শা–লা …
সাপের গর্জনের মতো চাপা আক্রোশটা আবার বেরিয়ে এল মুখ দিয়ে। কিন্তু আর হাঁটতে পারছে না। কাঠের পা-টা অত্যন্ত বেশি ভারী বলে মনে হচ্ছে। এ পায়েরও জোড়গুলো যেন আলগা হয়ে গেছে সব। আর এত দুঃখের মধ্যেও ভাঙা আতরের শিশিটা থেকে একটা উগ্র গন্ধ যেন তার সর্বাঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। যেন ঠাট্টা করছে বুলাকিকে।
মেহেরজান। চিৎপুরের গলি। ল্যাম্পপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে আছে জাফরান-রং একখানা শাড়ি পরে। রঙিন কাঁচুলির বাহার প্রলোভন জাগিয়ে উঁকি দিচ্ছে পাতলা শাড়ির আড়াল থেকে। আবছা-আলোয়-ভরা মেহেরজানের ঘর। মেজেতে নরম বিছানা পাতা, একরাশ ছোটো-বড়ো বালিশ।
কিন্তু না। অনেক দিন কিছু দেওয়া হয়নি বেচারিকে। ওরও বড়ো কষ্ট। বয়েস হয়ে গেছে, সস্তা পাউডার মেখেও মুখের দাগগুলো ঢাকা পড়ে না। খরিদ্দার দেশলাই জ্বালিয়েই অন্য দিকে এগিয়ে যায়। আক্রার বাজার, কায়ক্লেশে দিন চলে, তবু বুলাকিকে কখনো বিমুখ করে মেহেরজান। ভালোবাসে? কে জানে! কিন্তু ভয় করে বই কী। বাঘের মতো হিংস্র বুলাকি, সাপের মতো ভয়ংকর। একখানা পা নাই বটে, কিন্তু ছোরা চলে নিখুঁত এবং নির্ভুলভাবে। তাই হয়তো বিনা প্রতিবাদেই আত্মসমর্পণ করে, সোহাগের কথা বলে, নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ায়।
কিন্তু বুলাকিরও তো একটা ধর্মভয় আছে। সত্যি বড়ো কষ্ট মেহেরজানের। শাড়ি ছিঁড়ে গেছে। পেট ভরে খেতে পায় না যুদ্ধের বাজারে। কুৎসিত মুখ দিনের পর দিন আরও কদর্য হয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে যদি বুলাকি ওকে কিছু দিতে পারত—অন্তত একখানা শাড়ি দিয়েও…
পাখির পালকের মতো নরম আলগা ছোঁয়ায় ব্যাগটা চমৎকার হাতের ভেতরে চলে এসেছিল। বেশ পুরু ব্যাগটা, পাঁচশো টাকা ছিল! উঃ, পাঁচশো টাকা! ভাবতেও গায়ের লোমগুলো শিরশির করে উঠল। ওই টাকায় কী হতে পারত এবং কী হতে পারত না! ইস! হাতের মধ্যে এসেও ফসকে গেল, শুধু একটুর জন্যে।
হারামজাদা…
কিন্তু আর চলতে পারছে না। মাথা ঘুরছে। বুলাকি আবার পার্কটার দিকে তাকাল। বড়ো ভিড় ওখানে, ভদ্রলোকের ভিড়। একটু নির্জনতা দরকার বুলাকির, একটু নিরিবিলি।
এ রিকশ…
ঠুন ঠুন করে রিকশাওয়ালা এল।
কাঁহা যাইয়েগা?
রথতলা ঘাট, গঙ্গা।
আট আনা লাগেগা। এক বার বুলাকির সর্বাঙ্গে সংশয়ভরা দৃষ্টি বুলিয়ে নিলে রিকশাওয়ালা।
চলো ভাই চলো। সব ঠিক হো যায়গা।
ঠুন ঠুন ঠুন। রিকশা চলছে। বিডন স্ট্রিট-ঠোঙাপরা আলো, স্বচ্ছ অন্ধকার। হেমন্তের কুয়াশা আর উনুনের ধোঁয়া আকাশে কুন্ডলী পাকাচ্ছে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ। ওখান দিয়ে একটু এগিয়ে মসজিদবাড়িতে ঢুকলেই…
সেই গলি! গ্যাস-পোস্ট। জাফরানরঙা শাড়িপরা মেহেরজান। ঘরের মেজেতে নরম গদি আর তাকিয়া। হাতের মুঠোর মধ্যে পাঁচশো টাকা কেমন অবলীলাক্রমে চলে এসেছিল। উঃ, ভদ্রলোক, ওই ভদ্রলোকদের এক বার হাতে পেলে দেখে নেবে বুলাকি। ছোরার মুখে একটা তাজা কলিজাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতে কতক্ষণ লাগে!
টুন টুন টুন। চিৎপুর দিয়ে রিকশা চলেছে। পথের দু-দিকের রোয়াকে চোখে পড়ছে আরও অনেক মেহেরজানকে। ওদের প্রায় সকলকেই চেনে বুলাকি, বুলাকিকেও ওরা চেনে। কিন্তু সবাই মেহেরজান নয়। খালি-পকেট প্রেমিককে ভালোবাসা বিলোতে রাজি নয় ওরা— ওদেরও বুলাকিরা আছে।
উতারিয়ে।
স্ট্র্যাণ্ড রোডের রেললাইন পেরিয়ে রিকশা চলে এসেছে রথতলা ঘাটে। সামনে অন্ধকার গঙ্গা। দূরে একটা মালগাড়ির ইঞ্জিন দাঁড়িয়ে অকারণে হুশ হুশ করছে।
উতারো ভাই, গঙ্গাজি আ গিয়া।
ঠারো বাপ ঠারো। খোঁড়া আদমি…
কাঠের পা-টা আগে বাড়িয়ে দিয়ে নামল বুলাকি। শরীরটা টাল খেল এক বার। একটুর জন্যে পড়েনি। ভদ্রলোকেরা শরীরে আর কিছু রাখেনি, মেরে একেবারে থ্যাঁতলা করে দিয়েছে।
কোমরের কষি থেকে সাবধানে বুলাকি খুঁজে বার করলে গেজেটা। আড়াই টাকার মতো সম্বল আছে এখনও। আট আনা পয়সা দিয়ে রিকশাওয়ালাটাকে সে বিদায় করে দিলে।
সামনে হেমন্তের গঙ্গা। জোর হাওয়া দিচ্ছে—শীত শীত করতে লাগল। কিন্তু বুলাকির ভালো লাগল, এই হাওয়াটা যেন তার দরকার ছিল। যেন এরই জন্যে এতক্ষণ প্রতীক্ষা আর প্রত্যাশা করে ছিল সে। মাথার ভেতর যে-আগুনটা জ্বলছিল, গঙ্গার বাতাসে তার অনেকটাই যেন নিবে এল।
চারদিকটা প্রায় নির্জন। একে অন্ধকার, তার ওপরে শীতের বাতাস। শুধু গঙ্গার ঘাটে দু একজন লোক বসে আছে, ভালো করে তাদের বোঝা যাচ্ছে না, কয়েকটা ছায়ামূর্তি বলে মনে হচ্ছে। এদিকে বিস্তীর্ণ পোস্তাটা সম্পূর্ণ নির্জন হয়ে আছে। এই শীতের সন্ধ্যায় ওখানে বসে হাওয়া খাওয়ার শখ নেই কারও।
সিঁড়ি দিয়ে বুলাকি নীচে নেমে এল। গঙ্গায় ভরা জোয়ারের টান, জল অনেকখানি ওপরে উঠে এসেছে, ছলছল করে ইটের গায়ে বাজিয়ে চলেছে মিষ্টি জলতরঙ্গ। ওপারে হাওড়ার আলো, দু-তিনটে বড়ো বড়ো কলের চোঙার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মাঝগাঙে দুটো নারকেলের জাহাজ নোঙর করে আছে, অন্ধকার স্রোতের ওপরে লাল-সবুজ আলোর দীর্ঘায়িত রেশ নাচানাচি করছে।
হাত দুটো জলে ডুবিয়ে দিতেই একটা স্নিগ্ধ ভালোবাসার স্পর্শে যেন বুলাকির সমস্ত শরীরের ভেতরটা আনন্দিত হয়ে উঠল। আঁজলা আঁজলা করে সে ঘোলা গঙ্গাজল খেল, মাথা-মুখ সমস্ত ধুয়ে নিল। অর্ধেক গ্লানি যেন তার কেটে গেছে। গঙ্গার ঠাণ্ডা বাতাসে আশ্চর্য একটা ঘুমপাড়ানি। আঃ!
