সেই সময়কার বিমলা নামের গণিকার কথা জানা যায়, যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ব্রিটিশদের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। চিৎপুরের গণিকা ছিলেন বিমলা। সেই পেশা ত্যাগ করে দেশের কাজে পাকাপাকিভাবে ব্রতী হন। তিনি যেমন শিক্ষিতা ছিলেন, তেমনি ছিলেন রূপবতী। বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষাতে কথা বলাতে যথেষ্ট সাবলীল ছিলেন। যে-কোনো ভাষাতেই অসাধারণ বক্তৃতা দিতে পারতেন।
মহিলাদের এক ব্রিটিশ বিরোধী জনসভা হচ্ছিল। সেই জনসভায় বিশাল পুলিশবাহিনী উপস্থিত জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘোড়া-পুলিশের দল জমায়েতের ভিতর ঘোড়া ছুটিয়ে তাণ্ডব শুরু করে দিল। সেসময় মঞ্চে ঝাঁঝালো বক্তৃতা দিচ্ছিলেন চিৎপুরের গণিকা বিমলা দেবী। বিমলা দেবী ছুটে গিয়ে এক পুলিশ সার্জেন্টের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরেন এবং বলেন–“Are you not born of a woman? How do you beat your mothers and sisters?” সেদিন রণচণ্ডী বিমলার তেজ ও সাহসিকতার সামনে পুলিশ হঠে যেতে বাধ্য হয়। এ ঘটনার সংবাদ পৌঁছে গিয়েছিল কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও। তিনি বিমলা দেবীর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন–“সাবাস। কে বলে তুই অবজ্ঞার পাত্রী! তোর মধ্যে আজ আদ্যাশক্তি মহিষাসুরমর্দিনীর বিভূতি দেখলুম।”
আন্দোলনের একটা সময়ে এসে বিপ্লবীরা নরমপন্থী ও চরমপন্থী হিসাবে দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলে। আন্দোলনে অভিমুখ ক্রমশ বদলাতে থাকল। ভদ্রসমাজ গণিকা দেশপ্রেমীদের উপেক্ষা করতে থাকল। দেশের কাজ করতে গিয়ে বারবার বাধা পেতে থাকেন। অবশেষে বিমলাকে পুনরায় গণিকাজীবনে ফিরে আসতে হয়। ফিরে আসতে বাধ্য হয়। গণিকাজীবন শুরু করলেও দেশের কাজ থেকে তিনি কোনোদিন বিরত থাকতে পারেননি। শচীনন্দন চট্টোপাধ্যায় লিখছেন, বিমলা কীভাবে এক বেকার কংগ্রেসকর্মীকে স্নেহ দিয়ে অর্থের জোগান দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। এক বিপ্লবীর আত্মগোপন করে থাকার সময়ে সমস্ত খরচ জুগিয়েছিলেন বিমলা। শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসে সুমিত্রা চরিত্রটি কী বিমলারই প্রতিচ্ছবি? অনেকে তেমনটাই মনে করেন।
১৯৩০ সালে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর জালালাবাদের যুদ্ধ সংঘটিত হয় ব্রিটিশদের মধ্যে। এই যুদ্ধে শহিদ হন ৯ জন বাঙালি বিপ্লবী। এর মধ্যে একজন ছিলেন বিপ্লবী অর্ধেন্দু দস্তিদার। অর্ধেন্দু দস্তিদার ঘটনাস্থলে ভয়ানকভাবে জখম হন। সেই অবস্থায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। কোনোরূপ চিকিৎসা না করে তাঁকে জেরায় জেরায় জেরবার করে তোলা হয়। অবশেষ বিপ্লবী অর্ধেন্দু মারা যান। বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মুক্তিসংগ্রামে অন্তঃপুরবাসিনী ও বারাঙ্গনাগণ’ নিবন্ধে পূর্ণেন্দু দস্তিদারের বয়ানে লিখলেন–“মৃতদেহ শ্মশানে রেখে তখন অর্ধেন্দুর ডাক্তারকাকা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করছেন। তখন তিনি দেখলেন শ্মশানের গেটে একটি ঘোড়ার গাড়ি থামল এবং তা থেকে নামল চারজন নারী। কাছে এগিয়ে এলে দেখা গেল তাঁরা শহরের বারাঙ্গনা। তিনি তাঁদের ওখানে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বলল তাঁরা দেবতা দেখতে এসেছেন। তাঁদের শাড়ির মধ্যে লুকানো দুধের বোতলগুলি আর ফুলের তোড়া বের করে তাঁরা বলে–‘এই দুধ দিয়ে ওই দেবতার মৃতদেহ আমরা স্নান করাতে চাই। তারপর ফুলগুলি দিয়ে ফিরে যাব। শহিদ অর্ধেন্দু দস্তিদারের পিতৃব্য পূর্ণেন্দু দস্তিদার তাঁদের অনুমতি দিয়েছিলেন।
১৫. গণিকাবৃত্তি নানা রূপে
প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ এবং ব্রিটিশ-ভারতে গণিকাবৃত্তির ধরনধারণ তো আমরা কিছুটা ধারণা নিতে পারলাম। কিন্তু বর্তমান তথা আধুনিক যুগে গণিকাবৃত্তির ধরনধারণ কোন্ পথে, আমরা এবার সেটা জানার চেষ্টা করব। বর্তমান সময়ে গণিকাবৃত্তির ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। যৌনব্যাবসা এখন শুধু স্থানীয় নয়, আন্তর্জাতিক। প্রযুক্তিকে যথাযথ ব্যবহারে যৌনপেশা তরতর করে এগিয়ে চলেছে। কমেছে শরীর নিয়ে ছুঁৎমার্গ। সর্বস্তরের ক্লায়েন্টদের টানত যৌনপেশা ক্রমশ উন্নত থেকে উন্নত হচ্ছে। সেইসঙ্গে আসছে নতুন নতুন বিভাজন। আসুন, এবার বিভাজনগুলি দেখে নেওয়া যাক।
(১) stree Protitute : শব্দটার বাংলা পাইনি। তাই ইংরেজিতেই লিখলাম। এইভাবেই শব্দটি সবাই জানে। যাই হোক, এই গণিকারা ক্লায়েট (গণিকাজগতে এখন আর বাবু, খরিদ্দার বলে না। সবাই ক্লায়েট।) ধরার জন্য বিভিন্ন রাস্তার পাশে, রাজপথে, পার্ক বা অন্যান্য পাবলিক প্লেস, যানবাহনে বা সংকীর্ণ কোনো ঘুপচিতে কম পয়সার বিনিময়ে এঁরা যৌনক্রিয়া সম্পন্ন করে। এঁরা স্বাধীন গণিকা। রোজগারের জন্য এই পেশা নেয় তাঁরাই, যাঁদের অন্য কোনো কাজ করার স্কিলড নেই। শুধু পুলিশকে প্রাপ্য মিটিয়ে দিলেই হল। না মেটালে সারাদিন পুলিশের তাড়া খেয়ে বেড়াতে হবে।
(২) গণিকালয় : গণিকালয়, পতিতালয়, বেশ্যালয়, নিষিদ্ধপল্লি, ব্রোথেল (Brothel), Red light area বা কোঠি–এগুলি সমার্থক শব্দ। এখানে ঘর ভাড়া দিয়ে বা ঘর ভাড়া নিয়ে ঘোষিতভাবে যৌনকর্ম চালানো হয়। তবে খোলা রাস্তার থেকে অনেক বেশি নিরাপদ। রোজগার নিশ্চয়তা কিছুটা বেশি। এখানে ক্লায়েট খুঁজে বেড়াতে হয় না, ক্লায়েন্টই খুঁজে নেয় যৌনকর্মী নিজের পছন্দমতো।
