পশ্চিমবঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তা খানিকটা কমতে শুরু করলে তিনি ঘন ঘন বাংলাদেশে যেতে থাকেন। বাংলাদেশে জনপ্রিয় হতে গেলে শুধু রুদ্রর গান গাইলেই চলে না, ভীষণ রকম তসলিমা বিরোধী হতে হয়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর সমরেশ মজুমদারের মতো এই তথ্যটি সুমনও জেনেছিলেন। আর, হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করলে তো আর কথাই নেই। সংখ্যাগুরু বাঙালি মুসলমান মাথায় তুলে নাচবে।
এই সেদিন বর্ধমানে মুসলিম মৌলবাদীদের বোমা হামলার পরিকল্পনা ধরা পড়ার পর সুমন একে বিজেপির কীর্তি বলেছেন, লোকে বলে মুসলিম মৌলবাদীদের আশ্রয়দাত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সুদৃষ্টি পাওয়ার আশায় এটি করেছেন। ক্ষমতার বড় লোভ সুমনের। টাকা পয়সারও লোভ প্রচণ্ড। অথচ কী ভীষণ আদর্শবাদী বলে ভাবতাম মানুষটাকে। এখনও অবশ্য প্রচুর লোককে বোকা বানিয়ে চলছেন। অভিনয় ভালো জানেন বলে এটি সম্ভব হচ্ছে।
এত ঘৃণা করে ওরা মেয়েদের!
মেয়েদের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কালো পর্দায় ঢেকেও শান্তি হচ্ছে না সৌদি আরবের। এখন থেকে মেয়েদের চোখও, বিশেষ করে যে চোখগুলো সুন্দর, ঢেকে রাখতে হবে। চোখ ঢাকলে মেয়েরা দেখবে কী করে! তাদের দেখার দরকার নেই। মেয়েদের দেখাটা জরুরি নয়। তারা অন্ধ হয়ে যাক। তারা খানা খন্দে পড়ুক, মরুক। অনাত্মীয় পুরুষেরা যেন মেয়েদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ না দেখে। মেয়েরা কোনও না কোনও পুরুষের সম্পত্তি। অন্যের সম্পত্তির দিকে তাকানোটা আর যেখানেই চলুক, সৌদি আরবে চলবে না।
মেয়েদের আকর্ষণীয় চোখের দিকে যদি চোখ পড়ে বাইরের পুরুষের, তবে কে হলফ করে বলতে পারে, সেই পুরুষ কামোত্তেজনায় কাতরাবে না, ধর্ষণের চেষ্টা করবে না! পুরুষেরা ধর্ষণের চেষ্টা করবে ধরে নিয়েই মেয়েদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে মেয়েদের। এরকম মনে করার কিন্তু কোনও কারণ নেই যে মেয়েদের স্বার্থে মেয়েদের ধর্ষণ থেকে বাঁচানো হচ্ছে। মেয়েরা যেহেতু কোনও না কোনও পুরুষের সম্পত্তি, অথবা হবু সম্পত্তি, তাই পুরুষের স্বার্থেই পুরুষের সম্পত্তিকে ধর্ষণ থেকে বাঁচানো হচ্ছে। পুরুষেরা চায় না তাদের সম্পত্তির গায়ে কোনও দাগ লাগুক। এ কারণে শরীর তো বটেই, মেয়েদের চোখও ঢেকে রাখার ব্যবস্থা হচ্ছে। তাদের কোনও কিছু দেখার অধিকার আর নেই। চোখ থাকতেও অন্ধত্বকে বরণ করে নিতে তারা বাধ্য হচ্ছে।
অথচ, অবাক কাণ্ড, ধর্ষণের চেষ্টা যারা করবে বলে আশংকা করা হচ্ছে, তাদের দমনের, তাদের শোধরানোর, তাদের পরামর্শ দেওয়ার কিন্তু কোনও ব্যবস্থা সৌদি আরবে নেই।
আমার প্রশ্ন, পুরুষেরা কামোত্তেজনায় কাতরালেই বা অসুবিধে কী! উত্তেজনা সামলানোর ক্ষমতা কি সৌদি পুরুষের নেই? যদি না থাকে, তবে ওদের শেখানো হোক কী করে তা সামলাতে হয়। শিখলে মেয়েরা অন্তত চোখ খুলে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে পারবে। খানা খন্দে পড়তে হবে না, মরতে হবে না। নীতিপুলিশের জ্বালায় মেয়েরা বাধ্য হচ্ছে আস্ত এক একটা কালো কফিনের মধ্যে ঢুকে যেতে। চোখগুলোকেও এখন থেকে বোরখা পরাতে হবে নয়তো জেল খাটতে হবে। নীতিপুলিশকে পুষছে কিন্তু সৌদির রাজ পরিবার। এই ক’মাস আগেই নাকি নীতিপুলিশদের সংস্থা রাজপরিবার থেকে তিপ্পান্ন মিলিয়ন ডলার উপহার পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র কি কখনও সৌদি আরবের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কথা বলেছে? কেউ শুনিনি। সৌদি আরবের কাছে যুক্তরাষ্ট্র এখন অস্ত্র বিক্রি করছে। ষাট বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র। ছোটখাটো কোনও অংক নয় কিন্তু। তো এই সময় যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে কি পারতো না বলতে যে তোমরা মেয়েদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করো, তারপর অস্ত্রের বেচা কেনা হবে? সৌদি আরবের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মুখ খোলে না, কিন্তু নানা দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে ভীষণই উদ্বিগ্ন, চেঁচিয়ে সর্বনাশ করছে, সাবধান করে দিচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশকেই। শুধু সেই দেশটিকেই সাবধান করছে না, যে দেশটি মেয়েদের মানবাধিকার সবচেয়ে বেশি লংঘন করছে। এর একটিই হয়তো কারণ, এমন বিলিয়ন ডলারের খদ্দেরকে যুক্তরাষ্ট্র অখুশি করতে চায় না। দিনের শেষে টাকার হিসেবটাই দেখছি আসল হিসেব।
সৌদি আরব মেয়েদের মানুষ বলে মনে করে না। ধর্ষিতা হওয়ার শাস্তি ধর্ষিতাকেই দেয়। আত্মীয়-পুরুষ ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে কোনও মেয়ের কথা বলা, চলা ফেরা বারণ। স্বামীর অনুমতি ছাড়া মেয়েদের ঘরের চৌকাঠ পেরোনোও নিষেধ। বৈষম্যের সহস্র শৃংখলে বন্দি নারী। নারী হয়ে জন্ম নিয়েছে বলেই ভুগতে হচ্ছে বর্বর পুরুষের এই পৃথিবীতে। ধর্ম আর পুরুষতন্ত্রের শাসন সৌদি আরবে। পুরুষেরই দাপট সে দেশে। সুতরাং যদি আদৌ কারোর ক্ষমতা থাকে সৌদি মেয়েদের দুর্দশা দূর করার, পরাধীনতার গহ্বর থেকে তাদের উদ্ধার করার, সে নিঃসন্দেহে সৌদি পুরুষের। মেয়েদের বিরুদ্ধে সৌদি আইনের প্রতিবাদ করতে এ পর্যন্ত খুব বেশি সৌদি পুরুষকে অবশ্য দেখা যায়নি।
মন্দ কাজ বন্ধ করার একটা কমিটি আছে সৌদি আরবে, সেই কমিটির লোকেরাই বলেছে তারা মেয়েদের হাতছানি দেওয়া চোখ নিষিদ্ধ করেছে। কোন চোখ হাতছানি দেয়, কী করে বুঝবো! যে চোখে কাজল, সেই চোখ তো বটেই, তার ওপর চোখের আকার আকৃতি ভালো, এমন চোখও পাপের চোখ, হাতছানির চোখ। চোখ সুন্দর হলেও কোনও ক্ষমা নেই, সে চোখ নিষিদ্ধ। আর যে চোখে কাজল নেই! কাজল না থাকলেও সে চোখ নিষিদ্ধ হতে পারে, শুধু দেখতে ভালো হওয়ার অপরাধে।
মেয়েদের বিরুদ্ধে এই আইনটিকে ইতিমধ্যে একশ ভাগ সমর্থন করেছেন সৌদি রাজপুত্র নাইফ। এই আইনটি এমনই এক বর্বর নারীবিরোধী আইন, এই আইনে যে-কোনও মেয়েকে যখন তখন দোষী সাব্যস্ত করা যায়, জেলে পাঠানো যায়, চাবুক মারা যায়। যেন এ মেয়েদের অপরাধ তারা মেয়ে। যেন এ মেয়েদের অপরাধ তাদের চুল চোখ মুখ আছে, যেন এ তাদের অপরাধ তাদের বুক পেট তলপেট আছে, তাদের পা আছে, পায়ের পাতা আছে। যেন মেয়েরা মানুষ নয়, মেয়েরা এক শরীর পাপ। এই পাপকে, এই লজ্জাকে ঢেকেঢুকে অপরাধীর মতো বাঁচতে হবে, যদি বাঁচতেই হয়। কমিটির লোকেরা দুনিয়ার মুসলিমদের কাছে আবেদন করেছেন, নতুন আইনটিকে সকলেই যেন সমর্থন করে, যেহেতু এই আইন ইসলামের আইন। ইসলামের প্রশ্নে দ্বিমত করে, সাধ্য কার!
‘যৌন উত্তেজনা বেড়েছে তোমার, সে তোমার সমস্যা, আমার নয়। তোমার সেটি বাড়ে বলে আমার নাক চোখ মুখ সব বন্ধ করে দেবে, এ হতে পারে না। আমি তোমার ব্যক্তগত সম্পত্তি নই যে তুমি আমাকে আদেশ দেবে আমি কী পরবো, কীভাবে পরবো, কোথায় যাবো, কতদূর যাবো। তোমার সমস্যার সমাধান তুমি করো। আমাকে তার দায় নিতে হবে কেন! যৌন উত্তেজনা আমারও আছে, সে কারণে তোমার নাক চোখ মুখ ঢেকে রাখার দাবি আমি করিনি। আমার ইচ্ছে হলে আমি চোখে কাজল পরবো, কাজল কালো চোখ দেখলে যদি তোমার সমস্যা হয়, তাহলে আমারে চোখের দিকে তাকিও না। যদি তারপরও চোখ চলে যায় মেয়েদের চোখের দিকে, আর তোমার ঈমানদণ্ড নিয়ে তুমি বিষম মুশকিলে পরো, তাহলে শক্ত করে নিজের চোখদুটো বেঁধে রাখো কালো কাপড় দিয়ে। এর চেয়ে ভালো সমাধান আর হয় না। তোমাকে উত্তেজিত করে এমন জিনিস তোমাকে দেখতে হবেনা। তুমিও বাঁচবে, আমিও বাঁচবো।‘ — জানিনা সৌদি মেয়েরা কবে বলবে এমন কথা।
আজ সারা বিশ্ব হাসছে সৌদি আরবের কাণ্ড দেখে। নামতে নামতে তারা কত নিচে নেমেছে! মেয়েদের সর্বাঙ্গ নিষিদ্ধ করেছে, এমনকী চোখও। এত ঘৃণা করে ওরা মেয়েদের! বুঝিনা সব মেয়েকে কেন আজও তারা মেরে ফেলছে না! কেন জ্যান্ত কবর দিচ্ছে না, কেন দূর করে দিচ্ছে না দেশ থেকে! কেন এত ঘৃণার পরও মেয়েদের বাঁচিয়ে রাখছে। সম্ভবত বাঁচিয়ে রাখছে একটিই কারণে, পুরুষেরা যেন ওদের ভোগ করতে পারে, সম্পত্তির ওপর অধিকার আছে তো মালিকের।
চুমু চুমু চুমু চুমু
চুমুর মতো চমৎকার জিনিস আর হয় না। দিন দুপুরে চুমু খাব, প্রকাশ্যে খাব, একশ লোককে দেখিয়ে খাব — এরকম একটি ‘আমার চুমু আমি খাবো, যেথায় খুশি সেথায় খাবো’ আন্দোলন চলছে এখন ভারতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা স্লোগান দিচ্ছে ‘চুমু চুমু চুমু চাই, চুমু খেয়ে বাঁচতে চাই’, ‘আমার শরীর আমার মন, দূর হঠো রাজশাসন’। কেরালার রাস্তায় চুমু খেয়েছিল বলে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল তরুণ তরুণীকে, মিনিস্কার্ট পরেছিল বলে কলকাতার স্টার থিয়েটারে এক মেয়েকে ঢুকতে দিল না। মূলত নীতিপুলিশির প্রতিবাদেই ছেলেমেয়েরা চুমু খাচ্ছে। এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটছে রাজ্যে রাজ্যে। রাস্তায়-নদীর পাড়ে-লেকের ধারে-পার্কে তরুণ তরুণীদের ঘনিষ্ঠ হতে দেখলেই নাকি পুলিশ এসে ঝামেলা করে। প্রেম করা যেন অন্যায়। জনসমক্ষে হাত ধরে হাঁটা, আলিঙ্গণ করা, চুমু খাওয়া–এসব নাকি অশ্লীল। যৌনতাও নাকি অশ্লীল! ভায়োলেন্স কি অশ্লীল? আমার মনে হয় না কেউ সিরিয়াসলি বিশ্বাস করে ভায়োলেন্স অশ্লীল।
রাস্তা ঘাটে মানুষকে অসম্মান করো, অকথ্য ভাষায় গালি দাও, যৌন হেনস্থা কর, মারো, গরিব পকেটমারকে সবাই মিলে পিটিয়ে মেরে ফেলো, কোনও দৃশ্যই কারো কাছে খুব একটা অশ্লীল ঠেকে না। রাস্তায় মানুষ পানের পিক ফেলছে, কফ সর্দি ফেলছে, মলমুত্র ত্যাগ করছে –এসবে কেউ আপত্তি করছে না। মানুষ না খেতে পেয়ে, চিকিৎসার অভাবে মরে পরে আছে রাস্তায়–সেসব দৃশ্য কারও কাছে আপত্তিকর নয়। কিন্তু আপত্তিকর দৃশ্য যখন তুমি ভালোবেসে কারো হাত স্পর্শ করছো, ভালোবেসে কারো ঠোঁটে চুমু খাচ্ছো। ভালবাসাটা অপরাধ। ভালোবাসাটা অপরাধ বলেই চারদিকে আজ ঘৃণার জয়জয়কার।
মনে আছে বীটল্সের জন লেনন কী করে ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদ করেছিলেন? বউ ইয়োকো ওনোকে নিয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে পুরো জগতকে দেখিয়ে ঘোষনা দিয়েছিলেন: যৌন সঙ্গম করো, যুদ্ধ করো না, মেইক লাভ, নো ওয়ার। হিংসে আর ঘৃণার রাজনীতিতে যারা বিশ্বাস করে, তারা যৌন সঙ্গমের চেয়ে যুদ্ধকেই পছন্দ করে বেশি। অবাক লাগে ভাবতে যে বাংলার লেখক সাহিত্যিকরা এই একবিংশ শতাব্দিতে বিশ্বাস করেন চুমুটা ঘরের বাইরে খাওয়া উচিত নয়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘এটা কোনো প্রতিবাদ এর ভাষা হতে পারে না। কুরুচির পরিচয় ছাড়া আর কিছু নয়। কেরালায় চুম্বন করে প্রতিবাদ হয়েছে বলে কলকাতায় করতে হবে তার মানে নেই…’। পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব ব্রাত্য বসু বলেছেন, ‘তাদের অভিভাবকেরা যদি চুমু খেতে চান, ছাত্র ছাত্রীরা মানবে তো?’ নীতি পুলিশ সর্বত্র। এমনকী বুদ্ধিজীবি মহলেও।
আমি তো মাঝে মাঝেই বলি, যৌনসঙ্গম কেবল চারদেওয়ালের বন্ধ ঘরে হতে হবে কেন! প্রকৃতির কাছে যাও, পূর্ণিমার রাতগুলোয় নির্জন বনে চলে যাও, নীরব সৈকতে চলে যাও, ভালোবেসে চুমু খাও, শরীরে শরীর মেলাও। আমরা তো প্রকৃতির সন্তান। জগত দেখুক, আমরা ভালবাসছি। আকাশ দেখুক, জুঁইফুল দেখুক। আমার পাশ্চাত্যের বন্ধুরা এসবে অভ্যস্ত হলেও প্রাচ্যের বন্ধুরা নয়। তাদের কাছে এখনও শরীর–বিশেষ করে মেয়েদের শরীর– অশ্লীল, এখনও যৌনতা অশ্লীল। প্রথম যখন ইওরোপে গেছি, অবাক হয়ে সম্পূর্ণ বা প্রায়-উলঙ্গ নারীপুরুষকে দেখেছি সমুদ্রের ধারে শুয়ে সূর্যস্নান করতে, শরীর যে সুন্দর, শরীর যে অশ্লীল নয়, তা সম্ভবত তখনই আমি আবিস্কার করি। যখন দেখি দুজন মানুষ গভীর চুম্বনে মগ্ন, বুঝি যে চুমুর জন্য চারদেওয়ালের প্রয়োজন নেই। চুমু খোলা আকাশের নিচেও বড় সুন্দর, বড় সুস্বাদু। চুমুর স্বাদ ঘরে বাইরে আসলে একই। তবে ইচ্ছে হচ্ছে চুমু খেতে, লোকে কী বলবে বলে চুমু খেতে পারছি না, এই অবদমনের কষ্ট বড় সাংঘাতিক। আমার জীবনে প্রেমিক খুব বেশি কেউ ছিল না। তবে প্যারিস শহরের বাগানে, রাস্তায়, গাড়িতে, সিনেমায়, ক্যাফেতে যখন খুশি চুমু খেয়েছি আমার এক প্রেমিককে। গালে গালে শুকনো চুমুর কথা বলছি না। বলছি ঠোঁটের জিভের মুখগহবরের গভীর দীর্ঘ চুম্বনের কথা। চুমু ছাড়া জীবনকে আমার খুব শুকনো শুকনো লাগতো।
খুব ভালো লাগে যখন দেখি মানুষ মানুষকে ভালোবাসছে। হিংসুকরা সহ্য করতে পারে না অন্যের ভালোবাসা। হিংসুকেরা মানুষে মানুষে ঘৃণা দেখে আরাম বোধ করে। যারা প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার বিরোধী, এবং যারা পক্ষপাতী, লক্ষ করেছি, দু’পক্ষই পুরুষতন্ত্রকে দোষ দিচ্ছে। প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া মানে নারীকে পণ্য করা, এ পুরুষতন্ত্রের কারসাজি। আবার প্রকাশ্যে চুমু খেতে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্য নারীকে ঘরবন্দী রাখা, নারীর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যাওয়া, এও পুরুষতন্ত্রের কারসাজি। আমি পুরুষতন্ত্রের আলোচনায় যাচ্ছি না। আমি নিতান্তই শরীরের পক্ষে যাচ্ছি। প্রেমের পক্ষে যাচ্ছি। নারী পুরুষের প্রেম, বা নারী নারীর প্রেম, বা পুরুষ পুরুষের প্রেম— সব প্রেমকেই মেনে নিয়ে, সব প্রেমের প্রকাশকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমি রাস্তা ঘাটে দেখতে চাই না কেউ মরে পড়ে আছে, কেউ ধুকছে, কেউ মার খাচ্ছে, কেউ মারছে কাউকে, অপমান করছে, জ্বালাচ্ছে, হেনস্থা করছে, ধর্ষণ করছে। আমি দেখতে চাই মানুষ মানুষকে ভালোবাসছে। মানুষ মানুষকে চুমু খাচ্ছে। এমনকী আমি দেখলে খুশি হবো যে মানুষ ভালোবেসে যৌন সঙ্গম করছে। যৌন সঙ্গম যুদ্ধের চেয়ে, দুর্ভিক্ষের চেয়ে, মৃত্যুর চেয়ে, দৃশ্য হিসেবে অনেক সুন্দর, অনেক পবিত্র।
রেলমন্ত্রীর বয়স এবং বিয়ে
সেদিন টুইটারে লিখেছিলাম আমার বয়ফ্রেন্ড আমার চেয়ে কুড়ি বছরের ছোট। খবরটা লুফে নিলো মিডিয়া। অথচ কত খবরই তো দিই টুইটারে, আমার পুরস্কার পাওয়ার খবর, অনারারি ডকটোরেট পাওয়ার খবর, আমার কীনোট স্পীচ দেওয়ার খবর, আমার স্ট্যাণ্ডিং ওভেশন পাওয়ার খবর। এসব খবরে মিডিয়ার উৎসাহ নেই মোটেও। আমার প্রেমিক এবং স্বামী নিয়ে মিডিয়ার উৎসাহ বরাবরই অবশ্য প্রবল। যাই হোক, যা বলছিলাম। আমার চেয়ে কুড়ি বছরের ছোট প্রেমিকের খবরখানা টুইটারে দিয়ে একধরণের পুলক বোধ করছিলাম। পুরুষের মতো কোনও আচরণ করা মেয়েদের মানায় না। তাই পুরুষের মতো আচরণ করে, বয়সে ছোট এক সঙ্গী নির্বাচন করে, দেখতে চাইছিলাম সমাজ কী বলে। যথারীতি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো।
