মনে থাকবে?
–আর ভুল হয়? এখন আমায় বাঁচা বাপধন
ততক্ষণে চারদিকে লোকে লোকারণ্য :কী! কী হয়েছে?
ঝন্টু চেঁচিয়ে উঠল, ওগো, তোমরা দাঁড়িয়ে দেখছ কী…দুটো ছেলেধরা যে আমার বাবাকে মেরে ফেলল।
সিধু বিধু আঁতকে উঠল।
ঝন্টু বললে, সত্যি বলছি মশাইরা। এই লোকদুটো আমাকে নিয়ে যাচ্ছিল, বাবা বাধা দেওয়াতে এরা–
আর বলতে হল না।–মারো ব্যাটাদের–তিন-চারশো লোক ঝাঁপ দিয়ে পড়ল সিধু-বিধুর ওপরে।
বিধু চেঁচাতে লাগল : শুনুন মোশাইরা–শুনিয়ে আপলোগ—
কিন্তু কে শোনে তার কথা। হাটুর কিল তখন চলছে পাইকারি হারে। টালিগঞ্জের রাস্তায় কুরুক্ষেত্র কাণ্ড!
ওদিকে একফাঁকে পাশের গলি দিয়ে কেটে পড়েছে পিতাপুত্র।
অনেকটা এগিয়ে যখন সম্পূর্ণ নিরাপদ বোধ হল, তখন ঝন্টু ডাকল : বাবা!
কী বাপধন? সুধামাখা গলায় জগন্নাথ বললেন :কী চাই?
ছানাবড়া?
–আরও দুহাঁড়ি এনে দেব। তোমার জন্যই তো সব–জগন্নাথের গলার স্বরে ছানাবড়ার রস ঝরে পড়ল যেন।
জগন্নাথের ঠ্যাঙা
দুখীরাম গরিব ভিখিরি।
বয়েস বেশি নয়, জোয়ানই বলা চলে তাকে। কিন্তু তার মা নেই, বাপ নেই, ভাই নেই, বোন নেই, এক কথায় বিশ্বসংসারে কেউ নেই। তাতেও দুখীরামের দুঃখ ছিল না, খেটেখুটে, পেটের ভাতের যোগাড়টা সে করতে পারত। কিন্তু একটা পা আবার তার খোঁড়া। কাজেই ভিক্ষে ছাড়া তার আর গতিই নেই।
দুপুরের চড়া রোদ্দুরে পাড়াগাঁয়ের রাস্তায় দুখীরাম ভিক্ষে করে ফিরছিল। দারুণ গরম বাতাসে যেন আগুন ছুটছে। দুখীরাম আর চলতে পারল না, পথের ধারে মস্ত একটা অশথগাছ গোল করে ঠাণ্ডা ছায়া ছড়িয়েছে, হাতের লাঠিটা পাশে রেখে সেখানেই শুয়ে পড়ল সে।
ঘুম ভাঙল তার বিকেলে। উঠতে গিয়ে দেখল, লাঠিটা নেই। সে ঘুমুচ্ছে দেখে, কোনও দুষ্টু লোক মজা করবার জন্যে লাঠিটা নিয়ে কোথাও ফেলে দিয়েছে। গরিব ভিখিরির ভাঙা লাঠি চুরি করবে, এমন চোর অবশ্য বিশ্বসংসারে নেই।
কিন্তু লাঠি চুরিই যাক আর কেউ ফেলেই দিক, দুখীরামের অবস্থা সঙ্গিন। লাঠি ছাড়া দুপা হাঁটাই তার পক্ষে মুশকিল। এখন সে ভিক্ষেয় বেরুবে কী করে আর কেমন করেই বা বাড়িতে ফিরে যাবে? তার নিজের কুঁড়েঘরটাও যে এখান থেকে প্রায় মাইলখানেক দূরে।
একে তো সারাটা দিন ভিক্ষে-শিক্ষে করে বিশেষ কিছুই হয়নি, পেটে খিদের আগুন জ্বলছে, তার ভেতরে এই বিপদ। দুখীরাম আর সইতে পারল না। ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলল
তখন হঠাৎ একটা শব্দ শুনল সে : ঠপাস। মনে হল, তার পিছনেই ওপর থেকে কী একটা পড়ল।
চমকে তাকিয়ে দুখীরাম দেখলে, একখানা লাঠি। যেসব লাঠি হাতে করে বাবুরা বেড়াতে বেরোয়, ঠিক সেই রকম দেখতে, তবু একেবারে সেরকমটি নয়। কালো কুচকুচে লাঠিটার রঙ, গোটা কয়েক গাঁট আছে তাতে; হাতলের গায়ে রঙিন। কাঁচের ছোট-ছোট দুটো চোখ বসানো–হঠাৎ দেখলে মনে হয় চোখ দুটো মিটমিট করে তাকাচ্ছে।
দুখীরাম ভারি আশ্চর্য হয়ে গেল।
এ কার লাঠি? কাছাকাছি লোকজন কেউই তো নেই। অশথগাছটা থেকেই ওটা পড়ল মনে হচ্ছে, কিন্তু অশথগাছে লাঠি গজায় একথা কে কবে শুনেছে? কাকে অবশ্য গেরস্থ বাড়ি থেকে মুখে করে এটা-ওটা নিয়ে আসে, কিন্তু এত বড় একটা লাঠি বয়ে আনতে গেলে একটা নয়, অন্তত ডজন তিনেক কাক দরকার। এক হনুমানবাঁদরের কীর্তি হতে পারে, কিন্তু এ-তল্লাটে তো ওসব কিছুই নেই।
তবে এ লাঠি কার?
দুখীরাম কিছুক্ষণ দ্বিধা করল। তারপর ভাবল, যারই হোক আমি তো এখন কুড়িয়ে নিই। একটা লাঠি আমার নেহাতই দরকার, নইলে এক পা-ও আমি হাঁটতে পারছি না। পরে গাঁয়ের ভেতর জিজ্ঞেস করে মালিককে ওটা ফেরত দেব। কিছু বকশিশও মিলে যাবে নিশ্চয়।
দুখীরাম লাঠিটার দিকে হাত বাড়াল, আর সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে হল, সে হাত দিয়ে চেপে ধরবার আগেই লাঠিখানা তার মুঠোর মধ্যে এসে ঢুকল। যেন ওটা জীবন্ত, সে কখন ওকে ডাকবে, তারই জন্যে অপেক্ষা করছিল।
দুখীরামের সারা শরীর শিউরে উঠল। কিন্তু আদৌ তার ভয় করল না। লাঠিটাকে হাতে নেওয়া মাত্র যেন সে কেমন জোর পেল গায়ে, পেটে খিদে-তেষ্টা সত্ত্বেও ভারি স্ফূর্তি হল তার মনে। দুখীরাম লাঠিটায় ভর দিয়ে উঠে পড়ল, চলতে লাগল গ্রামের দিকে।
খাসা লাঠি। যেমন হালকা তেমনি শক্ত। দুখীরামের ওটা নিয়ে চলতে এত আরাম লাগল যে, সে যে খোঁড়া, সেকথা বেমালুম ভুলেই গেল সে।
পথের ধারে প্রাণকেষ্ট হালদারের বাড়ি। লোকটা ভারি খারাপ। একটা বিতিকিচ্ছিরি খেকি কুকুর সে পোষে, আর রাস্তায় গরিব-দুঃখী দেখলেই তার দিকে কুকরটাকে লেলিয়ে দেয়।
ব্যাপারটা জানত বলেই, ভয়েভয়ে দূর দিয়ে চলে যাচ্ছিল দুখীরাম। প্রাণকেষ্ট বাড়ির সামনে একটা খাঁটিয়ায় বসে বিড়ি টানছিল..সে ঠিক দেখতে পেল দুখীরামকে। শয়তানির হাসিতে প্রাণকেষ্টর মুখ ভরে উঠল।
খোক্কোস, লে–লে—ছো–ছো
খোক্কোস হল প্রাণকেষ্টর সেই বিটকেল খেকি কুকুরটার নাম। সে মনিবের খাঁটিয়ার তলায় বসে কটাং কটাং করে এঁটুলি কামড়াচ্ছিল, শুনেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। তারপরেই–ঘু-উ-উ-খ্যা, খ্যা, খ্যা, বলে সোজা তাড়া করল দুখীরামকে।
দুখীরামের প্রাণ উড়ে গেল। খোঁড়া পা নিয়ে সে যে কোন দিকে পালাবে ঠিক করতে পারল না। খোক্কোস তার সামনে গিয়ে সমানে খ্যাঁক খ্যাঁক করতে লাগল আর দুখীরামের দুর্গতি দেখে খাঁটিয়ার ওপর কুটপাট হতে লাগল প্রাণকেষ্ট।
