আমরা আইসিসকে তো দেখলাম, বিশাল পরাশক্তির বিরুদ্ধে কিছু ছুরি আর বন্দুক নিয়ে নেমে গেছে মাঠে, বছর ভর মুসলমানদেরই গলা কেটেছে, মেয়েদের ধরে বেঁধে যৌনদাসি বানিয়েছে— এই সমাজ কি কোনো কাঙ্ক্ষিত সমাজ?
ইহুদিরাও অত্যাচারিত হয়েছিল, কিন্তু ওরা অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে দলে দলে মানুষের গলা কাটতে নেমে যায়নি। ওরা নিজেদের শিক্ষিত করেছে, সুস্বাস্থ্যের কথা ভেবেছে, অর্থনৈতিক শুধু নয়, নৈতিক উন্নতির কথা ভেবেছে, বিজ্ঞানের কথা ভেবেছে, আজ পৃথিবীর বড় বড় শিক্ষাবিদ, বড় বড় চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, পদার্থবিদ ইহুদি সম্প্রদায়ের লোক। বছর বছর নোবেল পাচ্ছে। মানুষ খুন করে, রক্তপাত ঘটিয়ে স্বর্গে যাওয়া যাবে বা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বিপ্লব করা যাবে— এসব মনে হয় না কোনো বুদ্ধিমানের কাজ। বুদ্ধি এত লোপ পাওয়া কি ভালো? অনেকে বলছে, মুসলমানরা হয় বোকা, নয় বর্বর। যারা বোকা নয় বা বর্বর নয়— তাদেরও শুনতে হচ্ছে এই অপবাদ।
সন্ত্রাস কোনো সমাধান নয়। কোনো সম্প্রদায়ের জন্য নয়। আজকের মুসলিম সন্ত্রাসীদের জিজ্ঞেস করো, সকলেই বলবে, আমেরিকার সন্ত্রাস তাদের পছন্দ নয়, আমেরিকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেই তারা আজ সন্ত্রাসী হয়েছে। আমার প্রশ্ন, ‘তুমি যদি বন্দুকের বিরুদ্ধে, তবে তুমি নিজেই কেন বন্দুক হাতে নিচ্ছ? তুমি যদি খুনের বিরুদ্ধে, তবে তুমি খুন করো কেন?’ আসলে সন্ত্রাসীরা কিছু একটা ছুঁতো খোঁজে সন্ত্রাস করার জন্য, সন্ত্রাস তাদের ভালো লাগে, ভালো লাগে বলেই শত্রুদের সন্ত্রাস দেখে তাদেরও সন্ত্রাসী হতে ইচ্ছে করে, শত্রুরা তো অনেক ভালো কিছু করে, সেসবের প্রতি কেন আকৃষ্ট হয় না তারা? কেন তারা যুক্তিবাদী হওয়ার জন্য, বিজ্ঞানী বা নভোচারী বা আরো হাজারো ভালো কিছু হওয়ার জন্য স্বপ্ন দেখে না?
মুসলমানরা যদি নিজেদের ভালো চায়, নিজেদের সভ্য এবং শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, তবে নিজেদের সংবিধান থেকে, নিজেদের আইন থেকে, শিক্ষা এবং সংস্কার থেকে ধর্মটাকে তুলে নিয়ে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের গণ্ডিতে রেখে দেবে। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের গণ্ডি থেকে একে বের করলেই বিপদ বাধে। ইতিহাস বলে বিপদ বাধে। আমরাও সচক্ষে দেখছি বিপদ বাধে। ধর্মের নামে বা ঈশ্বরের নামে খুনোখুনি করে বর্বর লোকেরা। সভ্য দেশগুলোয়, যে দেশগুলোয় মানবাধিকার, সমানাধিকার, নারীর অধিকার, সমতা আর শান্তি সবচেয়ে বেশি, সেখানে ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের গণ্ডির মধ্যে রাখা হয়, রাষ্ট্রের কোনো কাজকর্মে নাক গলাতে দেওয়া হয় না। পৃথিবীতে নানা মতের, নানা ধর্মের, নানা ভাষার, নানা সংস্কৃতির, নানা লিঙ্গের, নানা রঙের মানুষকে একসঙ্গে সুখে-শান্তিতে বাস করতে হলে এ ছাড়া উপায় নেই।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৬
বুদ্ধিজীবী দিবস
বয়স অল্প ছিল একাত্তরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটি নতুন পতাকা হাতে নিয়ে হাটে মাঠে ঘাটে স্বাধীনতার উৎসব করতাম। প্রতিবছর ষোলোই ডিসেম্বর এলে ভোররাত্তিরে উঠে বাড়ির ছাদে পতাকা উড়িয়ে দিতাম, আমার দেশের পতাকা। দেশটিকে একাত্তরের পর থেকে নিজেরই ভেবেছি। আমার দেশটি এখন আর আমার নয়। মনে মনে যদিও একে আমার বলেই ভাবি। খুব গোপনে, সন্তর্পণে ভাবি একে আমার বলেই। দেশের শত্রুরা আমাকে দেশ থেকে সেই দু’দশক আগে তাড়িয়ে ঘোষণা করে দিয়েছিল এ দেশ আমার নয়। এরা দেশের সেই শত্রুদেরই বান্ধব অথবা সন্তান যে শত্রুরা এ দেশের স্বাধীনতা চায়নি, যে শত্রুরা একাত্তরে ধর্ষণ করেছে আমাদের নারী, যে শত্রুরা হত্যা করেছে দেশের বুদ্ধিজীবী, হত্যা করেছে অগণিত নিরপরাধ মানুষ।
বর্বর শত্রুসেনা নির্যাতন করেছে আমাদের পরিবারের সবাইকে। লুট করেছে আমাদের বাড়িঘর, সহায় সম্পদ। শুধু প্রাণটুকু বাঁচাতে একাত্তরের ন’মাস এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে পালিয়ে বেড়িয়েছি। গভীর অন্ধকারে মোষের গাড়িতে চেপে অনাত্মীয় অপরিচিত বাড়িতে গিয়েছি, আশ্রয় চেয়েছি। শত্রুদের আগুনে গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে যেতে দেখেছি। যে শত্রুরা পাকিস্তানি বর্বর সেনা দিয়ে আমাদের বাড়ি লুট করিয়ে ছিল, অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ছুঁড়ে দিয়েছিল আমাদের— তারাই আজ দেশের আপনজন। আর আমি এবং আমার মতোরা আপাদমস্তক নিষিদ্ধ।
ওরা চট জলদি হত্যা করেছিল বুদ্ধিজীবীদের। আজ ওরা নিরাপদে, নিশ্চিন্তে, ভেবেচিন্তে বুদ্ধিজীবী হত্যার ছক আঁকে এবং এক এক করে বুদ্ধিজীবী হত্যা করে। ওরা ধরা পড়ে না, ওরা ধিকৃত হয় না, লাঞ্ছিত হয় না। সত্য বলতে কী, ওদের কোনও শাস্তি হয় না। আমি যদি দেশে থাকতাম, অনেক বছর আগেই ওরা আমাকে কুপিয়ে মেরে ফেলত। বাংলাদেশ যখন প্রতিবছর চৌদ্দই ডিসেম্বরে ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস’ পালন করে, তখন আমি ভাবি এই দিবস শুধু একটি দিনে বা দিবসে কেন সীমাবদ্ধ? মুক্তচিন্তা বা মুক্তবুদ্ধির মানুষদের দেশের সর্বত্র প্রায়ই হত্যা করা হচ্ছে কুপিয়ে। নৃশংসতার সাধারণত সীমা থাকে, এই নৃশংসতা সীমাহীন। বছরের যে কোনো দিনেই খুন হয়ে যাওয়ার ভয়ে তটস্থ আমাদের বুদ্ধিজীবীরা, আমাদের মুক্তচিন্তকরা। শুধু মৌলবাদীরাই যে আমাদের নির্যাতন করছে তা নয়, বাকস্বাধীনতা-বিরোধী আইন বানিয়ে মুক্তচিন্তকদের গ্রেফতার করছে সরকার, জেলেও পুরছে।
