মানুষের তবু শিক্ষা হয় না। কন্যায় আপত্তি বলে অনেকে কন্যার ভ্রূণ নষ্ট করে ফেলে, কন্যাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলে অথবা অনাদরে বড় করে। পুত্র জন্ম দিয়ে ধন্য হয় লোক। অথচ অনেক সময় দেখা যায় হেলাফেলা করে বড় করলেও বাবা মা’কে দেখভাল অধিকাংশ সময় কন্যাই করে, ননীটা ছানাটা খেয়ে বড় হওয়া পুত্র বরং দায়িত্ব এড়ায়।
মেয়েদের হাজারো কিছু করার স্বাধীনতা নেই। যদি থাকতো, তবে দক্ষতা দেখাতে পারতো আরও। পৃথিবীর অর্ধেকই নারী। এই অর্ধেককে আবৃত করে, অনাবৃত করে, অশিক্ষায় মুড়িয়ে, অত্যাচারে ভুগিয়ে মারছে পুরুষ আর তার তৈরি সমাজ ব্যবস্থা। যদি একবার সমান সুযোগ পেত মেয়েরা, একবার যদি সমান সুযোগ পেতাম আমরা, পৃথিবী বদলে দিতে পারতাম। ছেলেরা যে সুযোগ পায় স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে, যেখানে খুশি সেখানে যেতে, জগৎ জানতে, জ্ঞানার্জন করতে— একই সুযোগ মেয়েদের দেওয়া হোক। একই অধিকার, একই স্বাধীনতা মেয়েদের একবার দিয়ে দেখুক সমাজ। সোনার মেডেল কারা নিয়ে আসে দেখুক। বিজয় নিশান কারা ওড়ায় দেখুক।
কেউ যেন ভাববেন না আমি ছেলে-মেয়েদের আলাদা করে দেখছি। আসলে, আমি নই, আলাদা করে সমাজ দেখছে। আমি এক করতে চাইছি। এই বলে এক করতে চাইছি যে ছেলেরা কোনও কোনও ক্ষেত্রে দক্ষ, মেয়েরাও কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দক্ষ। যে খেলাগুলো ছেলেরা খেলে, সেসব মেয়েরাও খেলে। মেয়েরা ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, ম্যারাথন, বাস্কেটবলও খেলে। মেয়েরাও পারে। উড়োজাহাজ কেন, মহাকাশযানও চালাতে পারে। হাতিয়ার হাতে নিয়ে যুদ্ধ করতেও পারে। ছেলেরা যা পারে, মেয়েরা প্রমাণ করেছে মেয়েরাও তা পারে। কিন্তু মেয়েরা আরও যা পারে, ছেলেরা এখনও প্রমাণ করতে পারেনি, ছেলেরাও সেসব পারে। একটি যেমন শিশু পালন।
মেয়েরা কম বোঝে, কম জানে, কম পারে— এসব তো নতুন নিন্দে নয়। এসব শুনে শুনে বড় হয়েছে প্রায় প্রতিটি মেয়ে। ‘মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু’ বলে মেয়েদের পেছনে মেয়েদের লেলিয়ে দিয়ে মজা দেখে পুরুষ। মেয়েদের বোকা বানিয়ে, দাসী বানিয়ে, ঠকিয়ে, নিঃস্ব করে পুরুষ আনন্দ পায়। এ তো হাজার বছরের ইতিহাস।
মেয়েরা পুরুষকে যে সম্মান দেয়, একই সম্মান যদি পুরুষরাও মেয়েদের দিত, তা হলে সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য বলে কিছু থাকতো না। পুরুষ তৈরি পিতৃতন্ত্র বহাল না থেকে যদি মানবতন্ত্র বহাল থাকতো, তবে ধর্ষণ, বধূহত্যা, পণ প্রথা, নারী নির্যাতনও বন্ধ হতো।
নারীবিরোধী আইন যতদিন সমাজে আছে, যতদিন নারীবিরোধী ওয়াজ চলবে, যতদিন পিতৃতন্ত্র ছড়ি ঘোরাবে, যতদিন ধর্মান্ধতা বিরাজ করবে সমাজে— ততদিন নারী সেই সম্মান পাবে না যে সম্মান তার পাওয়া উচিত।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৫ আগস্ট, ২০১৬
বিরুদ্ধ স্রোত
ঢাকার সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে ভারতের কিছু মিডিয়া আমার মতামত জানতে চেয়েছিল। ওদের জন্য লিখেছি, বলেছি। কথা প্রসঙ্গে ইসলাম এসেছে। আসাটা খুব স্বাভাবিক। আমি যথারীতি আমার মত প্রকাশ করেছি। এতে ক্ষুব্ধ কংগ্রেসের বড় বড় নেতা। গোলাম নবী আজাদ রাজ্যসভায় সেদিন বললেন, আমি নাকি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিচ্ছি। কাশ্মীর নিয়ে বলছিলেন, হঠাৎ আমাকে নিয়ে কেন পড়লেন কে জানে। আমি কি কাশ্মীর সমস্যার জন্য দায়ী? বোধহয় তাই বলতে চাইছিলেন যে, দায়ী। কাশ্মীরের প্রেস ফ্রিডম দাবি করছেন আবার দিল্লির প্রেস ফ্রিডমের নিন্দে করছেন। এ নিয়ে রাজনীতির কোনও দলের কোনও নেতাই মুখ খুললেন না। আমি কিন্তু ইসলাম নিয়ে কোনও মিথ্যে কথা বলিনি। ইসলামকে গালাগালি করিনি। বলেছি, মেয়েদের সমানাধিকার দরকার, অন্যান্য ধর্মের কানুন প্রথা অনেক পাল্টেছে। মুসলমানের শত্রু ছাড়া আর কেউ বলবে না, ইসলামি আইনের কোনও বদল -পরিবর্তন চাই না।
কংগ্রেসের আরও একজন বড় নেতা সালমান খুরশিদ দেখলাম টুইট করছেন, আমি নাকি পুরো জাতিকেই ধ্বংস করে দিয়েছি। এত বড় ক্ষমতা আমার? এত বড় ভারতকে ধ্বংস করে দেওয়ার? ছ’মাস আগে আইন বিষয়ক একটি বইয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম, ওখানে সালমান খুরশিদ গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে কেউ আমার পরিচয় করিয়ে দেয়নি। কিন্তু মঞ্চ থেকে দর্শকের আসনে বসা আমাকে দেখে উনি তাঁর ভাষণের শুরুতে বললেন যে আমার উপস্থিতি নাকি অনুষ্ঠানের মর্যাদা বাড়িয়েছে, তাঁর ভাষণ শুনে আমার মনে হয়েছিল তিনি খুব শিক্ষিত, সচেতন, বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী একজন মানুষ। তিনি যে সময়ে বদলে যেতে পারেন, একটুও তো মনে হয়নি। এই মানুষটাই এখন আমার সম্পর্কে কী ভীষণ বাজে বকছেন।
গোলাম নবী কটাক্ষ করছিলেন, ইসলাম নিয়ে লিখে এমন অন্যায় করেছি যে আমাকে আমার দেশের সরকার দেশ থেকে বের করে দিয়েছে। বলতে চাইছেন, আমি যে নির্বাসন দণ্ড ভোগ করছি, দোষটা আমার, দোষটা আমার দেশের সরকারের নয়। যে লেখে তার দোষ, লেখককে যে বের করে তার নয়? আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম, মুসলমান সমাজের রিফরমেশনের কথা বলাতেই কী ভীষণ রাগ করতে পারেন ভারতের বাঘা বাঘা নেতা! এঁরাই কি মুসলমান সমাজের পিছিয়ে থাকার জন্য দায়ী? এঁরা পলিটিক্স করবেন বলেই কি মুসলমানদের আফিম খাইয়ে অন্ধকারে রেখে দিচ্ছেন? আলোকিত হতে দিতে এত আপত্তি কেন? এঁরা নিজেরা আধুনিক জীবনযাপন করেন। কিন্তু জাকির নায়েককে ফিরিয়ে আনতে চান। জাকির নায়েক জনগণকে চমত্কার আফিম খাওয়াতে পারেন বলেই কি ফিরিয়ে আনতে চান?
