হাতের কাজ হয়েছিল নিখুঁত। পাখির পালকের চাইতেও নরম আর আলগা ছোঁয়ায় পকেট থেকে ব্যাগটা তুলে নিয়েছিল। ট্রামের দরজার সামনে যা ভিড় হয়েছে এবং যেভাবে মানুষ পাগলের মতো ওঠবার চেষ্টা করছে তার ভেতরে কেউ যে ঘুণাক্ষরে টের পেতে পারে এমন আশঙ্কাও মনে জাগেনি। বিকেল সাড়ে ছ-টার সময় ডালহাউসি ফেরত ট্রামের মতো শিকারের এমন অপূর্ব জায়গা আর কী আছে?
আর মাত্র একটা স্টপ এগোতে পারলেই সে নেমে পড়তে পারত। মুহূর্তে মিলিয়ে যেতে পারত যুদ্ধরত কলকাতার উন্মত্ত উদ্দাম জনারণ্যের মধ্যে। তারপরে লালাজির মদের দোকান। তিন-চার বোতলের দাম বাকি পড়েছে, আজকেই মিটিয়ে দিয়ে প্রাণভরে খেয়ে নিতে পারত। আস্তে আস্তে স্তিমিতদীপ কলকাতার ওপর দিয়ে পিঙ্গল রাত্রি আসত ঘনিয়ে। ডাস্টবিন, ডিমের খোলা আর কাঁচা নর্দমার পেঁকো গন্ধ-ভরা গলিতে অবগুণ্ঠিত একটি গ্যাসপোস্টের নীচে বসন্তের দাগলাগা মুখের ওপর সস্তা পাউডারের প্রলেপ লাগিয়ে যেখানে মেহেরজান দাঁড়িয়ে আছে খরিদ্দারের আশায়, টলতে টলতে সেখানে গিয়েও পৌঁছোতে পারত। একটি রাত্রি। কেটে যেত—আকাশ বাতাস পৃথিবীর আকার-অবয়বহীন পিন্ডাকার একটি কবোষ্ণরাত্রি।
যে-কল্পনাটা মনের মধ্যে নীহারিকার মতো ঘুরছিল, পরিপূর্ণ একটা রূপ পাওয়ার আগেই আচমকা খানিকটা ঝোড়ো হাওয়ায় সেটা দিগন্তে মিলিয়ে গেল।
ট্রাম ছুটছিল পুরো দমে। অভ্যস্ত ডান হাতটা পাখির পালকের মতো নরম আলগা ছোঁয়ায় পকেট থেকে স্ফীতকায় ব্যাগটা তুলে নিয়েছিল। কিন্তু লেডিজ সিটের পাশে কোনার ছোটো জায়গাটিতে যে ছোকরা বাবুটি মন দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াচ্ছিল সে হঠাৎ তড়াক করে লাফিয়ে উঠল।
নিলে, নিলে, … পকেটমার…
কে, কে, কই? প্রচন্ড হট্টগোল। ট্রামের দড়িতে টান পড়ল, ঘচাং করে থেমে গেল গাড়িটা।
তখন আর উপায় ছিল না। বিদ্যুদবেগে সেই অবস্থাতেই নীচে লাফিয়ে পড়ল। কিন্তু সেইসঙ্গেই তার ঘাড়ের ওপরেও ঝাঁপিয়ে পড়ল আরও পাঁচ-সাত জন। হাতে হাতে ধরা পড়ল বুলাকিরাম।
ব্যাগের মালিক ছোঁ দিয়ে ব্যাগটা তুলে নিলেন। আধবয়সি প্রৌঢ় লোক, গলাবন্ধ কোটের সঙ্গে জড়ানো সিল্কের চাদর। ইউরোপিয়ান ফার্মের বড়োবাবু।
আশঙ্কায় ভদ্রলোকের মুখ নীল হয়ে গেছে। কী সর্বনাশ! এখুনি পাঁচশো টাকায় ঘা দিয়েছিল শালা!
দেখুন, দেখুন সব ঠিক আছে কি না।
এস্ত-হাতে ব্যাগ খুলে নোটের তাড়াটা দেখে নিলেন ভদ্রলোক।
বুলাকি কী বলবার চেষ্টা করলে, কিন্তু বলতে পারলে না।
চারদিক থেকে নির্বিচারে কিল-ঘুসি আসছে বন্যার মতো।
নিঃসাড় নির্বাক হয়ে পড়ে রইল বুলাকি। এর পরে থানায় যেতে হবে। নাক থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত রাস্তার ধুলোর ওপরে গড়িয়ে পড়তে লাগল।
কিন্তু ভদ্রলোক দয়ালু।
ছেড়ে দিন মশাই, ছেড়ে দিন। ব্যাগ তো পাওয়াই গেছে, এখন আর…
ঘণ্টা বাজিয়ে ডালহাউসি স্কোয়ারের ট্রাম শ্যামবাজারে চলে গেল।
বুলাকি অবশ্য বেশিক্ষণ পড়ে রইল না পথের ধারে। কাঠের পাটায় ভর দিয়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। চড়ের জ্বালায় গাল দুটো চিনচিন করছে। মুখের ভেতরে একটা কেমন নোনতা নোনতা স্বাদ, দাঁত দিয়ে রক্ত পড়ছে নিশ্চয়। নাকের রক্তে বুকের জামাটায় তিন চারটে বড়ো বড়ো ছোপ পড়েছে।
শা–লা…
বিকৃত মুখে বিড়ির জন্যে পকেটে হাত দিলে বুলাকি। বিড়ি নেই। ব্যাগের সন্ধান করতে গিয়ে ভদ্রবাবুরা বিড়িগুলো সব ছড়িয়ে দিয়েছে পথের ওপর—ধুলোয় বিবর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট দুঃখের কারণ নয় বুলাকির। মেহেরজানের জন্যে এক শিশি শৌখিন আতর যে কিনেছিল, ওইসঙ্গে সেই শিশিটাও গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে একেবারে।
দিগন্তে বিলীয়মান ট্রামটার দিকে এক বার আগুনঝরা চোখ মেলে তাকাল বুলাকি। আবার
বললে, শা–লা!
আশপাশের ভিড়টা সম্পূর্ণ কাটেনি এখনও। চারদিক থেকে নানা রকমের মন্তব্য কানে আসছে।
অতি বদমায়েস এই ব্যাটারা মশায়। সেদিন পকেট থেকে আমার শেফার্স কলমটা দিব্যি তুলে নিয়ে গেল। পুলিশে দেওয়া উচিত ছিল হারামজাদাকে।
হারামজাদা! বুলাকির রক্ত গর্জে উঠল ফণাতোলা সাপের মতো। সঙ্গে যদি একখানা ছোরা থাকত আর অবকাশটা যদি অনুকূল হত, তাহলে এর জবাব দিতে পারত বুলাকি। কিন্তু সে সময় নয়, সে-সুযোগও নেই। মেছোবাজারের সংকীর্ণ গলির পথে এখনও সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসেনি। এখানে কলকাতার বড়ো রাস্তার ওপরে এখনও দিনের ঝকঝকে আলো ঝলকাচ্ছে। এখানে ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে ট্রাম, ছুটে চলেছে বাস, রিকশা, ট্যাক্সি আর মিলিটারি কনভয়ের সারি।
পকেটের ফুল-কাটা শৌখিন রুমালে নাক-মুখ মুছে নিলে বুলাকি। আড়ষ্ট পায়ে একটু একটু করে এগোতে লাগল। মাথাটা ঘুরছে, কিল-চড়গুলো কিছুমাত্র দয়া করেনি কোথাও। একটু বসা দরকার। একটু চা খেতে পেলেও ভালো হত।
বেলা ডুবে আসছে। কলকাতার বুকে সন্ধ্যা। ঠোঙাপরা আলোগুলো জ্বলে উঠছে একটার পর একটা। হেদুয়ার গাছগুলোতে কাকেরা কোলাহল করছে। পার্কে জনতা, ওখানে বসা চলবে না। একটু নিরিবিলি দরকার, একটু নির্জনতা।
হারামজাদা! কানের ভেতরে তখনও কথাটা যেন ছুঁচের মতো বিঁধছে। বুলাকির রক্ত ফেনিয়ে উঠতে লাগল। মেছোবাজারের দুর্গন্ধ গলিতে যদি ঘনিয়ে আসত ধোঁয়াটে অন্ধকার; যদি বুলাকির কাছে একখানা ছোরা থাকত; যদি ওই ভদ্রবাবুদের এক-এক জন করে সে। পেত…
