পিতার কণ্ঠস্বর বেজে উঠল সারা বাড়িতে। কিন্তু পুত্র নিরুত্তর। উত্তর দেবার উপায়ও ছিল না। দুগালে দুটো অ্যাই বড়বড় ছানাবড়া ঠেসে রাখলে কেই বা উত্তর দিতে পারে বলো? শুধু চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে ওঠে, তার বেশি নয়।
তা ছাড়া কাজটা যে খুব মহৎ হচ্ছে না, এ-খবরটিও বিলক্ষণ জানা আছে ঝন্টুচন্দরের। এই বয়সেই অমন পাখোয়াজ ছেলে পৃথিবীতে আর দুটি জন্মেছে কিনা সন্দেহ। পাখোয়াজ কথাটা শুনেই ভুল কোরো না। বাজনা নয়, পাখনাওয়ালা ছেলে। আট বছরের ছেলের মাথায় আটানব্বই বছরের মগজ। বাপ জগন্নাথ চাকলাদারকে এক হাটে কিনে স্রেফ তিনহাটে বিক্রি করে আনতে পারে; তাও কানাকড়িতে।
জগন্নাথ চাকলাদার বদরাগী লোক। চটে গিয়ে দমাদ্দম গাড়বদনাই ভেঙে ফেলেন গোটা কতক। একবার রাগের মাথায় দেওয়ালে লাথি মেরে পা ভেঙে বিছানাতেই লম্বা হয়ে রইলেন দেড় মাস। এ-হেন মনুষ্যও সামলাতে পারছেন না ঝন্টুচন্দরকে। পাখোয়াজের মতোই পাখোয়াজ ছেলেকে দুহাতে ঠেঙিয়েছেন তিনি। কিন্তু লাভের মধ্যে তাঁরই হাতের মাসল বেড়েছে–ঝন্টু যথাপূর্বং তথাপরম্।
চেহারার তুলনায় মাথাটা একটু বেশি বড় ঝন্টুর। তারকেশ্বরে ছেলের মাথা কামিয়ে লাউয়ের বোঁটার মতো একটা টিকি রেখে জগন্নাথ ভেবেছিল, এ-ছেলে তাঁর বিদ্যাসাগর না হয়ে যায় না। বিদ্যাসাগর হয়েছে বটে, কিন্তু বড়বিদ্যার।
ও হরি! বড়বিদ্যা কাকে বলে তা বুঝি জানো না? সেই যে শাস্ত্রে আছে : চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা, যদি না পড়ো ধরা–
হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেই কথাই বলছি। এই বয়সেই ঝন্টু ও কাজে যা হাত পাকিয়েছে তাতে বড়বড় সিঁদেল চোরেরও লজ্জা পাবার কথা। বাবার পকেট হাতড়ে পয়সা নিয়ে তেলেভাজা খাওয়া তার রোজকার ব্যাপার। ঠাকুরমার ভাঁড়ারে তো হাহাকার! সন্দেশ, কলা, নাড়ু, ক্ষীর ঝন্টুর দৃষ্টি পড়লে বেমালুম হাওয়া। পিঁপড়ে এসেও চাটবার জিনিস খুঁজে পাবে না।
ভুল কি আর হয় না? আরে হয় বই কি স্বয়ং ভগবানই যখন মাঝে মাঝে প্যাঁচে পড়ে যান, তখন ঝন্টুর আর কী দোষ? একবার এক হাঁড়ি দই ভেবে এক খাবলা চুন খেয়ে যা কাণ্ড! সাত দিন গাল-গলা ঢোল হয়ে রইল। আর-একবার আচারের বয়ামে নেংটি ইঁদুর পড়েছিল–অন্ধকারে সেইটেকে আচার ভেবে কামড় দিয়ে
আরে থুঃ থুঃ!
তা ওতে ঘাবড়াবার বান্দা নয় ঝন্টু। আসলে কোনও কিছুতেই সে ঘাবড়ায় না।
জগন্নাথ চাকলাদার তাকে যতই থাবড়ান না কেন–কিছুতেই দমাতে পারেননি। বরং সে-ই তাঁকে দমিয়ে ফেলেছে।
তেল ঢেলে দিয়েছে তাঁর লেখবার দোয়াতে। চেয়ারের পায়ার নীচে সাইকেলের বল রেখে দিয়েছিল একবার, বসতে গিয়ে চেয়ার-ফেয়ার সুদ্ধ উলটে-পালটে একেবারে গজকচ্ছপ হয়ে গেলেন চাকলাদার। আর-একবার নেমন্তন্নে যাবেন, ঝন্টুকে নিয়ে যেতে চাননি সঙ্গে করে! খানিকক্ষণ গোঁ ধরে বসে রইল ঝন্টু, তারপর বেমালুম চুপচাপ। যেন নেমন্তন্নে তার এক বিন্দু রুচি নেই–তার কাছে জুতোর সুকতলা আর ফুলকো লুচি দুই-ই সমান।
বদরাগী হলেও জগন্নাথ চাকলাদার মাথামোটা লোক। নিজের ছেলের অতলগর্ভ রহস্যের কথা তাঁর জানা ছিল না। জানলেন যথাসময়ে।
গরদের পাঞ্জাবি পাট করে সাজিয়ে রেখেছিলেন আলনায়। তরিবত করে যেই গায়ে দিতে যাবেন, অমনি তাজ্জব ব্যাপার। হাতদুটো হাতেই রইলবাকি জামাটা খসে পড়ল তিন-চার টুকরো হয়ে। জগন্নাথ হাঁ করে রইলেন। নতুন জামাটার এই বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড দেখে কথাই খুঁজে পেলেন না তিনি।
ব্যাপারটা জলের মতো তরল। একখানা দাড়ি কামাবার ব্লেড ব্যস! তারপর কচাকচ শব্দে সেলাইগুলো কেটে ফেলতে আর কতক্ষণ।
রাগের চোখে জগন্নাথ একটা কাঁচের গ্লাস ভেঙে ফেললেন, ভাঙা কাঁচে আঙুল কেটে গেল। তারপর সেই কাটা আঙুলে জলপট্টি বেঁধে তিনি ঝন্টুর বাপের মানে নিজের শ্রাদ্ধ করতে শুরু করলেন প্রাণপণ চিৎকারে। আর ঠিক সেই সময় তেতলার চিলেকোঠায় বসে নির্বিকার মুখে একখানা আস্ত তাল-পাটালি সাবাড় করলে ঝন্টু।
সংক্ষেপে এই হল পিতা-পুত্র সংবাদ।
জগন্নাথ আবার হুঙ্কার করলেন : এই ঝন্টু, ঝন্টু
হুঙ্কার করার কারণ ছিল যুক্তিসঙ্গত। অফিসের কাগজ বার করবার জন্যে যেই টেবিলের টানাটা খুলেছেন, অমনি তার ভেতর থেকে একটা কটকটে ব্যাং লাফিয়ে পড়েছে তাঁর গায়ে। তিনি হাঁইমাই করে চেঁচিয়ে উঠতেই দোতলার জানলা থেকে একলাফে ব্যাংটা নেমে গেছে সদর রাস্তায়।
উকিলের ড্রয়ারে মামলা গজায়, টাকাও গজায়, কিন্তু ব্যাং যে গজায় এমন কথা কোনও অভিধানে লেখেনি। পরপর তিনটে চায়ের পেয়ালা আর একটা মস্ত জামবাটি ভেঙে ফেলে জগন্নাথবাবু সারা বাড়িময় দাপাদাপি করে বেড়াতে লাগলেন; ঝন্টু ঝন্টু
ভাঁড়ারের অন্ধকার কোনায় ঝন্টু তখন ধ্যানস্থ। একেবারে পরমহংসত্ব লাভ করে বসে আছে। দুগালে ছানাবড়া, চোখদুটোও বেরিয়ে আসছে ছানাবড়ার মতো।
অর্থাৎ জগন্নাথবাবু শুধু ব্যাংই দেখেছেন। তাঁর অজ্ঞাতে কত বড় আর-একটা সর্বনাশ যে ঘটতে চলেছে তা তিনি টেরও পাননি।
সকালে কেষ্টনগর থেকে তাঁর একজন মক্কেল এসেছিল। জগন্নাথবাবুর মতে মক্কেল মানে বে-আক্কেল জীব, পয়সা দেবার নামেই চোখ উলটে যায় তাদের। কিন্তু এ-মক্কেলটি লোক ভালো। টাকা তো তাঁকে দিয়েছেই, সেই সঙ্গে একহাঁড়ি ছানাবড়া।
