খুররাম, আমার মন বলছে, নাস্তিক ছিলেন। খুররাম জাকির দোষ অনেক, তিনি শিয়া সম্প্রদায়ের লোক। সুন্নি মৌলবাদের নিন্দে করতেন। লাল মসজিদের ইমাম আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন খুররাম জাকি। লাল মসজিদ সুন্নি মৌলবাদীদের আখড়া, মনে আছে ২০০৭ সালে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে লাল মসজিদে মোশাররফের মিলিটারি অপারেশন? আবদুল আজিজ বড়ই কট্টরপন্থি সুন্নি। তিনি কারও অনুরোধেই ২০১৪ সালে তালিবানিদের ঘটানো হত্যাযজ্ঞের নিন্দে করেননি। তালিবানরা পেশোয়ারের এক স্কুলে ঢুকে ১৩২ জন স্কুলছাত্রকে খুন করেছিল, সেই তালিবানি হত্যাযজ্ঞের নিন্দে করতে আবদুল আজিজ অস্বীকার করেন। তখন খুররাম জাকি ইমামের গ্রেফতার দাবি করেছিলেন। ‘সিপাই সাহাবা’ নামের এক নিষিদ্ধ জঙ্গি দলের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছিলেন খুররাম। সম্প্রতি লন্ডনের নতুন মেয়র সাদিক খানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, যে সাদিক খান পাকিস্তানে জন্ম নিয়েও শুধু ইওরোপের শিক্ষা সংস্কৃতি গ্রহণ করে আধুনিক তো হয়েছেনই, খাঁটি সেক্যুলারও হয়েছেন। খুররাম জাকি পাকিস্তানের নির্যাতিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় শিয়া, সুফি, আহমদিয়া, খ্রিস্টান, হিন্দুর মানবাধিকারের পক্ষে লিখতেন। মানবাধিকারের পক্ষে কলম ধরার এবং মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করার কারণে মৌলবাদীরা খুররাম জাকিকে খুন করেছে।
বাংলাদেশের মৌলবাদীরা কুপিয়ে মারে, পাকিস্তানেরগুলো গুলি করে। কুপিয়ে মারলে নাকি পুণ্য হয় বেশি। এক নম্বর বেহেস্তে স্থান জোটে। বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানের সন্ত্রাসীদের থেকে তুলনায় তাহলে পুণ্যবান। মৌলবাদ আর অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে কথা বললে বাংলাদেশে আর পাকিস্তানে আজকাল খুন হয়ে যেতে হয়। করাচিতে দু’বছর আগে আর্ট সেন্টারের ডিরেক্টর সাবিন মাহমুদকে খুন করেছে মৌলবাদীরা। বেলুচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে— এই নিয়ে তিনি একটি তার সেন্টারে আলোচনার আয়োজন করেছিলেন। অপরাধ সেটিই। পারভিন রহমান নামের একজন মানবাধিকার কর্মীকেও খুন করেছে ওরা।
‘লেট আস বিল্ড পাকিস্তান’ নামের ব্লগের সম্পাদক ছিলেন খুররাম জাকি। ওই ব্লগের সম্পাদকমণ্ডলীর প্রধান আলী আব্বাস তাজ বলেছেন, তালিবান আর সুন্নি মৌলবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার কারণে খুররাম জাকিকে খুন হতে হয়েছে।
খুররাম জাকির মরদেহ পাকিস্তানের পতাকায় মুড়িয়ে কবর দেওয়া হয়েছে। শত শত মৌলবাদবিরোধী মানুষের ভিড় ছিল সেখানে। বাংলাদেশে এমন দৃশ্য দেখা যায় না। খুন হওয়ার পর চুপচাপ সরিয়ে ফেলা হয় মুক্তচিন্তক ব্লগারদের মৃত শরীর। গোপনে সৎকার করা হয়। মরদেহ পতাকায় মোড়ানো, শত শত মানুষের জমায়েত!— এসব হওয়ার মতো পরিবেশ এখন আর বাংলাদেশে নেই, এখনো পাকিস্তানে আছে।
বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে যে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, মুক্তচিন্তক হত্যার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, তা বড়ই ভয়ংকর। আর কোনও দেশ যেন বাংলাদেশের এই সংস্কৃতি অনুসরণ না করে। পাকিস্তানকে লোকে মৌলবাদী দেশ বলে। পাকিস্তানেও কিন্তু অন্যায়ের বিচার হতে দেখি। বাংলাদেশে এতগুলো সেক্যুলার ব্লগারকে সন্ত্রাসীরা মেরে ফেললো, কোনও খুনিকেই ধরা হলো না, শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা। আর পাকিস্তানে সালমান তাসিরকে যে ইসলামী সন্ত্রাসী খুন করেছিল, তার কবে ফাঁসিও হয়ে গেছে। পাকিস্তানে মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করা মানুষের বিচার হতে পারে, বাংলাদেশে কেন পারে না? পাকিস্তান যদি মৌলবাদী দেশ, তবে বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের চেয়েও বড় মৌলবাদী দেশ? আমরা কি একাত্তরে পাকিস্তানের চেয়েও বড় মৌলবাদী দেশ হওয়ার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম?
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১২ মে, ২০১৬
সমাজ কি থেমে আছে?
১.
কোনও বায়োডাটা ফর্ম পূরণ করতে গেলে নাম বয়স ও জন্মতারিখের পর পিতা/স্বামীর ঘরে আমার দৃষ্টি থমকে দাঁড়ায়। বিবাহিত পুরুষেরা পিতা এবং স্বামীর মধ্যে পিতাকে বেছে নেন, কারণ তাদের ‘পিতা আছে, স্বামী নেই; বিবাহিত নারীদের কিন্তু খানিকটা মুশকিল হয়, কারণ তাদের পিতাও আছে এবং স্বামীও আছে। তাদের বেছে নিতে হয় যে কোনও একজনের ‘অভিভাবকত্ব’। সাধারণত স্বামীর অভিভাবকত্ব বরণ করতে হয় তাদের।
স্বামী ও স্ত্রীকে যদি একে অপরের পরিপূরক বলে ধরে নিই— স্ত্রী যদি স্বামীর নাম উল্লেখ করেন তার জীবনবৃত্তান্তে, তবে স্বামীরও নিশ্চয়ই স্ত্রীর নামই উল্লেখ করা উচিত। আর তা না হলে নারী ও পুরুষ উভয়কেই তাদের পিতা-মাতার পরিচয়ই উল্লেখ করতে হবে। আমার মনে হয় পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে সে বিবাহিত কী অবিবাহিত— অভিভাবক হিসেবে পিতা ও মাতাকে স্বীকার করাই উচিত।
ধরা যাক, দেশের কোনও এক নাগরিক তার পিতা-মাতাসহ ময়মনসিংহে বসবাস করে, তার পিতার জন্ম এবং আদি বাড়ি রাজশাহী জেলায়, তার মায়ের জন্ম এবং আদি বাড়ি চট্টগ্রাম জেলায়। এই নাগরিককে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার বাড়ি কোথায়, তবে সে কিন্তু ময়মনসিংহ নয়, চট্টগ্রাম নয়, বলবে রাজশাহী। ধরা যাক রাজশাহী পিতার বাড়ি বটে, তবে রাজশাহীতে সে কখনও যায়নি, তার পিতা চট্টগ্রামের মেয়েকে বিবাহ করে কর্মসূত্রে ময়মনসিংহে চলে আসেন এবং দীর্ঘকাল সেখানে বসবাস করেন, তবু তার নিজের ‘গ্রামের বাড়ি বা দেশের বাড়ি’ রাজশাহীকেই মানতে হবে। এ এক অদ্ভুত ব্যবস্থা বটে। পিতার জন্মস্থানকে নিজের উৎসস্থল বলে চিহ্নিত করা। এটির কারণ ‘পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা’— পিতাই যেখানে পরিবারের প্রভু। সংসারে পিতার যদি কোনও অর্থনৈতিক অবদান না থাকে— পিতা যদি অথর্ব, অক্ষম, অসৎ ও অত্যাচারী হয় তবুও সন্তানকে পরিচিত হতে হয় পিতার পরিচয়ে। মাতা যদিও একটি ভ্রূণকে ন’মাস সাত দিন জরায়ুতে লালন পালন করেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তা প্রসব করেন, তবু তার পরিচয় সমাজে মুখ্য নয়। আমি বলছি না মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এই সমাজকে ফিরে যেতে হবে। বলছি না রোকেয়ার নারীস্থানের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে। আমার একটিই প্রস্তাব, যে গ্রাম বা শহরে তুমি বাস করো, তোমার বাড়ি কোথায় প্রশ্ন করা হলে সেই গ্রাম ও শহরের নাম উল্লেখ করো। সেই সঙ্গে পিতার বাড়ি এবং মাতার বাড়িরও আলাদা উল্লেখ প্রয়োজন। অন্তত এই নিয়মটি শীঘ্র চালু করলে পিতৃতন্ত্রের নাগপাশ থেকে খানিকটা মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। মুক্তি পাওয়া মানে কিন্তু এই নয় যে, নারীর সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়া, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটে যাওয়া, নারীর রাজনীতি করবার, শিক্ষিত হবার, স্বনির্ভর হবার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে যাওয়া, অন্ধকার ঘুচে যাওয়া। খুলে যাওয়া তার সামাজিক সকল শৃঙ্খল।
