(৯) যৌন পর্যটন বা সেক্স ট্যুরিজম : বিশ্বায়নের ছোঁয়া লাগার সঙ্গে সঙ্গে যৌন-বাণিজ্যের আরও নানা রূপ, নানা চরিত্রে, নানা চেহারায় প্রসার ঘটছে। তার বড়ো ক্ষেত্র হল সেক্স ট্যুরিজম। যৌন ক্রিয়াকলাপের জন্য বিশেষত গণিকাদের সঙ্গে যৌন পর্যটন হল বিভিন্ন পাবলিক প্লেস বা লোকালয়ে ভ্রমণ। হ্যাঁ, পর্যটন খাতের অভ্যন্তরে নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বাণিজ্যিক যৌন-সম্পর্ক কার্যকর করাই হল প্রাথমিক উদ্দেশ্য। যৌন পর্যটন হল বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্প। এয়ারলাইনস, ট্যাক্সি, রেস্টুরেন্ট, হোটেলে সুবিধা প্রদান করে এই যৌন পর্যটন। এই শিল্প বিদেশে অর্থনীতিকে বৃদ্ধি করে। যৌন পর্যটন শুধু সেক্সের জন্য অর্থ নয়। যৌন পর্যটনের মূল কারণ হল গণিকা খোঁজা আর গণিকার জন্য জীবিকা তৈরি করাই মূল লক্ষ্য। যৌন পর্যটন হল আইনি বহিরাগত। নেভেদা ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাস্তব সম্মত নয়। ২০০৩ সালে নিউজিল্যান্ড আইনের আওতায় গণিকাবৃত্তি যুক্ত হয়েছে। এখানে সংযুক্ত হয়েছে অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বাংলাদেশ, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, কানাডা, কলোমরিয়া, ডেনমার্ক, ইকিয়েড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া, নেদারল্যান্ডস।
প্রতিদিনই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অপরিণত ও পরিণত বয়সি নারী পাচার হয়ে আন্তর্জাতিক এইসব যৌন-বাণিজ্যের কবলে পড়ছে। পাচারকারী ও যৌন-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড়ো বড়ো মাথাওয়ালা হর্তাকর্তা শ্রেণির ব্যক্তিদের নেটওয়ার্ক এতটাই বিস্তৃত ও শক্তিশালী যে, তাঁদের শক্তিমত্তার সঙ্গে পেরে ওঠার চেষ্টা বেশিরভাগ রাষ্ট্রগুলি করে না। না-করার বড় কারণ হল রাজস্ব। অনেক রাষ্ট্রের মোটা অঙ্কের আয়ই নির্ভর করে এই ধরনের পেশার উপর। বিশেষ করে, সেক্স ট্যুরিজম বা যৌন পর্যটন যেসব রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস, সেসব রাষ্ট্র যৌন পর্যটন ব্যাপারটা প্রশ্রয়ই দেয়।
জাতি সঙ্ঘের বিশেষ এজেন্সি বিশ্ব পর্যটন সংস্থা’-র মতে, পর্যটন ট্রিপ কর্তৃক আয়োজিত অথবা ট্রিপের বাইরের কারও আয়োজনে পর্যটন ট্রিপের কাঠামো ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গন্তব্যস্থানের বসবাস স্থলে পর্যটক কর্তৃক বাণিজ্যিকভাবে যৌন-সম্পর্ক স্থাপনকেই যৌন পর্যটন বলে। জাতি সঙ্ঘ যৌন পর্যটন সমর্থন করে না এই কারণে যে, এর মাধ্যমে পর্যটকের নিজের দেশ ও গন্তব্য দেশ উভয়েই স্বাস্থ্যগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে পর্যটকের নিজের দেশের চেয়ে গন্তব্যদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা এবং পর্যটকের নিজের সঙ্গে ওখানকার মানুষের লৈঙ্গিক-বায়সিক অবস্থায় বৈচিত্র্যই এর জন্য দায়ী। যৌন পর্যটকদের জন্য কখনো-কখনো গন্তব্যদেশে স্বল্পমূল্যে যৌন-পরিসেবা পাওয়ার আকর্ষণ থাকে। এমনকি সেসব দেশের থাকে যৌন-সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে আইনগত শৈথিল্য এবং শিশু যৌনকর্মী পাওয়ার আকর্ষণও।
যৌন পর্যটনের জন্য পর্যটকদের প্রথম পছন্দের দেশগুলি হল থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, ডমিনিকান রিপাবলিক, কোস্টারিকা, কিউবা, জার্মানি, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, নেদারল্যান্ডস এবং কম্বোডিয়া। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর রাশিয়া, হাঙ্গেরি, ইউক্রেন, পোল্যান্ড এবং চেক রিপাবলিকের নামও ওই তালিকায় সংযুক্ত এবং যৌন-পরিসেবা দিয়ে থাকে। ওসব দেশের মোট যৌনকর্মীর সিংহভাগই স্থানীয় পুরুষকুলের চাহিদা মেটায়। নির্দিষ্ট কোনো দেশের কেবল এক বা একাধিক নির্দিষ্ট স্থানই কেবল যৌন পর্যটকদের গন্তব্য হয়। যেমন নেদারল্যান্ডের আমস্টারডাম; থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, পাট্টায়া ও পুকেট; আমেরিকায় নেভাদা ইত্যাদি। ভারতেও বিদেশি পর্যটকরা যৌন পর্যটন উপভোগ করেন। নির্দিষ্ট সাইটে কল করলেই যৌনকর্মী চলে আসবে সংশ্লিষ্ট হোটেলে। এইসব যৌনকর্মীরা হোটেলে বসবাসকারী পর্যটক ছাড়া শরীরসঙ্গ দেন না। যদিও এটা আইনসম্মত নয়।
এছাড়াও অন্যান্য কিছু শহরে স্থানীয় পর্যটকরা বিশেষ আইনগত অনুমোদন নিয়ে যৌন পর্যটনে বেরয়। এসব পর্যটকদের অধিকাংশেরই তীব্র ঝোঁক থাকে শিশু যৌনকর্মীর প্রতি, যদিও অধিকাংশ দেশেই শিশুদের যৌনকর্মে ব্যবহার আইনসম্মত নয়, দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা যৌন পর্যটন ও শিশু যৌন পর্যটনকে আলাদা করে দেখে। সংস্থার মতে, যেসব পর্যটক শিশুদেরকে যৌনকাজে ব্যবহার করে তাঁরা ‘কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব দ্য চাইল্ড’ এবং ‘অপশনাল প্রটোকল অন দ্য সেল দ্য চিলড্রেন’, এবং চাইল্ড প্রস্টটিউশন অ্যান্ড চাইল্ড পর্নোগ্রাফি আইন লঙ্ঘন করে। অনেক দেশই ‘ওরস্ট ফর্ম অব চাইল্ড লেবর কনভেনশন, ১৯৯৯’-এ স্বাক্ষর করেছে এবং নিজেদের দেশে সেটা বাস্তবায়ন করেছে। সিঙ্গাপুরের এরকম কোনো আইন নেই বলে তাঁরা ইতোমধ্যে অনেক নিন্দা করেছে। ইন্দোনেশিয়ার বাটামও এইরকম একটি গন্তব্য (Destination), যেখানে প্রচুর কমবয়সি শিশুকে যৌনকাজে ব্যবহারের জন্য পাওয়া যায়।
‘ওয়ার্ল্ড অব ওয়ার্ক’-এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, ১৯৯৮ ইস্যুতে মুদ্রিত একটি প্রবন্ধে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন এবং থাইল্যান্ডের যৌন-বাণিজ্যে কী পরিমাণে অর্থাগম ঘটে তার কিছু পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। ওই প্রবন্ধে স্বীকার করা হয় যে, সেক্স ট্রিপ বা যৌনখাতকে একটি অর্থনৈতিক খাত হিসাবে অফিসিয়াল পরিসংখ্যান উন্নয়ন পরিকল্পনা বা সরকারের বাজেটে এখনও স্বীকৃত নয়। কিন্তু এ খাতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন ঘটে। বলা হয়, যৌনখাতে এই চারটি দেশে প্রকৃতপক্ষে কী পরিমাণ নারী যুক্ত আছেন, তা পেশাটি অনৈতিক ও গোপন হওয়ার কারণে বলা একেবারেই মুশকিল। তবে ধরে নেওয়া যায় দেশগুলির মোট নারী জনগোষ্ঠীর ০.২৫ থেকে ১.৫ শতাংশ এ পেশায় যুক্ত। ১৯৯৩-১৯৯৪ সালে তৈরি একটি হিসাব অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়ায় যৌনকর্মীর সংখ্যা দেখানো হয় ১,৪০,০০০ থেকে ২,৩০,০০০ জন। মালয়েশিয়ায় এই সংখ্যা ৪৩,০০০ থেকে ১,৪২,০০০ জন। তবে আইএলও-র মতে সংখ্যাটা আরও কয়েক গুণ বেশি। ফিলিপাইনে যৌনকর্মীর সংখ্যা জানানো হয় ১,০০,০০০ থেকে ৬,০০,০০০ জন। তবে ৫,০০,০০০ হওয়ার ব্যাপারে অনেকেই একমত বলে জানানো হয়েছে। থাইল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৯৯৭ সালে হিসাব করা জরিপ অনুযায়ী যৌনকর্মীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৬৫,০০০ জন। কিন্তু আন-অফিসিয়াল সূত্র দাবি করে এই সংখ্যা হবে ২,০০,০০০ থেকে ৩,০০,০০০ জন। এর বাইরে থাই এবং ফিলিপিনো আরও ১০,০০০ নারী, শিশু এবং হিজড়া যৌনকর্মী বিদেশে কর্মরত আছে।
