একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক যাঁরা বাইরের পুরুষ অঙ্গ, হৃদয়টি নারীময় তাঁদের নিয়ে। এই নারী চেতনার পুরুষরা মেয়েলি’ ভাবের পুরুষ। এঁরা সাধারণত মেয়েদের সঙ্গে তৃপ্ত হতে পারে না, তাই পুরুষরাই এঁদের যৌনসঙ্গী। পরিবারের চাপে পড়ে কেউ কেউ মেয়েদের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করলেও সংসার সুখের হয় না। দু-চারদিন যেতে না-যেতেই মনের মতো পুরুষসঙ্গী পেরে গেলে তার সঙ্গেই মিলিত হয়। এঁরা অনেকেই যৌনপেশার সঙ্গে যুক্ত। এঁরা পুরুষ-শরীরে নারীর প্রসাধন-পরিধানে সজ্জিত হয়ে পুরুষ শিকার করে। এঁরা পুরুষ ক্লায়েন্টদের সঙ্গে যৌনমিলনের জন্য নারীর যৌনাঙ্গের বিকল্প হিসাবে পায়ুপথ ব্যবহার করে। পায়ুকামীদের কাছে এঁদের খুব চাহিদা।
প্রসঙ্গত জানাই, গ্রিক পুরাণে জিউস ও গানাইমেডির বৃত্তান্ত সমলিঙ্গের প্রেম-ভালোবাসার কথা জানা যায়। রোম সম্রাট নিরো ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং খামখেয়ালি। তিনি একবার এক তরুণকে বিয়ে করার কথা ভাবেন এবং বিয়েও করে ফেলেন। অবশ্য বিয়ের পরে সেই তরুণ সম্রাটের নির্দেশে স্ত্রীবেশ ধারণ করেছিল। জুলিয়াস সিজারেরও সমলিঙ্গের প্রতি ঝোঁক ছিল। হায়দরাবাদের নবাব টিপু সুলতানও পুরুষদের সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হতেন। পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহ মাঝেমধ্যেই বালকদের সঙ্গে যৌনক্রীড়া করতেন। শরিয়তি নির্দেশকে উপেক্ষা করেই মুসলিম শাসনাধীন রাষ্ট্রে শেখরা অন্য পুরুষদের সঙ্গে যৌন-সম্পর্ক বজায় রাখতেন। খ্রিস্ট্রীয় নবম শতাব্দীতে ইরানীয় এক প্রশাসকের মুখ্য সহকারী ছিলেন মুতাজিলি ইসলাম সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি। তিনি আমজনতার কাছে ঘোষণা রাখেন–মুতাজিলি হল শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং পুরুষ সম্ভোগই যৌন-আনন্দের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
অবশেষে নিত্যনৈমিত্তিক বহুগামী যৌন-অভ্যাসের মধ্যেই একসময় অর্থের অনুপ্রবেশ ঘটে। অর্থের বিনিময়ে যৌন-আনন্দ পেতে কেউই পিছ-পা হন না। পুরুষ-যৌনতাকে নিয়ে শুরু হয় ব্যাবসা। এই ব্যাবসার একটি বিশেষ রূপ হল সমকামী যৌন-ব্যাবসা। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রাচীন গ্রিসেই খুব বিক্ষিপ্তভাবে পুরুষ যৌনকর্মীদের ব্যাবসা শুরু হয়। এ বিষয়ে পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
যদিও এ পথ মসৃণ নয়, দোষী হিসাবে পুরুষ যৌনকর্মীদের উপর কঠিন শাস্তি নেমে আসে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশে পুরুষ যৌনকর্মীদের উপর রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। শুরু হয় গ্রেফতার। পুরুষ যৌনকর্মীদের এই সময় অত্যন্ত ভয়াবহ অবস্থা হয়। পুরুষ যৌনকর্মীদের ফাঁসিও দেওয়া হয়েছে।
১৮. গণিকাবৃত্তির বিশ্ব-অর্থনীতি
গণিকাবৃত্তির বাজারে নারী নিজেকে পণ্য করে ফেলেছে সজ্ঞানে-অজ্ঞানে। মূল কারণ রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভ আর যৌনলালসায়। তাই যৌনবাজার রমরমা। চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জোগানের কোনো ঘাটতি নেই। স্কুল-কলেজের ছাত্রী, গৃহবধূ, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত–সব শ্রেণি থেকে এখন নতুন পেশায় মেতেছে। শরীরটাকে উত্তরণের সিঁড়ি বানিয়ে নারী ক্রমশ আধুনিকতার দিকে এগিয়ে চলেছে, ফল্গু নদীর মতো অন্তঃসলিলা হয়ে।
সরাসরি দেহব্যাবসার মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আর্থিক লেনদেন হয়। Havocscope সূত্রে জানা যায়, সারা বিশ্বে শুধু শরীর বিক্রিতেই রেভিনিউ আদায় হয় ১৮৬ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাব শুধুমাত্র নথিভুক্ত যৌনপেশায় যুক্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ, সারা বিশ্বের ১৩,২৬৫,৯০০ জন দেহব্যবসায়ীদের হিসাবে। নথিভুক্ত যৌনজীবীদের হিসাব আরও কয়েকশো গুণ। বিশ্বের অনেক দেশে যাঁদের প্রধান আয় আসে যৌন পর্যটন থেকে। সেসব দেশে এখনও সরকারি তত্ত্বাবধানেই দেহব্যাবসা পরিচালিত হয়। এমনকি বাংলাদেশও এখন এ প্রথা অনুমোদন করেছে। গণিকাবৃত্তিতে আগ্রহী যে-কোনো ১৮ বছর বয়সোত্তীর্ণ নারীকে দেহ-ব্যাবসা চালানোর জন্য লাইসেন্স দিয়ে, সারা দেশে ১৪ টি গণিকালয় পরিচালনা করে এবং সেখান থেকে রেভিনিউ গ্রহণ করে।
পৃথিবীতে পতিতাবৃত্তি কিন্তু কোনো বিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ যখনই অস্থির ও বিপজ্জনক কোনো কিছুর সঙ্গে মোকাবিলা করার প্রয়োজন পড়েছে, তখনই কাজে লাগানো হয়েছে। আবার তাকে নানা কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কখনও আইন, কখনও পরিণতি প্রতিবন্ধকতা দেখিয়ে রোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। উত্তর আয়ারল্যান্ডে যৌনপেশাকে তাই আইনি আওতায় নেওয়া কথা বলা হয়েছে। আবার মার্কিনিরা এই বিষয়ে বেশ সাবলীল। কারণ এখানে যৌনপেশা আইনগতভাবে সিদ্ধ, এখানে আয়ারল্যান্ডের মতো অনুরোধ করাটা বরং আইন সিদ্ধ নয়। বিবিসি রিপোর্ট অনুসারে সুইডেনের স্টকহোমে গণিকাবৃত্তি এলাকার নারীদের সংখ্যা ৭০০ থেকে ৮০০। পরে আইনি আওতাভুক্ত হওয়ায় উৎসাহী পরিসংখ্যান কমিয়ে দেওয়া হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই যৌনতাকে সংহতির জন্য কাজেও লাগানো হয়। এই সংহতি, শারীরিক ও মানসিক ঘনিষ্ঠতা ভাগ করে নেওয়ার জন্য একজন যৌনসঙ্গী হিসাবে রোগীদেরকে যৌন সমস্যার সমাধান করতে সহায়তা করে। সেই থেরাপিতে যৌন সংসর্গ নাও থাকতে পারে। তবে ঘন ঘন কাউন্সেলিং, মনোবিজ্ঞান ও থেরাপির সাহায্যে যৌনতার ফিল্ডগুলো কাজ করে। এখানে বেশির ভাগই ‘surrogate’ মহিলা এবং অধিকাংশ ক্লায়েন্ট পুরুষ হয়, যদিও ব্যতিক্রম আছে। তবে এই ‘surrogates’ লড়াইয়ে শীর্ষস্থানে যৌনকর্মীরা আছেন।
