পরে জার্মান বিজ্ঞানী কেপলার চাঁদের আকর্ষণের ব্যাপারটি খোলসা করেন। গ্যালিলিওকে রক্ষা করা তাঁর সমর্থকদের পক্ষেও অনেকটা অসম্ভব ছিল। পোপ নিজে ব্যাপারটিতে জড়ালেন। গ্যালিলিওর কোনও যুক্তিই ধোপে টেকে না যেখানে বাইবেলে স্পষ্ট লেখা আছে, সূর্য উদয় হয়, সূর্য অস্ত যায়, আর সূর্য সেখানেই ফিরে আসে যেখানে উদয় হয়েছিল। পোপের অনুমতি নিয়ে কার্ডিনাল জানিয়ে দিলেন, ঈশ্বরের সাজানো মহাজগেক শোধরাবার দায়িত্ব কাউকে দেওয়া হয়নি। পৃথিবীকে তিনি যেমন স্থির রেখেছেন তেমনই স্থির থাকবে, আর সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্রকে পৃথিবীর চারদিকে যেমন ঘোরাচ্ছেন, তেমনই ঘুরবে এরা। ১৬৬১ সনে, গ্যালিলিওর তখনও পোপের কাছে জবাবদিহি শেষ হয়নি, নিজের মতবাদের পক্ষে কোনও প্রমাণাদি আর গ্রহণ করা হবে না জানিয়ে দেওয়া হল, আর কোপারনিকাসের মতকে মিথ্যে এবং বাইবেলবিরোধী বলে ঘোষণা করা হয়ে গেল, বলা হল কোপারনিকাসের বইটি ততক্ষণ নিষিদ্ধ থাকবে, যতক্ষণ না এটি সংশোধিত হয়। রোম থেকে ফ্লোরেন্স ফিরে গিয়ে, গ্যালিলিও অসুস্থ শরীর নিয়েই, ম্যালেরিয়া নাকি রিউমেটিক, কী বাঁধিয়েছেন কে জানে, বই লিখতে শুরু করলেন, জোয়ারভাটার ওপর লিখলেন একটি। তারপর তো সেই বিখ্যাত বই, ১৬৩২ সনে বেরোল, ডায়ালগ অন দা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেম, টলেমিক অ্যান্ড কোপারনিকান। জার্মানি থেকে প্লেগ রোগ তখন ঢুকেছে উত্তর ইটালিতে, ফ্লোরেন্স শ্মশানমতো হয়ে যাচ্ছে, আর এদিকে গ্যালিলিও রোমে দৌড়াচ্ছেন, বই বের হচ্ছে। বেরোনোর পরই ডায়ালগ নিষিদ্ধ হল আর গ্যালিলিওকে দাঁড়াতে হল ধর্মযাজকের বিচারসভায়। সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন মারিয়া সেলেস্ত, বাবার জন্য প্রার্থনা করছেন, চিঠি লিখে যাচ্ছেন, চিঠি পাঠাচ্ছেন গোপনে, চিঠি পাচ্ছেন, নিষিদ্ধ সব চিঠি। বিচারে গ্যালিলিওকে নজরবন্দি করা হল। প্রিয় কন্যাকে একটিবার দেখার উপায় ছিল না তাঁর। কন্যা মারা গেলেন হঠাত্ অসুখে, গ্যালিলিওকে, একা মানুষটিকে, আরও একা করে দিয়ে। কন্যার মৃত্যুর পর প্যারিসে এক বন্ধুর কাছে গ্যালিলিও লিখেছিলেন ‘আমার অনুপস্থিতিই মারিয়াকে অসুস্থ করেছে, নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়নি মোটেই। ওর অভাব আমি সইতে পারছি না। ও ছিল অসাধারণ, এ উওমেন অফ এক্সকুইজিট মাইন্ড, সিংগুলার গুডনেস অ্যান্ড মোস্ট টেনডারলি অ্যাটাচড টু মি। ’
একাকিত্বে, অভাবে, অসুখে ভুগতে ভুগতে গ্যালিলিওরও যাবার সময় হল, গালিলিও গেলেন, আইনস্টাইনের মতে, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্মদাতা, গেলেন। মারিয়া সেলেস্ত বিশ্বাস করতেন, বাবার সঙ্গে তাঁর মিলন হবে নক্ষত্রের ওপারে। গ্যালিলিওর কি সে বিশ্বাস ছিল! ঈশ্বরে, তিনি কখনও বলেননি যে, তাঁর বিশ্বাস নেই। বিশ্বাস থাকলেও, জেনে বা না জেনে ঈশ্বরকে হত্যা করেছেন গ্যালিলিও, আর দুশো বছর পর চার্লস ডারউইন ঈশ্বরের কফিনে পেরেক লাগিয়ে দিয়েছেন।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৬
ঢাকাও কমাতে পারে জ্যাম আর দূষণ
প্রথম দিন :
আজ দিল্লিকে সত্যি চেনা যায়নি। বিকেলে বেরিয়েছি। মনে হচ্ছিল ছুটির দিন বুঝি। অথবা হরতাল চলছে। কিছু রাস্তা তো পুরোই ফাঁকা। নীতি মার্গে গিয়ে গাড়ি থামালাম। মনে হচ্ছিল উত্তর ইউরোপের কোনও সুনসান শহর বুঝি। রাস্তা পড়ে আছে একা। হঠাত্ হঠাত্ দু’একটা গাড়ি নিস্তব্ধতার গায়ের ওপর দিয়ে ঝড়ের বেগে কোথাও চলে যাচ্ছে। উত্তর ইউরোপের কিছু কিছু দেশের জনসংখ্যাই কোথাও কোথাও এক কোটি নয়। আর দিল্লি শহরের জনসংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল শহর দিল্লি। টোকিওর ঠিক পরেই রয়েছে দিল্লি। দিল্লিকে ঠিক এরকম শান্তশিষ্ট মানায় না।
বিকেলের যে সময়টায় আমি বেরিয়েছিলাম শহরে, সে সময় ট্রাফিকের যন্ত্রণায় গাড়িকে থেকে থেকে ঝিমোতে হয়। যেখানে পৌঁছোতে আমার অন্যদিন দেড় ঘণ্টা খরচ হয়, সেখানে পৌঁছোতে আজ লাগলো কুড়ি মিনিট। তার মানে এই জোড়-বেজোড়ের ফর্মুলা ভালো কাজ করছে। একদিন জোড় নাম্বারের গাড়ি চলবে, পরদিন বেজোড় নাম্বারের গাড়ি চলবে। এই নিয়মটি দিল্লির নিজস্ব নয়। কয়েক বছর আগে বেইজিং এই নিয়ম চালু করে ভালো সুফল পেয়েছে। দিল্লিও সুফল পেলো প্রথম দিন। তবে লোকেরা বলছে, আজ অনেকের ছুটি ছিল, সামনের সপ্তাহে বোঝা যাবে এই জোড়-বেজোড় ফর্মুলা আদৌ কাজ করবে কি না। আজ দূরদর্শনের এক সাংবাদিক-বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো, ও বললো সোমবারে ও মেট্রো চড়ে অফিসে যাবে। এর আগে কোনওদিন মেট্রোতে অফিসে যায়নি, এবার শুরু করবে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অন্যের গাড়ি চড়ে অফিসে গিয়েছেন আজ, যেহেতু তাঁর গাড়ির নম্বর বেজোড়। পর্যটনমন্ত্রী তো বাইক চালিয়ে অফিসে গেছেন। ভাবতেই ভালো লাগছে দিল্লিকে বায়ুদূষণ থেকে মুক্ত করার জন্য শেষ অবধি ভালো একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সচেতন অনেক নাগরিকই নিয়ম মেনে চলছেন।
বিশ্বের এক নম্বর দূষিত শহর দিল্লি। আগে শীর্ষে ছিল বেইজিং। বেইজিং দূষণ কমিয়ে এক নম্বর থেকে সরে গেছে। উঠে এসেছে দিল্লি। পুরোনো ডিজেল গাড়ি নিষিদ্ধ না করলে চলছে না। এসব গাড়ি থেকেই দূষণ ছড়ায় বেশি। বাতাসে দূষণ এত ভয়ংকর যে মানুষ ফুসফুসের অসুখে ভুগতে শুরু করেছে। ফুসফুসের ক্যান্সারের জন্য আর সিগারেট ফোঁকার প্রয়োজন নেই। দিল্লির হাওয়া খেলেই ক্যান্সার ধরবে। হাওয়ায় কারসিনোজেন উড়ছে। এমন কোনও দিন নেই যেদিন আমি দিল্লির রাস্তায় হেঁটেছি কিন্তু কাশিনি বা নির্বিঘ্নে শ্বাস নিতে পেরেছি। সেদিন এক ফার্মেসিতে ঢুকে দেখলাম মাস্ক বিক্রি হচ্ছে। অনেকে এখন মাস্ক পরে চলাফেরা করে।
