জগন্নাথবাবু খাওয়া-দাওয়া করতে একটু ভালোই বাসেন। তা ছাড়া ভালো জিনিস খেতে তাঁর আরও ভালো লাগে। ভেবেছেন, বিকেলে বেশ দরদ দিয়ে ওগুলো সাবাড় করবেন। তাই নিজের হাতেই লুকিয়ে রেখেছেন ভাঁড়ারে, বাড়ির কাকপক্ষীতেও টের পায়নি।
কিন্তু কাকপক্ষীতে টের না পেলেও ঝন্টু পাবে না এর কী মানে আছে।
অতএব
অতএব কটকটে ব্যাংয়ের দ্বারা বিপর্যস্ত জগন্নাথবাবু যখন ঝন্টুর হাড়-মাংস গুড়ো করে চাপ বানিয়ে খাওয়ার জন্যে লাফাচ্ছেন, তখন উলটে ঝন্টুই তাঁকে খেয়ে ফেলেছে, মানে তাঁর ছানাবড়াকে।
–ঝন্টে–ঝন্টি–ঝন্টা–ওরে হারামজাদা
ভদ্রলোক চেঁচিয়ে যাচ্ছেন সমানে। এমন সময় উড়ে চাকর দাশরথি ঘটনাস্থলে প্রবেশ করলে।
বাবু, ম দেখিথিলা–
কী দেখেছিস?
–ছোটবাবু ভাণ্ডারে ঢুকি ছানাবড়া খাইথিলা–
অ্যাঁ!–জগন্নাথ ধাবিত হলেন ভাঁড়ারের দিকে।
কিন্তু ঝন্টুর কান অনেক খাড়া। এসব বড়বিদ্যার ব্যাপারে হাত পাকাতে হলে অনেক হুঁশিয়ার থাকতে হয়। জগন্নাথ ভাঁড়ার পর্যন্ত পৌঁছুবার আগেই ঝন্টু লাফিয়ে পড়ল উঠনে, তারপর সদর রাস্তা দিয়ে–
–আজ ওরই একদিন, কি আমারই একদিন।–গর্জন করলেন জগন্নাথ চাকলাদার। তাঁর টিকিতে একটা জবাফুল বাঁধা ছিল, প্রতিজ্ঞা শুনে সেটাও যেন নেচে উঠল তড়াক করে।
কিন্তু ততক্ষণে টালিগঞ্জের রাস্তায় ঝন্টু হাওয়া।
–যাবে কোথায়? কান ধরে টেনে আনব না। নিপাত করে ছাড়ব আজ-জগন্নাথ প্রতিজ্ঞা করলেন। তারপর টিকিটাকে আর একবার নাচিয়ে যাত্রা করলেন পুত্রবধের মহৎ উদ্দেশ্যে।
হায়, তখন কি তিনি জানতেন
না, জানতেন না। জানতেন না সিধু নন্দী আর বিধু দত্ত গাঁজা খেয়ে ভাম হয়ে বসে আছে। আরও জানতেন না, তারা একটা দুর্দান্ত কিছু করে ফেলবে বলে দস্তুরমতো বদ্ধপরিকর।
হারানমুদির দোকানের সামনে একটা দড়ির খাটিয়ায় বসেছিল দুজনে। মুখ থেকে খানিকটা দুর্গন্ধ ধোঁয়া ছেড়ে দিলে সিধু নন্দী। তারপর :
সুনেচিস বিধু, কলকাতায় ছেলেধরা এসেছে।
সিধু নন্দীর মুখে শ বেরোয় না সব S।
কী করা যায় বল দিকি?
গাঁজা খেলেই বিধু দত্তের মুখ দিয়ে হিন্দী বেরুতে থাকে। গোঁফে তা দিয়ে বললে, জানসে মার দেগা, আউর কেয়া?
সিধু বললে, সেদিন শ্যামবাজারে দুটো ছেলেধরা ধরেছে। আমরা একটাও পেলাম না। কী দুঃখের কথা বল দিকি। কেমন চমৎকার হাতের সুখ করে নেওয়া যেত।
–এ তো বাত ঠিকই হ্যায়।-বিধু গোঁফে চাড়া দিলে : বুঝলি, হামলোককা নসিব খারাপ। এক ব্যাটাকে পাতা তো পিটকে পিটকে একদম ছাতু বানা দেতা
-সত্যি, একটা ছেলেধরা ঠ্যাঙাতে না পারলে আর প্রাণে সুখ নেই–সিধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বিধু বললে, যা বলেছিস। ছেলেধরাই যদি পিটতে না পারলুম, তবে বেঁচে থেকে আর কেয়া সুখ যায়। চল, হিমালয়মে যাই হামলোক। সাধু বন যাই বিধুর গলার স্বরে নিদারুণ বৈরাগ্যের আভাস।
সিধু আরও করুণ কী একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় :
বিধু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল তড়াক করে। গোঁফে চাড়া দিয়ে বললে, এই, দেখতা হ্যায়?
-কী রে?
–একঠো টিকিওলা আদমি এক বাচ্চাকে টানতে টানতে লে যাতা হ্যায়।
–তাই তো। সিধুও লাফিয়ে উঠল : এই যে হিচকে নিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাটা কাঁদছে, যেতে চাইছে না। হুম!
–তা হলে
কোনও সন্দেহ নেই, নির্ঘাত ছেলেধরা। টালিগঞ্জের রাস্তা নির্জন দেখে–ছেলেটাকে
মারো উসকো–বিধু লাফিয়ে পড়ল : জান্সে মার দো—
–জয় হিন্দ। রণহুঙ্কার ছাড়ল সিধু নন্দী। তারপর দুজনে তাড়া করল ছেলেধরাকে।
টিকিওলা আদমি প্রথমটায় কিছু বুঝতে পারেনি, পেছন থেকে পিঠের ওপর একটি রাম-কিল পড়তেই ক্যাঁক করে উঠল সে।
এই মারছ কেন?
–মারব না? তুমি তো ছেলেধরা–আর একটা চাঁটি পড়ল টাকের ওপর।
বা রে, এ আমার নিজের ছেলে
–সকলেই ওরকম বলে বিশেষ করে পরের ছেলে গায়েব করতে হলে গালে একটি থাপ্পড় পড়ল।
জগন্নাথ এবারে রুখে উঠলেন : রাস্তার মধ্যে এসব কী মশাই। নিরীহ লোককে ধরে মার দেওয়া? আমি পুলিশ ডাকব।
–পুলিশ ডাকবে। তার আগে পুলটিশ করে ছাড়ব তোমার–এবার টিকিতে হ্যাঁচকা টান পড়ল একটা! রামটান যাকে বলে!
উঃ গেছি-গেছি–জগন্নাথ আর্তনাদ করে উঠলেন : এই ঝন্টে, তুই বল না? আমি কি ছেলেধরা? আমি কি তোর বাবা নই?
ঝন্টুর তখনও কান দুটো টনটন করছে জগন্নাথের কড়া হাতের মোচড়ে। একবার চোখ পিটপিট করে উঠল তার। তারপর বললে, তা তো জানি না। তুমি আমাকে এমন মেরেছ। যে আমার বাপের নাম ভুলিয়ে দিয়েছ। আমার কি এখন মনে আছে তুমি আমার বাবা কি না!
জগন্নাথ কেঁদে বললেন, ওরে ঝন্টে, তোর মনে কি এই ছিল? আমি কি তোর বাবা নই? আমিই কি তোর বাপ জগন্নাথ চাকলাদার নই?
ঝন্টু বললে, কী জানি, মনে পড়ছে না।
সিধু গর্জে বললে, তবে রে ব্যাটা মিথ্যুক—
বিধু হেঁকে বললে, টিক্কি উখার লেও উসকো
তারপরে যা ঘটল তা প্রলয়।
–মার মার–ছেলেধরা—
সিধুর চাঁটি চলছে, বিধুর কিল। ঝন্টুর মুখে হাসি দেখা দিল। হ্যাঁ, মন্দ হয়নি এতক্ষণে। তাকে রাস্তায় ধরে যে-পরিমাণে ঠ্যাঙানি দিয়েছিল জগন্নাথবাবু তা উসুল হয়ে গেছে সুদে-আসলে।
জগন্নাথবাবু তখন গোঙাচ্ছেন : ঝন্টু ঝন্টু ঝন্টু! বাপ আমার
ঝন্টু বললে, গায়ে হাত তুলবে আর?
জগন্নাথ গোঙাতে লাগলেন : নাকে খত।
ছানাবড়া?
সব তোর। দু হাঁড়ি মিঠাই এনে দেব আরও—
