারা পাস?
মাইজি কো লেড়কা।
মাইজি? মাইজি কাঁহা?
চমকে বুলাকি পেছন ফিরল। মাইজি নেই, গঙ্গার ঘাটে পরম মুহূর্তে কুড়িয়ে-পাওয়া তার মায়ের চিহ্ন নেই কোথাও। টর্চের আলোয় ঝলকে উঠেছে সরীসৃপের মতো অন্ধকার
শূন্যগলিটা। বুলাকি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না।
উতারো, কেইসা মাইজিকা লেড়কা তুমারা!
বুলাকিকে কিছু করতে হল না, টর্চের আলোয় পাহারাওলারা কাপড়ের মোড়কটা খুলতেই চোখে পড়ল রক্তস্নাত একটি সদ্যোজাত শিশু! শুধু সদ্যোজাত নয়, তাকে গলা টিপে খুন করে ফেলা হয়েছে, যাতে জন্মের পর তার এতটুকু কান্নার শব্দও এত মানুষের পৃথিবীতে একবিন্দু সাড়া জাগাতে না পারে।
টর্চের আলোয় সে-বিভীষিকাটা যেন পাতালপুরীর দুঃস্বপ্ন!
শা-লা, খুনি!
হাতের ব্যাটনটা দিয়ে প্রচন্ড বেগে বুলাকির মাথায় ঘা বসাল সার্জেন্ট। মাথা ঘুরে বুলাকি পড়ে গেল মাটিতে, ডালহাউসি ফেরত ট্রামের ভদ্রবাবুদের প্রহারে যেমন করে জর্জরিত হয়ে সে পড়ে গিয়েছিল। চোখের সামনে অন্ধকার গলি, টর্চের আলো একসঙ্গে আবর্তিত হয়ে গেল, গঙ্গার ধারে কুড়িয়ে-পাওয়া সোনার মুহূর্তটি চুরমার হয়ে তলিয়ে গেল সীমাহীন একটা তমসার ভেতরে।
জয়দ্রথ বধ
অর্জুন এসে আমাকে বললে, চল প্যালা, জয়দ্রথ বধ করে আসা যাক।
শুনেই আমি চমকে গেলুম। কারণ অর্জুন নিতান্তই কিছু আর মহাভারতের অর্জুন নয়–সে আমাদের পটলডাঙার মিত্র স্কুলের পিলার–মানে ক্লাস টেনে তিনবার ফেল করে থামের মতো পাকাপোক্ত হয়ে আছে। আমাদের হেডমাস্টার মশাই তাকে ডাকেন খর্জুর বলে। অর্জুন অবশ্য খর্জুর খেতে ভালোই বাসে, কিন্তু ওই খাদ্যবস্তুটি হতে তার নিজের একটু আপত্তি আছে।
এ-হেন খর্জুর, থুড়ি, অর্জুন জয়দ্রথ বধ করতে চায় শুনে আমার কেমন যেন বিষম লেগে গেল।
অর্জুন বললে, হাঁ করে আছিস কেন? আমি কি তোর মুখে রসগোল্লা দিতে চেয়েছি নাকি?
আমি বললুম, না, প্রাণে ধরে কাউকে কোনও দিন তুই রসগোল্লা দিতে পারবি এ-অপবাদ তোর সব চেয়ে শত্রু-মানে হেডমাস্টার মশাইও দিতে পারবেন না। কিন্তু তুই এই কলিকালে জয়দ্রথকে পাবিই বা কোথা, আর বধ করবিই বা কেমন করে?
অর্জুন বললে, ধ্যাৎ, তুই কোনও কাজের নোস। খালি পেট ভর্তি পালাজ্বরের পিলে নিয়ে পটোল দিয়ে শিঙিমাছের ঝোলই খেতে পারিস। আরে আমি বলছি দিকপাল সাহিত্যিক জয়দ্রথ বোসের কথা–যে-ভদ্রলোক তিনশো তিপ্পান্নখানা উপন্যাস লিখেছেন।
আমি বললুম, তা খামকা তাঁকে বধ করবি কেন? আমি তো তাঁর খানপাঁচেক বই পড়েছি–নেহাত খারাপ তো লেখেন না। তাঁর সেই যে বইটাতে বাঙালী ডিটেকটিভ হিমাদ্রিপ্রসাদ সাবমেরিন নিয়ে চীনে দস্যু চুং চাংকে প্রশান্ত মহাসাগরের ত্রিশ হাজার ফুট জলের তলায় গ্রেপ্তার করেছিল–সেটা তো দারুণ থ্রিলিং। তা ছাড়া তাঁকে যে বধ করতে যাচ্ছিস, গায়ের জোরে কি পারবি? একটা মিটিঙে আমি তাঁকে দেখেছি। বিরাট মোটা-অ্যায়সা ভুঁড়ি—
অর্জুন বললে, ধ্যাৎ, তুই জ্বালালি। তোর মাথার ভেতরে তুরপুন চালালে গোবরও বেরুবে না, বেরুবে ছাগলের নাদি! আরে সে-বধ নয়। আজকাল বিনি পয়সায় লেখকদের কাছ থেকে বই বাগাচ্ছি আমি। এবার জয়দ্রথ বোসের পালা।
বিনি পয়সায় লেখকরা বই দেন তোকে?–আমার রোমাঞ্চ হল; তুই বুঝি তাঁদের বাড়িতে গিয়ে ধরপাকড়–কান্নাকাটি, এই সব করিস?
ধরপাকড়, কান্নাকাটি করব আমি—ছোঃ! –অর্জুন তার খর্জুরবৃক্ষের মতো ঝাঁকড়া মাথাটা নেড়ে, হাত-পা ছুঁড়ে বললে, আমি অর্জুন শিকদার– বুদ্ধির জোরেই ম্যানেজ করে নিই।
