সুইডেনে শরীর বিক্রি কিন্তু নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ নয় বলে দুর্ভাগা দরিদ্র মেয়েরা যারা শরীর বিক্রি করার জন্য রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে থাকে, বা এদিক—ওদিক খদ্দের খুঁজে বেড়ায়, তারা পুলিশি হেনস্থার শিকার হয় না। অপদস্থ করা তো দূরের কথা, তাদের স্পর্শ করাও অপরাধ। কিন্তু যেই না কোনো পুরুষ কোনো মেয়েকে কিনতে নেবে, অমনি ক্রেতা পুরুষের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেয়া হবে। নিরানব্বই সালে এই আইনটি জারি করার পর সুইডেনে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে পতিতাবৃত্তি। এভাবেই রোধ করা যায় এই নারী নির্যাতন ব্যবসা। অনেকের ধারণা, প্রশ্ন করা হয়, পতিতারা শরীর বিক্রি ছাড়া অন্য কী কাজ করতে পারবে? প্রথমেই মনে রাখতে হবে পতিতাবৃত্তি কোনো পেশা নয়, পতিতাবৃত্তি নির্ভেজাল যৌন ক্রীতদাসীত্ব, যৌন নির্যাতন, যৌন হেনস্থা।
ভারতের আইনে পতিতালয়ের ভেতরে মেয়েদের ওপর যৌন নির্যাতন চললে অসুবিধা নেই। পতিতালয়ের সীমানা ডিঙোলে ভদ্র পরিবেশকে কলুষিত করার দায়ে পতিতাদের লাঞ্ছিত করা হয়। যারা মূল অপরাধী, যারা নির্যাতনকারী, তাদের শাস্তি না দিয়ে, মেয়েদের, নির্যাতিতদের দেয়া হয় শাস্তি। ভারতেও যদি আজ সুইডেনের আইনের মতো শরীর ক্রয় করা নিষিদ্ধ হয়, তাহলে নারী নির্যাতনের ব্যবসা এত ফুলেফেঁপে উঠবে না। কলকাতা এবং ঢাকা শহরে নারী নির্যাতনের এই ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য কিছু সংগঠন এমনই বেপরোয়াভাবে অপরাধ করে চলেছে যে পতিতালয় ভরে ফেলেছে শিশু পতিতায়, মেয়ে পাচারকারীদের অবস্থা করেছে রমরমা, পতিতাদের স্বাস্থ্য ভালো রাখার এবং তাদের অবস্থার উন্নতি করার নামে কোটি কোটি ডলার—পাউন্ড বিদেশের সেবা সংস্থা থেকে কামিয়ে নিচ্ছে, শ্রমের মর্যাদা দিয়ে নারী নির্যাতনকে বৈধ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, মানবাধিকার সংস্থা থেকে পতিতালয়ের অবস্থা কেউ সরেজমিনে তদন্ত করতে এলে তাকে প্রাণে মারার হুমকি দিচ্ছে, পতিতাপ্রথার নির্যাতিত মেয়েদের পুনর্বাসন এবং পছন্দসই কোনো পেশা বেছে নিতে বাধা দিচ্ছে অথচ সংগঠনের নেতাদের মিষ্টি মিষ্টি কথায় দেশের লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ স্কুল শিক্ষকও এমন মজেছেন যে নারী নির্যাতন ব্যবসাকে ‘টিকে ছিল, টিকে থাকবে’ তত্ত্বে গ্রহণ তো করেইছেন, এই ব্যবসার বিস্তারের জন্য সব রকম চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। পতিতাবৃত্তিকে সম্মানজনক পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন, এবং পতিতাদের পতিতা নামে ডেকে অসম্মান করার চেয়ে ‘যৌনশ্রমিক’ নামে ডেকে সম্মান জানানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
পতিতাপ্রথাকে বৈধ করা মানে নারী নির্যাতনকে বৈধ করা। যে রাষ্ট্রে পতিতাপ্রথা বৈধ, সেই রাষ্ট্র কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। গণতন্ত্র মানবাধিকার নিশ্চিত করে, নারী—পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করে। কোনো সভ্যতা বা কোনো গণতন্ত্র মানুষের ওপর নির্যাতনকে ছলছুতোয় মেনে নেয়ার চেষ্টা করে না। করতে পারে না। যদি করে, সেই গণতন্ত্রের নাম নিতান্তই পুরুষতন্ত্র, আর সেই সভ্যতার নাম বর্বরতা ছাড়া অন্যকিছু নয়।
মেয়েদের শরীর পুরুষের চোখে
ষাটের দশকের শেষ দিকে আমি বিদ্যাময়ী ইস্কুলে পড়ি। ময়মনসিংহে শহরের সবচেয়ে নামকরা মেয়েদের ইস্কুল। হাজারো ছাত্রী, কিন্তু কেউই বোরখা পরতো না। কোনো ছাত্রী পরতো না, কোনও শিক্ষিকা পরতো না। বোরখার কোনও চলই ছিল না। খুব পর্দানশীল মৌলবী পরিবারের বয়স্ক মহিলারা বাইরে বেরোলে রিকসায় শাড়ি পেঁচিয়ে নিত। ওদেরও পরার বোরখা ছিল না। সত্তরের দশকে আমি ওই শহরেই রেসিডেন্সিয়াল মডেল ইস্কুলে পড়ি। সারা ইস্কুলে একটি মেয়েই বোরখা পরতো। তখন বোরখা কিনতে পাওয়া যেত না। পরতে চাইলে কাপড় কিনে বানিয়ে নিতে হত। মেয়েটির বোরখাও কাপড় কিনে বানিয়ে নেওয়া। তার মৌলবী-বাবা জোর করে তাকে বোরখা পরাতো। মেয়েটি আমাদের ক্লাসেই পরতো। নাম ছিল হ্যাপি। লম্বা টিংটিঙে মেয়ে।
আমিও ছিলাম হ্যাপির মতো লম্বা টিংটিঙে। হ্যাপি তার বোরখাটা ইস্কুলের গেটের কাছে এসেই খুলে ফেলতো, বোরখাটাকে বইখাতার ব্যাগে ঢুকিয়ে তবেই ইস্কুলে ঢুকতো। সে যে বোরখা পরে ইস্কুলে আসে তা কাউকে জানতে দিতে চাইতো না। কিন্তু খবরটা একদিন ঠিকই জানাজানি হয়ে যায়। জানাজানি হওয়ার পর ইস্কুলের মেয়েরা সবাই হ্যাপিকে নিয়ে হাসাহাসি করতো। হ্যাপি ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসতো বোরখা পরার লজ্জায়। সঙ্গে আবার পড়াশোনা ভালো না করার লজ্জাও ছিল। আমি ভালো ছাত্রী হলেও সবার সঙ্গেই মিশতাম। হ্যাপির সঙ্গেও।
হ্যাপি খুব অসভ্য অসভ্য গালি জানতো। ক্লাসের অন্য মেয়েরা হ্যাপির মতো অত গালি জানতো না। আমি তো আগে কোনওদিন শুনিনি ওসব গালি। হ্যাপি যখন ক্লাস নাইনে বা টেন-এ, তখন তার বাবা জোর করে তার বিয়ে দিতে চাইছিল। হ্যাপি তার হবু-স্বামীর কথা বলতো আর তার বাপ মা তুলে গালাগালাজ করতো। আমি অবাক হয়ে ওসব শুনতাম। ক্লাসের সবচেয়ে ডাকাবুকো মুখ-খারাপ মেয়ে কিনা বোরখা পরে। আর আমরা যারা কোনও গালি জানি না, আমরা যারা সরল সোজা ভালোমানুষ, তারা কোনওদিন বোরখার কথা কল্পনাও করতে জানতাম না। বোরখা একটা হাস্যকর পোশাক ছিল ষাট আর সত্তর দশক জুড়ে। দু’একজন যারা পরতে বাধ্য হতো, তারা লজ্জায় রাস্তাঘাটে মাটির সঙ্গে মিশে থাকতো।
