বাদ নেই ভারতের পাশের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশও। পশ্চিমা বিশ্বসহ পৃথিবীর অনেক দেশে এ ধরনের বাণিজ্য চালু থাকলেও বাংলাদেশে কিছুদিন আগেও অনলাইনে এ ব্যাবসার কথা শোনা যায়নি। অনলাইনে এসব গ্রুপে নারী ও পুরুষ যৌনকর্মী সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক এই গ্রুপগুলো বাড়িতে বা ফ্ল্যাটে যৌনকর্মী সরবরাহ করার কথা বলছে। এমনকি শতভাগ সততা ও গোপনীয়তার সঙ্গে কাজ করার নিশ্চয়তাও দেওয়া হচ্ছে।
গ্লোবালটিভি অনলাইনের অনুসন্ধানে এ ধরনের প্রায় অর্ধশত পেজের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি হল ‘বিডি কল গার্ল লিমিটেড’। ফেসবুক পেজে প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া বিজ্ঞাপনে প্রকারভেদে যৌনকর্মের মূল্য তালিকাও দেওয়া আছে। তালিকা অনুযায়ী রিয়েল সেক্স ২০০০, ফুল নাইট ৫০০০, ভিডিও সেক্স ১৫০০, ফোন সেক্স ৩০০ এবং চ্যাট (মেসেজ) সেক্স ২০০ টাকা। তবে মোবাইল নম্বর ছাড়া ওয়েব সাইটে সুনির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। এর ফলে এই পেজ ও ওয়েবসাইটটি কে বা কারা পরিচালনা করছে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা যায় না। তবে পরিচয় গোপন করে ওয়েবসাইটে দেওয়া একটি মোবাইল নম্বরে ফোন করলে তামান্না নামে এক তরুণী কলটি রিসিভ করেন। নিজস্ব স্থান না-থাকার অজুহাত দেখিয়ে সেবা নিতে তাঁদের নির্ধারিত কোনো জায়গা দিতে পারবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তামান্না জানায়, আমরা সাপ্লাই দেই, ঘর ভাড়া দেই না। কীভাবে সাপ্লাই পাওয়া যাবে এমন প্রশ্নের জবাবে ওই তরুণী জানায়, ‘আগে পেজ মেম্বার হতে বিকাশের মাধ্যমে ২০০০ টাকা পাঠাতে হবে। আরও দুয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করতেই অপর প্রান্ত থেকে ফোনের লাইন কেটে দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইনে বিভিন্ন সাইট ঘেঁটে এ ধরনের যে গ্রুপগুলো পাওয়া গেছে তার মধ্যে ‘বিডি কল গার্ল লিমিটেড’ ছাড়াও ‘বিডি কলগার্ল সার্ভিস’, ‘সেক্স পার্টি’, ‘অ্যাটেনশন প্লিজ’, ‘কর্ল গার্লস ঢাকা, ‘ঢাকা ফ্রেন্ডশিপ ক্লাব’, ‘কল বয় ঢাকা’, ‘ঢাকা গার্লস সেকিং বয়েজ ফর ফ্রেন্ডশিপ’, ‘কল বয় বাংলাদেশ’, ‘প্লে বয় সার্ভিস ইন বাংলাদেশ ছাড়াও অন্তত ১৫টি এসকর্ট (Escort) এজেন্সির সন্ধান পাওয়া গেছে। যৌন-চাহিদা মেটানোর জন্য এসকর্ট এজেন্সির নামে যে গ্রুপগুলো অনলাইনে সক্রিয় আছে তার মধ্যে এসকর্ট সার্ভিস’, ‘এসকর্ট ঢাকা’, ‘এসকর্ট মোহাম্মদপুর’, ‘এসকর্ট ধানমন্ডি’, ‘বিডি এসকর্ট সার্ভিস’, ‘ঢাকা কল বয় এজেন্সি’, ‘মেইল গুলশান’, ‘বালক গুলশান লিমিটেড। সাইটগুলো ঘেঁটে দেখা গেছে এসকর্ট গ্রুপের প্রতিটি পোস্টে অশ্লীল ভঙ্গির ছবিসহ কিছু মেয়ে কিম্বা ছেলের নাম ও বর্ণনা দেওয়া আছে। ঢাকা ছাড়াও দেশের কোথায় কোথায় সার্ভিসের জন্য যেতে পারবে এবং সেজন্য ঘণ্টা কিংবা দিনপ্রতি ডলার ও টাকার হিসেবে দেওয়া আছে। শুধুমাত্র মহিলা যৌনকর্মী পাওয়া যাবে যেসব এসকর্ট এজেন্সি থেকে—‘ডিয়ার লেডিস’, ‘আর ইউ লোনলি’ ‘হাউজ ওয়াইফ’, ‘ডিভোর্সেড লেডি’, ‘সিঙ্গেল গার্ল’, ‘ফরেনার লেডি’ ‘লুকিং ফর ফুল বডি ম্যাসেজ’, ‘ট্রাভেল’, ‘ফান সার্ভিস’ ইত্যাদি।
সবশেষে প্রতিটি পোস্টে দেওয়া রয়েছে, ওই এসকর্টের নিজস্ব কিছু শর্ত। এই শর্তের অন্যতম হল, যে নারী খদ্দের এসকর্ট সার্ভিস নিতে ইচ্ছুক, তাঁর নিজের উদ্যোগেই বাড়ি বা ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে এসব বিজ্ঞাপনে তাঁদের কোনো যোগাযোগের নম্বর বা ঠিকানা দেওয়া থাকে না। সাইটগুলোতে শুধু ইনবক্সে যোগাযোগ করতে বলা হয়। ইনবক্সে ‘হাই বা হ্যালো’ বললে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ফিরতি বার্তা আসে। আর উত্তর দিলেই শুরু হয় দরদাম। আর সব কিছুই চলে মেসেজ (ইনবক্স বার্তা)-এর মাধ্যমে।
ঢাকার বাসিন্দা আবদুল হাকিম এসকর্ট ব্যাবসার জন্য ছদ্মনামে ফেসবুকে এডমিন হিসেবে পাঁচটি পেইজ পরিচালনা করত। নারী ক্লায়েন্টদের আকৃষ্ট করতে এ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন প্রমোট করত। এমনকি নারীদের ফেসবুকের ইনবক্সেও পাঠানো হত এ সংক্রান্ত ক্ষুদে বার্তা। ক্ষুদে বার্তা বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরেই হাকিমের ডাক পড়ত অভিজাত এলাকার নারীদের বাড়িতে বা ফ্লাটে। পরবর্তী যোগাযোগ হত হোয়াটসঅ্যাপে। নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানে সুন্দর পোশাকে সেজেগুজে অপেক্ষা করত হাকিম। অতঃপর দেখা হয় নির্দিষ্ট নারীর সঙ্গে। তাঁদের সঙ্গে রাতযাপন করে ফিরতেন ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে। এসব নারীরা মূলত উচ্চবিত্তশালী। কেউ কেউ ভিনদেশি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এডমিন হিসাবে অন্তত পাঁচটি অ্যাডাল্ট পেইজ পরিচালনা করত আবদুল হাকিম। এসব পেইজে জাহিদ হাসান, সায়মা হক ও তানভির আহমেদ নামেও এডমিন আছে। অনৈতিক এই পেশায় জড়ানো প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদে হাকিম জানিয়েছে, অর্থের নেশাই তাঁকে এপথে এনেছে। এইচএসসি পাস যুবক আবদুল হাকিম অল্পতেই বিপুল অর্থের মালিক হতে হাঁটতে থাকে ভিন্নপথে। ইংরেজি লেখায়-বলায় ও কম্পিউটারে পারদর্শী হাকিম কয়েক বছর আগে কাজ নেয় রাজধানীর পল্টনের একটি দোকানে। কম্পিউটারের ওই দোকানে মূলত অনুবাদের কাজ করত হাকিম। বেশিরভাগ সময় কাটাত কম্পিউটারে ইন্টারনেটে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয় হয় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সদস্য মাহতাব রফিকের সঙ্গে। ব্যবসায়ী রফিকের কাছে কাজ খুঁজছিল হাকিম। মাহতাব রফিক তাকে ফিমেইল এসকর্ট প্রোভাইডার হিসাবে কাজ করতে পরামর্শ দেয়। এতে বসে বসেই প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা আয় করা সম্ভব বলে জানায় মাহতাব রফিক। ব্যস, সেই পথেই হাঁটতে থাকে হাকিম। বিভিন্ন মাধ্যমে ফিমেল এসকর্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ফিমেল এসকর্টদের মুখ-ঢাকা ছবি-বিজ্ঞাপন প্রচার করে মাহতাব রফিকের এসকর্ট সংক্রান্ত ওয়েবসাইট। ক্লায়েন্ট যোগাযোগ করে। এভাবেই জড়িয়ে যায় যৌনপেশায়। ভিনদেশি নারী ও দেশের মধ্যে নারীদের কথা চিন্তা করেই ফিমেল এসকর্টের পাশাপাশি শুরু করে মেইল এসকর্টের কাজও। নিজের যৌবন ও শরীরকে কাজে লাগিয়ে রাতারাতি এক শ্রেণির নারীদের কাছেও প্রিয় হয়ে উঠে হাকিম। হাকিমের বাড়ি গোড়ানে। স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে তাঁর পরিবার। সিরাজগঞ্জের এক কৃষক পরিবারের সন্তান হাকিম। তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোটো। এক ভাই চাকরি করে বিশেষ একটি বাহিনীতে, আর এক ভাই পুলিশে এএসআই পদে কর্মরত।
