সারা পৃথিবীর মানুষ ধিক্কার দিচ্ছে মুসলিম সন্ত্রাসীদের। অনেক সময় দেখা যায়, দোষটা সন্ত্রাসীদের ওপর থেকে সরে গিয়ে পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ছে। নিরীহ মুসলমানরাও, যারা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়, তাদেরও মানুষ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে, ঘৃণার চোখে দেখছে। মুসলিম সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাস দেখতে দেখতে মানুষ এখন ক্লান্ত। কদিন পর পরই সন্ত্রাসের খবর আসে, মানুষের মৃত্যুর খবর আসে, ভয়ে মানুষ তটস্থ, মানুষের ক্রোধও ক্রমশ বাড়ছে। এই সন্ত্রাসীদের পক্ষে কথা বলার লোকের অভাব নেই। বিশেষ করে বামপন্থীদের বেশির ভাগই সন্ত্রাসীদের পক্ষে সওয়াল করেন। তাদের বক্তব্য, ‘পাশ্চাত্যের দেশগুলো মুসলমান বিরোধী, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, নির্বিচারে মুসলমান মারছে, ইজরাইলের অত্যাচারেও মুসলমানরা অতিষ্ঠ। সুতরাং মুসলমানদের অধিকার আছে তাদের যা খুশি করার, শরিয়া আইন বলবৎ করার, নিজেদের ইসলামী ঐতিহ্য, সংস্কার ইত্যাদি টিকিয়ে রাখার, প্রয়োজনে সন্ত্রাসী হওয়ার, প্রয়োজনে জোর জবরদস্তি করে মেয়েদের বোরখা পরাবার, মেয়েদের পাথর ছুড়ে মারার।’ নিজেদের বেলায় কড়ায় গণ্ডায় আধুনিকতা চাই, আর মুসলমানদের বেলায় মধ্যযুগ হলেই চলবে। এই তাদের বক্তব্য। বামপন্থীদের শঠতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই।
মুসলমান দেশগুলোতে তো বটেই, মুসলমান মৌলবাদীরা এখন ইউরোপেও অশান্তি করছে। রাতে রাতে লন্ডনের মুসলমান এলাকায় মৌলবাদীরা টহল দিচ্ছে। পথচারীদের আক্রমণ করছে, হুমকি দিচ্ছে। মেয়েদের পোশাক পছন্দ না হলে রীতিমত পথ আটকে অপমান করছে, বলে দিচ্ছে, এ পোশাক পরে মুসলমান এলাকায় হাঁটা চলবে না। মদের বোতল নিয়ে বা মদ খেয়ে এই রাস্তায় হাঁটা চলবে না, শাসাচ্ছে পথচারীদের। সমকামীদের এই এলাকায় ঢোকা চলবে না, কারণ এ এলাকা মুসলমান এলাকা। লন্ডনের রাস্তা দখল করে নিতে চাইছে মুসলিম মৌলবাদীরা। তারা ঠিক করে দিতে চাইছে, মানুষ কী পোশাক পরবে, কী খাবে বা পান করবে, কোন রাস্তায় হাঁটবে, কার সঙ্গে শোবে না শোবে। মুসলমান এলাকা যেন মুসলমানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। পৃথিবীর মানুষ এইসব ভিডিও দেখছে ইউটিউবে। ছিঃ ছিঃ করছে। আর ওদের ঘৃণাটা রাগটা গিয়ে পড়ছে পাশের বাড়ির নিরীহ মুসলমানের ওপর অথবা মুসলমান দোকানীর ওপর বা অফিসের মুসলমান কর্মচারীর ওপর।
শুধু রাস্তা দখল নয়, কিছুদিন আগে ধরা পড়েছে মুসলমান মৌলবাদীদের ট্রজান হর্স ষড়যন্ত্র, বার্মিংহামের ইস্কুলগুলো দখল করে নেওয়ার ষড়যন্ত্র। সেকুলার ইস্কুলগুলোকে মাদ্রাসা বানিয়ে ফেলার ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্র ধরা পড়ার পর লোকে নিন্দা করছে মৌলবাদীদের। এই রাগ গিয়ে পড়ছে মুসলমান গোষ্ঠীটার ওপর, নিরীহ মুসলমানরাও শিকার হচ্ছে লোকের সন্দেহের, অনাস্থার। এগারোই সেপ্টেম্বরে মুসলিম সন্ত্রাসীদের আমেরিকা হামলার পর কিছু লোক এতই মুসলমানবিদ্বেষী হয়ে উঠেছিল যে, কিছু শিখকে মুসলমান ভেবে গুলি করে মেরেছে। এই মৌলবাদী আর সন্ত্রাসী গোটা মুসলমান সম্প্রদায়ের যত ক্ষতি করছে, তত ক্ষতি আর কেউ করছে না। একসময় ইসলামকে যারা শান্তির ধর্ম বলে মনে করতো, তারা এখন আর মনে করছে না এটি শান্তির ধর্ম। প্রচুর মুসলমানও দিন দিন নাস্তিক হচ্ছে। সংখ্যাটা বাড়ছে। বেশ কয়েকদিন ফেসবুকের কিছু পোস্ট পড়লাম, যে কথা আমি সেই আশির দশকে বলে মৌলবাদীদের রোষানলে পড়েছিলাম, দেশান্তরী হতে হলো যে কারণে, সেইসব সাহসী কথা সগৌরবে বলছে আজকের প্রচুর তরুণ। আমার চেয়েও আরও জোরেশোরে বলছে। সব দোষ কিন্তু মৌলবাদীদের। তারাই ইসলামের সুনাম নষ্ট করছে। মৌলবাদীরা যদি তাদের ঘৃণ্য কীর্তিকলাপ বন্ধ না করে, তাহলে নাস্তিকের সংখ্যা আরও বাড়বে, সাধারণ মুসলমানরা উঠতে বসতে লোকের কাছে আরও অপদস্থ হবে।
নারীবিদ্বেষের কারণ পুরুষতন্ত্র
সান্টা বারবারায় এইতো কিছুদিন আগে বাইশ বছরের একটা ছেলে ছ’জন মানুষকে মেরে ফেলেছে, নিজেকেও মেরেছে। ঘরের মধ্যে তিনজন রুমমেটকে কুপিয়ে মেরেছে, আর বাকিদের মেরেছে ঘরের বাইরে, গুলি করে। খুনীর নাম এলিয়ট রজার। এলিয়ট রজার অনেকদিন ধরে ছক কষচিল মানুষ মারার, বিশেষ করে মেয়েদের। একশ চলি্লশ পৃষ্ঠার একটা ইস্তেহারও দীর্ঘদিন ধরে লিখেছে সে, ভিডিওও পোস্ট করেছে ইউটিউবে তার খুন করার সাধ-আহলাদ বর্ণনা করে। তার ভাষ্য হচ্ছে, বাইশ বছর বয়স, এখনও কোনও মেয়ের সঙ্গে তার সেঙ্ হয়নি, মেয়েরা তার সঙ্গে প্রেম করছে না, তার সঙ্গে শুচ্ছে না। অথচ অন্য পুরুষদের সঙ্গে দিব্যি সবই করছে। তার নিঃসঙ্গতা, তার একাকীত্ব, তার প্রেম এবং যৌনসম্পর্ক না জোটার জন্য সমস্ত দোষ সে মেয়েদের দিয়েছে, সুতরাং সব মেয়েদের সে খুন করবে, পুরুষদেরও সে খুন করবে, কারণ পুরুষগুলোই ছিনিয়ে নিয়েছে সব মেয়েদের, যে মেয়েদের পাওয়ার অধিকার তার ছিল। পুরুষ হিসেবে সে এত আকর্ষণীয়, তারপরও মেয়েরা তাকে আকর্ষণীয় বলে মনে করছে না। এর শোধ সে নেবেই নেবে।
এলিয়ট যদি সুযোগ পেতো তাহলে আরও মানুষকে সে হত্যা করতো। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে নিজের ওপর গুলি চালিয়েছে, সুতরাং তার আর মানুষ মারা হয়নি। এখন খুনীদের বেলায় যা সাধারণত খোঁজা হয়, তা হলো মানসিক অসুস্থতা আছে কি না। এলিয়টের ক্ষেত্রেও মানসিক অসুস্থতার কথা বলা হচ্ছে। মানসিক অসুস্থ রোগীটি কিন্তু তিন তিনটে বন্দুক এবং শত শত গুলি কিনে ফেলেছে যদিও ক্যালিফোর্নিয়ায় অত সহজ নয় বন্দুকের লাইসেন্স পাওয়া। পুলিশও কয়েক মাস আগে দেখে এসেছে, ছেলে নাকি রীতিমত ভদ্র, সজ্জন, আর বলা বাহুল্য, ভীষণই সুস্থ। খুন করার পরই মাথা ঠিক কী ঠিক নেই, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। মাথা ঠিক না থাকলে সাত খুন মাফ। এলিয়ট নিজেকেসহ সাতটি খুনই করেছে। আর তার ‘সাত খুন মাফ’ করার উদ্দেশে তার মানসিক ভারসাম্যহীনতাকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। ছেলেটার দোষ নেই, দোষ তার মাথার গণ্ডগোলের, সে কারণেই মানুষ মেরেছে। এরকমই বলতে চাইছে লোকে। কিন্তু মানসিক অসুস্থতার কারণে সে মানুষ খুন করেনি। মানসিক রোগীরা মানুষ খুন করে না। মানসিক রোগীরা যদি খুন করেই থাকে, তবে যত তারা খুন করে, তার চেয়ে সহস গুণ বেশি খুন করে মানসিকভাবে সুস্থ লোকেরা। ভয়টা সুস্থ লোকদের নিয়েই।
