বাংলাদেশের বেশিরভাগ লোকই বলছে, ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচে আম্পায়াররা ভারতকে জেতানোর উদ্দেশ্যেই মাঠে নেমেছিলেন। শুরুতে ম্যাচটা জমবে মনে করা হয়েছিল, অবশ্য খানিকটা গড়াতেই ঝুলে পড়লো। আমার বাড়িতে যাঁরা ম্যাচ দেখতে এসেছিলেন, তাঁরাও, ভারত দুশ’ আশি/পঁচাশি রান করার পরই উঠে চলে গেলেন কারণ তাঁরা বুঝে গেছেন ভারত হাসতে হাসতে জিতবে। যদিও আমি প্রচুর মিষ্টি খাওয়াবার ব্যবস্থা করেছিলাম, এই ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ নিয়ে ভারতীয়দের তেমন কোনও উত্তেজনা লক্ষ্য করিনি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে ভারতীয়দের উত্তেজনাটা বেশি। পাকিস্তানকে হারাতে যত আনন্দ, তত আনন্দ আর অন্য কোনও টিমকে হারিয়ে ভারতের হয় না। খেলাতে না চাইলেও রাজনীতি এসে যায়।
ভাবছিলাম যদি আম্পায়াররা একশ’ভাগ নিরপেক্ষ হতেন, তবে কি ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জিততে পারতো? আমার কিন্তু মনে হয় না। বাংলাদেশের ফিল্ডিংয়ের সমালোচনা শুনেছি, ব্যাটসম্যানদের মধ্যে আন্ডারস্টেন্ডিং-এর অভাবটাও চোখে পড়ার মতো। ফেসবুকে বাংলাদেশ ভক্তদের এখন আস্ফালন দেখছি, সবারই বক্তব্য বাংলাদেশ নির্ঘাত জিততো, কিন্তু আম্পায়াররাই জিততে দেননি। এমনই ক্রুদ্ধ বাংলাদেশের ভক্তকূল এখন যে, পারলে ভারতের বিরুদ্ধে বন্দুকযুদ্ধ লাগিয়ে দেয়। কেউ কেউ আবেগে উত্তেজনায় এমনই কাঁপছে যে হাতের কাছে আইসিসির কেউ, বা আম্পায়ারদের কাউকে পেলে নির্ঘাত জবাই করতে পারে। ক্রিকেটে জেতাটাকে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ বলেই ওরা মনে করছে। আম্পায়াররা ইচ্ছে করেই ভারতকে জিতিয়েছেন বা ইচ্ছে করেই বাংলাদেশকে হারিয়েছেন এই বলে বলে যারা ফেসবুক কাঁপাচ্ছে, তাদের এই আবেগটা যদি অভিজিতের হত্যাকারীদের বিচার ত্বরান্বিত করতে, বাংলাদেশে মৌলবাদী উত্থান থামাতে, নারীবিদ্বেষ দূর করতে, লাগাতো- তবে বাংলাদেশের সত্যিকার কিছু উপকার হতো। দেশপ্রেমটা দেখছি শুধু ক্রিকেট জেতার বেলায়। ভিনদেশি লোকেরা বাংলাদেশকে ঠকিয়েছে বুঝলাম। এদিকে যে দেশের লোকরা দেশের লোকদের অবিরাম ঠকাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে এই দেশপ্রেমিকরা কি আদৌ কখনও ফুঁসে উঠেছে?
এর মধ্যে আরও ভাবছিলাম, বাংলাদেশ যদি জিততো খেলায়, যদি ভারত না গিয়ে বাংলাদেশ যেতো সেমিফাইনালে, এমনকী যদি বিশ্বকাপও জিতে যেতো, কী হতো বাংলাদেশের? পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র এবং দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের দুর্নাম কি ঘুচে যেতো? চরম নারী-বিদ্বেষী, পুরুষতান্ত্রিক, আর মানাবাধিকার লংঘনের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আর পরিচিত হতো না? মানুষ কি ভুলে যেতো যে এই দেশটিতে মুক্তচিন্তকদের জবাই করে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়, এই দেশটিতে সচেতন লেখকদের জনসমক্ষে কুপিয়ে মারা হয়? জানতো না এই দেশে ধর্মীয় আইন বহাল থাকার কারণে আজ নারীরা তাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত? জানতো না যে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলেরা বাসে ট্রাকে পেট্রোল বোমা ছুড়ে এ দেশে নিরীহ মানুষদের হত্যা করে।
বাংলাদেশ শতবার বিশ্বকাপ ক্রিকেটে জিতলেও এ দেশ একটি ব্যর্থ দেশ হিসেবেই প্রমাণিত হবে। সুতরাং সবচেয়ে যেটা জরুরি, ক্রিকেটে জেতার চেয়েও, অন্যায়-অত্যাচার-নির্যাতন-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জেতা। আম্পায়াররা ভুল করেন। অহরহই করেছেন অতীতে। শুধু বাংলাদেশই নয়, অনেক দেশই আম্পায়ারদের ভুলের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশি ক্রিকেট ভক্তকূল এটা নিয়ে প্রতিবাদ করতে পারে, কিন্তু প্রতিবাদ তো নয়, দিনভর রাতভর তারা উগরে দিচ্ছে ভারত বিদ্বেষ আর ভারতঘৃণা। আত্মসমালোচনা না করলে কোনো জাতি বা মানুষ উন্নতি করতে পারে না। বাংলাদেশের উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা বাংলাদেশের মানুষ, অন্য কেউ নয়।
বাঘ আর বেড়াল
১. প্রসেনজিৎ লিখেছেন, ‘বাঘের কিন্তু জাত আলাদা হয়, বেড়ালকে ভুল করে বাঘ না ভাবাই ভাল!’ অমনি বাংলাদেশের লোকরা ভেবে বসলো প্রসেনজিৎ বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। বেচারাকে ননস্টপ গালাগালি করতে লাগলো সবাই। এদিকে প্রসেনজিৎ ক্ষমা চাইলেন, বললেন তাঁর ওই মন্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশ বা এর ক্রিকেট দলের কোনও সম্পর্ক নেই, তিনি তাঁর সিনেমার একটি ডায়লগ বলেছেন মাত্র। বাংলাদেশের ক্ষুব্ধ দেশপ্রেমিকদের রাগ এখনও পড়েনি। নায়ক মশাইকে হাতের কাছে পেলে কী করতো, ওরাই জানে।
আমি মনে করি প্রসেনজিৎ ভুল লিখেছেন। বাঘ এবং বেড়ালের জাত মোটেও আলাদা নয়। ওরা এক জাত। ওরা ফিলাইন জাত। বাঘরাও একধরণের বেড়াল। আকারে বড় এই যা। প্রসেনজিৎ বেড়ালকে তুচ্ছ করে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের লোকরাও বেড়ালকে অপমান করেছে। বাঘ না ডেকে তাদের বেড়াল ডাকা হয়েছে মনে করে ক্ষুদ্ধ হয়েছে তারা।
যে বেড়াল দশ হাজার বছর আগে জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে এসে মানুষের উপকার করেছিলো, যে বেড়ালকে প্রাচীন মানুষেরা রীতিমতো পুজো করতো, যে বেড়াল এখনও মানুষের সঙ্গে মানুষের ঘরে পরিবারের একজন হয়ে বাস করে, সেই বেড়ালকে নিচু করে, বাঘকে– যে বাঘের সঙ্গে আমাদের ঘরগেরস্থালীর সম্পর্ক নেই, যে বাঘ আমাদের পেলে চিবিয়ে খাবে, সেই বাঘকে আমরা আপন ভাবছি বেশি, ভালবাসছি বেশি! না, বাঘের সঙ্গে আমার কোনও বিরোধ নেই। বাঘ যেন বিলুপ্ত না হয়, তা আমি ভীষণই চাই।
