রাতে জাঁকালো সব উৎসবের কথা শুনি, কিন্তু সেসবে যাওয়ার জন্যও আমাকে সংগঠকদের কেউ কিছু বলে না। এক রাতে আমি একা একাই চলে গেলাম ডিনারে, গিয়ে দেখি লাইভ মিউজিক, অঢেল খাবার দাবার, হাজারো লেখক এবং পাঠক আনন্দ করছে, না সেই আনন্দে আমি বুঝি আমি অনাহুত। সোমবার রাতে ছিল লেখকদের জন্য গালা ডিনার। না, সেদিনও আমাকে ডাকা হয়নি। সন্ধে বেলায় বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখি আমার ফ্লাইট রাত বারোটায়। এয়ার লাইন্সের লোকেরা অবাক, এলেন কেন, এসেমেস পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বিকেলেই যে ফ্লাইট দেরিতে যাবে। কিন্তু সংগঠকরা যেহেতু টিকিট কিনেছিলেন, সংগঠকরা পেয়েছেন এসেমেস, আমি পাইনি। হয়তো ওঁরা চেয়েছিলেন অন্যান্য লেখকের সঙ্গে গালা ডিনারে বসার চেয়ে আমার এয়ারপোর্টেই বসে থাকা ভালো। জাস্ট ইন কেইস। ঝামেলাহীন পরব কাটাতে হলে ‘কন্ট্রোভার্সিয়াল’ কাউকে কেউ আশেপাশে দেখতে চায় না।
পুরোটা লিট ফেস্টেই আমি অনুভব করেছি আমার উপস্থিতি কোথাও কাঙ্ক্ষিত নয়। আমি জানি নারী-বিদ্বেষীদের, মৌলবাদীদের, রক্ষণশীলদের অঞ্চলে আমার উপস্থিতি কাঙ্ক্ষিত নয়, টের পাই উদারপন্থীদের অঞ্চলেও আমি অস্পৃশ্য।
পরদিন সব খবরের কাগজে পড়ি, দশ বারোটা মৌলবাদী, যারা, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কোনওদিনই আমার বই পড়েনি, আমার বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছে। ওরা, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমি যত টাকা সাহায্য করেছি গুজরাতের রায়টে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিমদের জন্য, তত টাকার এক ভাগও ওরা সাহায্য করেনি।
২০১২ সালে মৌলবাদীদের দাবি মেনেছিলেন বলে ২০১৭ সালেও তাদের দাবি মানতে বাধ্য হলেন লিট ফেস্টের পাওয়ারফুল লোকেরা। ৫ জনের কাছে হেরে যায় ৫ লক্ষ। কেন, ৫ জন অতিকায় দানব? আর ৫ লক্ষ সবাই ভীরু কাপুরুষ? নাকি অন্য কিছু?
আমি জানি আমাকে নিষিদ্ধ করার মতো সহজ কিছু নেই। কারণ আমাকে নিষিদ্ধ করলে ডানপন্থী হোক বামপন্থী হোক, চরমপন্থী হোক, নরমপন্থী হোক, পুরুষ হোক নারী হোক— কেউ প্রতিবাদ করে না। অনেক তো দেখা হলো এ জীবনে, মুখোশের আড়ালের মুখও অনেক দেখা হয়েছে।
যত আমার ভাবনা চিন্তার পরিসর বাড়ছে, আমার শরীরী অবস্থানের জায়গা তত কমে যাচ্ছে। আমি যত বেশি মানুষের কথা ভাবছি, তত বেশি আমি একা হয়ে যাচ্ছি। যত আমি পৃথিবীকে নিজের গ্রাম বলে ভাবছি, তত আমি এক-ঘরে হয়ে যাচ্ছি। বাক স্বাধীনতার কথা মানুষ বলে বটে, খুব কম মানুষই এই স্বাধীনতাকে মানে।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৭
দঙ্গলের মেয়ে
ভারতবর্ষের মানুষ সিনেমার লোকদের জন্য পাগল। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা মারা যাওয়ার পর ৭০ জনেরও বেশি আত্মহত্যা করেছে। জয়ললিতা কোনও এককালে তামিল সিনেমায় অভিনয় করতেন। আগের মুখ্যমন্ত্রী অভিনেতা এমজিআর রামাচান্দ্রানের মৃত্যু হলে ৩০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। তামিল অভিনেতা রজনীকান্ত মারা গেলে, শুনেছি, হাজারও লোক নাকি আত্মহত্যা করবে। সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের জন্য এই অদ্ভুত আবেগ তামিলদেরই আছে।
সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীরা পলিটিক্সের কিছু না জেনে রাজ্যসভার সদস্য বনে যাচ্ছেন। জয়া ভাদুরি, হেমা মালিনি, জয়াপ্রদা, গোবিন্দ, মিঠুন চক্রবর্তী, রেখা, শাবানা আজমী, শত্রুঘ্ন সিনহা— কে নয়? ওদিকে পশ্চিমবঙ্গেতর মমতা ব্যানার্জি রুপোলি পর্দার মানুষকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, পাকা পলিটিশিয়ানদেরও হারিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। দেবশ্রী, তাপস পাল, দেব, মুনমুন সেন, আরও কত কেউ।
দঙ্গল আমির খানের ছবি। ব্যাপক জনপ্রিয়। ভারতের সর্বত্র দঙ্গলের ভূয়সী প্রশংসা। হরিয়ানার পিছিয়ে থাকা সমাজের দুটো মেয়ে গীতা ফোগাট, আর ববিতা ফোগাট দেশ বিদেশ থেকে কুস্তি লড়ে সোনার মেডেল নিয়ে এসেছে। লোকেরা বলছে, দেখেছো মেয়েরা কী ভীষণ সাহসী হতে পারে, গাঁয়ের মেয়ে হয়েও অলিম্পিকে গিয়ে কী রকম সোনা ছিনিয়ে আনতে পারে! মেয়েদের সাহস আর মনোবল অবশ্য বাস্তবে পছন্দ না হলেও সিনেমায় পর্দায় সেটি মানুষের বেশ পছন্দ। মেয়েদের অত বাড় বাড়লে চলে না— এ কথা শতবার বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলা লোকগুলোই দঙ্গল দেখে হাততালি দেয়। মেয়েদের যৌনদাসী ভাবা লোকেরাও দঙ্গল নিয়ে উচ্ছ্বসিত।
গীতা আর ববিতা ফোগাটের বাবা মহাবীর সিং ফোগাটকে প্রায় ঈশ্বরের মতো শ্রদ্ধা করছে দঙ্গলের দর্শককুল। কারণ, দুটো মেয়েকে তিনি কুস্তি শিখিয়ে সফল কুস্তিগীরে পরিণত করেছেন। অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। হরিয়ানার মতো মহা পিতৃতান্ত্রিক মহা নারীবিরোধী সমাজে মহাবীরকে সকলে এক মহা নারীবাদীই ভেবে নিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মহাবীর কি তাঁর পুত্র সন্তান থাকলে কন্যাদের কুস্তিগীর বানাতে চাইতেন? উত্তর আমরা জানি, চাইতেন না। আর সব মেয়েকে যেমন অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন বাবারা, তেমনই বিয়ে দিয়ে দিতেন। মহাবীরের স্ত্রী যেমন সংসারের জন্য খেটে আর রেঁধে বেড়ে জীবন পার করেন, মহাবীরের কন্যাদেরও তাই করতে হতো। মহাবীরের পুত্ররা মহাবীরের মতো পালোয়ান হতেন। যেহেতু পুত্র নেই, অগত্যা মহাবীর তাঁর স্বপ্ন পূরণ করতেই মেয়েদের পালোয়ান বানালেন। পুত্র নিয়ে যে স্বপ্ন ছিলো তাঁর, সেই স্বপ্ন পূরণ করতে তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর মরিয়া হয়ে ওঠার ভুল অনুবাদ করেছি আমরা। আমরা ভেবে সুখ পেয়েছি মহাত্মা মহাবীর নারী পুরুষে কোনও পার্থক্য করেন না।
