(৮) মুভাত্তুপুলা, কেরালা : ভারতের অন্যতম আধুনিক গণিকালয়। এখানে ক্লায়েন্টরা অনলাইনে বুকিং করেও আসতে পারেন আনন্দ করার জন্য। তাছাড়াও এখানে ফোনে বুকিংয়ের সুবিধাও আছে বিভিন্ন এজেন্ট মারফত। এই এলাকায় যৌনকর্মীরা প্রধানত কেরলের মেয়ে এবং শ্রীলঙ্কারও কিছু মেয়ে আছে এখানে।
(৯) রেড লাইট জেলা, জম্মু : জম্মুতে আছে রেড লাইট অঞ্চল। যদিও জম্মু বিখ্যাত এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য। কিন্তু অনেক পুতুলের মতো সুন্দরী মেয়েরা আছে এখানে, যাঁরা যৌনকর্মীর কাজ করে। এখানকার বেশিরভাগ মেয়েকেই জোর করে করানো হয় এই কাজ।
(১০) ওয়াডিয়া, গুজরাট : প্রাচীনকালে থেকেই এই এলাকায় নারী পতিতাবৃত্তির মাধ্যমে তাঁদের পরিবারকে সমর্থন করার জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে,। যদিও পুরুষরা আসলে মহিলাদের জন্য গ্রাহকদের সন্ধান করে। সঠিক ভাষায়, এই শহরে পুরুষরা পিম্পস এবং শতাব্দী প্রাচীন সংস্কৃতি বর্তমান। যার কারণে এটি শেষ করা কঠিন। শিক্ষা ড্রাইভ এবং গণ বিবাহের একটি ছোটো প্রভাব ফেলেছে বটে, কিন্তু বড়ো অনুশীলন অবৈধভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে।
(১১) উত্তরপুর, মধ্যপ্রদেশ : উত্তরপ্রদেশের একটি ছোট্ট গ্রাম নেক্র, এখন ৪০০ বছর ধরে নেক্রর গণিকাবৃত্তি একটি ঐতিহ্য আছে। রাজধানীর লখনউ শহর থেকে আনুমানিক দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। এই গ্রামের প্রায় ৫,০০০ নারী তাঁদের উপার্জনের জন্য এই গণিকাবৃত্তি উপর মূলত নির্ভর করে। এই গ্রামের বাচ্চারা, সাধারণত তাঁদের মায়েদের সঙ্গে বসবাস করে তাঁদের পিতা কে কেউ জানে না।
(১০) সোনাগাছি, পশ্চিমবঙ্গ : এশিয়ার সবচেয়ে বড়ো গণিকালয় কলকাতার সোনাগাছি। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, এখানকার গণিকালয় নির্মাণ করেন ব্রিটিশরা, তাঁদের সেনাবাহিনীর জন্য। কারণ তাঁদের স্ত্রীরা তখন ইংল্যান্ডে থাকত। বর্তমানে প্রায় ১১ হাজারের বেশি যৌনকর্মী আছে এখানে। বলা হয় যে, ইংরেজরা জোরপূর্বক বিধবা মহিলাদের নিয়ে আসত এখানে। এখানে একাধিক ছোটো বড়ো বিল্ডিং রয়েছে যেখানে চলে এই কাজ। না, এই ঐতিহ্যবাহী সোনাগাছি নিয়ে আলোচনা এতটুকুতেই শেষ করা যায় না। আলাদা একটি অধ্যায়ে বিস্তারিত লেখার সুযোগ আছে এবং লিখব।
একটা ঘটনার উল্লেখ করে ভারতের গণিকাবৃত্তির আলোচনা শেষ করব। এমন একটা সম্প্রদায়ের মেয়েদের কথা বলব যেখানে এক সম্প্রদায়ের সদস্যরা তাদের পরিবারে জন্ম নেওয়া সবচেয়ে বড়ড়া মেয়েকে গণিকাবৃত্তির দিকে ঠেলে দেয়। যেখানে দেশের বেশিরভাগ পরিবারের বাবা-মায়েরা মেয়ে সন্তানের চাইতে ছেলে সন্তানদের বেশি পছন্দ করে। সেখানে হিনা জন্মগ্রহণ করলে তাঁর বাবা-মা রীতিমত উৎসব উদযাপন করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত এই উদযাপনের পিছনে ছিল বিচিত্র একটি উদ্দেশ্য। হিনা ভারতের পশ্চাৎপদ সম্প্রদায়ের একজন সদস্য। এই সম্প্রদায়ে শত শত বছর ধরে এখন পর্যন্ত একটি প্রথা প্রচলিত আছে। যেখানে সম্প্রদায়ের সদস্যরা তাঁদের পরিবারে জন্ম নেওয়া সবচেয়ে বড়ো মেয়েকে গণিকাবৃত্তির দিকে ঠেলে দেয়। আর এই গণিকাবৃত্তি শুরু হয় মেয়ের মাত্র ১০ থেকে ১২ বছর বয়সেই। পরিবারের পুরুষ সদস্য থেকে শুরু করে বাকি সবার জীবন ওইটুকু মেয়ের আয়ের উপরই নির্ভর করে। কোনো-কোনো ক্ষেত্রে মেয়েটির নিজের বাবা অথবা ভাই দালাল হিসাবে কাজ করে। যখন এই মেয়েটির বয়স হয়ে যায়, তখন তাঁর জায়গা দখল করে নেয় তাঁরই ছোটো বোন।
এভাবেই এই প্রথা সম্প্রদায়ের সবার গ্রহণযোগ্যতার উপর নির্ভর করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পালন হয়ে আসছে। এই সম্প্রদায়ে বিয়েটাও হয় ভিন্নভাবে। এখানে বিয়ে দেওয়ার সময় কনের পরিবার বরের পরিবারের কাছ থেকে বড়ো অংকের অর্থ দাবি করে। যেটাকে অনেকেই উল্টো যৌতুক হিসাবে আখ্যা দেন। হিনাকে জন্মের পর থেকে এই ধরনের জীবনের জন্য প্রস্তুত করা হয় এবং তারপরে খুব অল্প বয়সেই তাঁকে এই কাজে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া হয়। বিবিসি হিন্দিকে তিনি বলেন, “আমাকে যখন এই পেশায় ঠেলে দেওয়া হয়। তখন আমার বয়স মাত্র ১৫ বছর। পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে আমাকে আমার মা ও দিদিমার দেখানো পথেই। চলতে হয়েছে। ১৮ বছর বয়সে আমি প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমার সঙ্গে কত অন্যায় হয়েছে এবং ভীষণ রাগও হয়েছিল তখন। কিন্তু এ ছাড়া আমার আর কিই-বা করার ছিল? যদি আমি এভাবে উপার্জন না করতাম তাহলে আমার পরিবার কীভাবে বাঁচত?” প্রতিদিন তাঁর কাছে গ্রামীণ ধনী থেকে শুরু করে ট্রাক চালক পর্যন্ত একাধিক ক্লায়েন্ট আসত।
ভারতের বাচ্ছা সম্প্রদায়ের মানুষেরা সাধারণত ভীষণ দারিদ্রপীড়িত। পরিবারের জন্য উপার্জন এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে তাঁরা নারী সদস্যদের উপর নির্ভর করে। পেশায় আসা এক-তৃতীয়াংশের বেশি মেয়ে বয়সে অনেক ছোটো। বাচ্ছা সম্প্রদায় একসময় যাযাবর উপজাতি গোষ্ঠী ছিল। পরে তাঁরা মধ্যপ্রদেশের তিনটি জেলায় ছড়িয়ে যায়। এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা বেশিরভাগ গ্রামীণ এলাকা বা মহাসড়কের পাশে থাকে, যেখানে ট্রাক ড্রাইভাররা বিরতি নিয়ে থাকে। অল্প বয়সি মেয়েরা, যাঁরা কিনা স্থানীয়ভাবে খেলোয়াড় হিসাবে পরিচিত। তাঁরা দলবেঁধে, না-হলে একা একাই ক্লায়েন্টদের অনুরোধ করার জন্য অপেক্ষা করে। এছাড়া পথের দু-পাশে প্রায়শই ছোটো দোকানের মতো বুথ থাকে, সেখানে মেয়েটির দালাল হিসাবে তার ভাই না-হলে বাবা, ক্লায়েন্টকে আহ্বান জানায়। তাঁরা চালকদের সঙ্গে একটি চুক্তি করে, যা সাধারণত ক্লায়েন্ট প্রতি ভারতীয় মুদ্রায় ১০০ থেকে ২০০ হয়ে থাকে। স্থানীয়দের মতে, একটি কুমারী মেয়ের জন্য সর্বোচ্চ দাম পাওয়া যায়। ক্লায়েন্ট প্রতি সেটা ৫০০০ রুপি বা ৭২ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিনা বলেন, “প্রতিদিন দিনের বেলা প্রায় চার থেকে পাঁচজন পুরুষ আসে। রাতের বেলা আমরা হোটেল বা কাছাকাছি অন্য কোথাও যাই। সবসময় সংক্রমিত রোগে ভোগার ঝুঁকি ছিল।” ‘দ্য হিন্দু পত্রিকা ২০০০ সালে এই ধরনের চিকিৎসার অবহেলার বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিবেদন করে। তাঁরা জানিয়েছে যে, এই সম্প্রদায়ের ৫৫০০ সদস্যকে পাওয়া গেছে যারা এইচআইভি পজিটিভ। শতাংশের হিসাবে এই আক্রান্তের হার সম্প্রদায়ের মোট জনসংখ্যার ১৫%। এসব খেলোয়াড়দের অনেক মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এই পেশায় আসায় কয়েক বছরের মাথায় হিনা একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেয়। মা হওয়ার পরও তাঁকে আরও বেশি বেশি পরিশ্রম করার জন্য চাপ দেওয়া হত। অনেক মেয়েরা এক পর্যায়ে গর্ভবতী হয়ে পড়লেও তাঁদের এই কাজ চালিয়ে যেতে হয়। সন্তানদের যত্ন নেওয়ার জন্য আরও অর্থ উপার্জন করতে চাপ দেওয়া হয় তাঁদের। একজন যৌনকর্মী হওয়ার অর্থ হল যে, সে তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে কারোকে বিয়ে করার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। অবশেষে হিনা স্থানীয় এনজিও-র সহায়তায় এই প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন।
