কারা চালায় মধুচক্রের আসর? বরং প্রশ্ন করুন কারা থাকেন না? সমাজের উঁচুতলার মহিলা ও পুরুষরা এই আসর চালায়। কে নেই? রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী থেকে শিক্ষকের স্ত্রী, আইনজীবীর স্ত্রী কর্পোরেট কর্মীর স্ত্রী, ডাকসাইটের অভিনেত্রী থেকে বড়ো ব্যবসায়ী—সবাই। খুব গোপনে কাজ সম্পন্ন হলেও মাঝেমধ্যেই পুলিশের জালে ফেঁসে যায় এঁরা। ফেঁসে গেলেও লেনদেনের মাধ্যমে দু-দিন পর আবার রমরম করে কাজ শুরু হয়ে যায়। কয়েকটা ঘটনার উল্লেখ করি।
ঘটনা–১
তারিখ : ১৫ আগস্ট, ২০১৫
রোজগার বাড়াতে বাড়ি ভাড়া নিয়ে মধুচক্র চালাচ্ছিলেন এক তৃণমূল নেত্রী। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে গ্রেফতার করে ওই নেত্রীকে। গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁর সঙ্গী এক যুবককেও। মালদহের ইংরেজবাজারের সিঙ্গাতলা এলাকায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে ললিতা মণ্ডল নামে এক মহিলা মধুচক্রটি চালাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ। গাজোলের ললিতা ওই ব্লকেরই তৃণমূল নেত্রী। ইংরেজবাজার থানার অদূরেই সিঙ্গাতলা। সেখানেই একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে তিনি দিব্যি ব্যাবসা ফেঁদেছিলেন বলে অভিযোগ। সিঙ্গাতলার ওই বাড়িতে মালিক থাকতেন না। তিনি থাকতেন অন্যত্র। অভিযোগ, সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগাচ্ছিলেন ললিতা। মোটা মাইনের লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসা হত মহিলাদের। পরে নামানো হত দেহব্যাবসায়। বেশ কিছু দিন ধরে বাড়িটিতে অচেনা যুবক-যুবতীদের আনাগোনা দেখে সন্দেহ হয় স্থানীয়দের। খবর দেওয়া হয় পুলিশে। পুলিশ গিয়ে দুই তরুণী ও এক যুবককে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পায়। ললিতা নিজেও সেই সময় বাড়িতে ছিলেন। সবাইকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে গ্রেফতার করা হয় ললিতা ও এক যুবককে। ঘটনায় বেজায় অস্বস্তিতে পড়েছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তাঁরা। তৃণমূল নেতা সুশীল রায় বলেন, ললিতাকে মহিলা সংগঠনের নেত্রী বলেই জানি। এর বেশি কিছু বলতে পারব না।
স্থানীয় সূত্রের খবর, প্রথমে ললিতা গাজোলে একটি পার্লার চালাতেন। পরে মোটা টাকা রোজগারের লোভে মধুচক্রের ব্যাবসা ফাঁদেন। ইংরেজবাজারের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে পার্লার। এগুলির সিংহভাগেই অনৈতিক কাজ হয় বলে অভিযোগ। বেকার যুবক-যুবতীদের মোটা মাইনের চাকরির টোপ দিয়ে নিয়ে আসা হয় পার্লারে। পরে মগজ ধোলাই করে নামিয়ে দেওয়া হয় দেহব্যাবসায়। আর একবার ব্যাবসায় নেমে যাওয়ার পর আর ফিরতে পারেন না অধিকাংশ তরুণ-তরুণী। কারণ কম খাটুনিতে প্রচুর পয়সা রোজগার করা যায় এই পেশায়। তাতে বজায় থাকে ঠাঁট-বাট। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ সক্রিয় না হওয়াতেই এসব ‘অনৈতিক কারবার চলছে রমরমিয়ে। জেলার প্রায় সর্বত্রই পার্লারের আড়ালে মধুচক্রের ব্যাবসা চলছে রমরমিয়ে। পুলিশ মাঝেমধ্যে হানাও দেয়। ধরাও পরে। তারপরেও দিব্যি চলতে থাকে মধুচক্র। মোটা টাকার বিনিময়ে বিকিয়ে যায় নারী শরীর। বিকায় পুলিশ-প্রশাসনও।
ঘটনা–২
তারিখ : ২১ ডিসেম্বর, ২০১৯
নৈহাটিতে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ের ধারের একটি হোটেলে মধুচক্রের আসরে হানা দিয়ে সাত যুবককে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে নৈহাটি থানার পুলিশ রাজেন্দ্রপুরের কাছে ওই হোটেলে হানা দেয়। হাতেনাতে ধরা হয় সাত জনকে। জনা কুড়ি যুবতীকেও ওই হোটেল থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে। নৈহাটি থানার পুলিশের কাছে গত কয়েকদিন ধরে খবর আসছিল কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ের ধারে থাকা ওই হোটেলে অবাধে চলছে মধুচক্র।
ঘটনা–৩
তারিখ : ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯
স্পা ও কলসেন্টারের আড়ালে মধুচক্র। চার জায়গায় যৌথ অভিযান চালায় কলকাতা পুলিশের এসটিএফ, গোয়েন্দা বিভাগ ও গুদমন শাখা। শহরের ৪ জায়গা থেকে ধৃত ৬৫। শহরে মধুচক্রের হদিশ। কোথাও স্পায়ের আড়ালে কোথাও বা কলসেন্টারের আড়ালে চলছিল মধুচক্র। কলকাতা পুলিশের এসটিএফ, গোয়েন্দা বিভাগ ও গুন্ডাদমন শাখা অভিযান চালায় গড়িয়াহাটের রাসবিহারী অ্যাভিনিউ, ভবানীপুর, নিউ মার্কেট ও প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডে। গড়িয়াহাটের রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের এই বাড়ির তিনতলায় আগেও মধুচক্রের হদিশ মিলেছিল। এই বাড়িরই একতলায় ঘর ভাড়া নিয়ে স্পায়ের আড়লে মধুচক্র চালাত দেবব্রত বৈদ্য। ভবানীপুরের শ্রীপল্লি এলাকায় সুন্দর সাজানো গোছানো একটি স্পা সেন্টার। সাইনবোর্ডে ‘ফ্যামিলি স্যালোঁ’ লেখা থাকলেও আদপে এখানে মধুচক্রের আসর বসত। পুলিশি অভিযানে স্পায়ের দুই কর্মীসহ ৯ যুবককে গ্রেফতার করা হয়। যাদের মধ্যে দুজন ভিনরাজ্যের যুবকও ছিল। আটক করা হয় ৯ মহিলাকে। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বেশ কয়েকটি মোবাইল ও ৩টি বাইক। নিউমার্কেট ও প্রিন্স আনোয়ার শা রোডেও অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা। হয় ৪৪ জনকে।
ঘটনা–৪
তারিখ : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
বেসরকারি একটি লজে মধুচক্রের আসরে হানা দিয়ে ৭ মহিলা ও ১৩ পুরুষকে আটক করেছে পুলিশ। ভারতের ছত্তিশগড়ের মহাসমুন্ডের তোগভে এ ঘটনা ঘটেছে। ওই বেসরকারি লজে দীর্ঘদিন ধরে এই মধুচক্র নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করার পর পুলিশ অভিযান চালায়। পুলিশ জানান, ওই বেসরকারি লজ থেকে পুরুষ ও মহিলাসহ মোট ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। এর আগেও মধুচক্র নিয়ে একাধিকবার আলোচনায় আসে ছত্তিশগড়ের নাম। অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া ছত্তিশগড়ের নগরজীবনে লাগাতার চলছে লড়াই। কখন শরীর বিক্রি করে, অথবা কখনও নাবালিকাকে হোটেলে পাঠিয়ে অর্থ উপার্জনের কাজ চলছে। জোর করে নাবালিকাদের আটকে রেখে প্রতি রাতে হোটেলে মধুচক্রের আসর বসানোর অভিযোগও আছে।
