১০. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আপনি যে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন, তাতে বাঙালির আবেগ ধাক্কা খাবে জেনেও আপনি ঝুঁকি নিয়েছেন। এতদিন বাদে এই অভিযোগ করা কি খুব জরুরি ছিল?
উত্তর : বাঙালির আবেগে ধাক্কা না দেওয়ার দায়িত্বটা আমাকে কে দিয়েছে? যে-ই দিক, কারও আবেগ বাঁচিয়ে চলা আমার কাজ নয়। বিশেষ করে সেই আবেগ, যে আবেগ সত্য শুনতে রাজি নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কিছুদিন ধরেই বলছিলেন, উনি নাকি বই ব্যানের বিরুদ্ধে। এটি সত্য নয়। আমার দ্বিখণ্ডিত ব্যান করার জন্য ২০০৩ সালে উনি অনেক লেখালেখি করেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, আমি সবিনয়ে তার ভুল ধরিয়ে দিলাম। তখনই কথায় কথায় ওই প্রসঙ্গ উঠলো, যৌন হয়রানিতে আমাকেও যে বাদ দেননি সেটা। শহরের সাহিত্য জগতে শুনেছি অনেকেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অনেক কথাই জানে, কিন্তু সবাই নাকি চেপে যায়। কারণ উনি খুব নামী দামী মানুষ। নামী দামী মানুষেরা অন্যায় করলেও সেটাকে অন্যায় হিসেবে দেখতে নেই। আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তো অহরহই বলছেই, ‘পুরুষমানুষ তো, ওরকম তো একটু করবেই’। কিন্তু ওরকম করাটা যদি না মানি? তবে দোষটা আমার। পুরুষমানুষের অন্যায় করাটা অন্যায় নয়, তার অন্যায় না মানাটা আমার অন্যায়। এই সমাজের নামী দামী কারও বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করা মানে নিজেকে জেনে বুঝে শূলে চড়ানো।
এতদিন বাদে অভিযোগ করেছি কেন? ঠিক কতদিন বাদে অভিযোগ করলে সেটা ঠিক, আর কতদিন বাদে করলে বেঠিক, শুনি? আমি কি বাপু কোর্টে গিয়ে পিনাইল-ভ্যাজাইনাল-ধর্ষণের অভিযোগ করেছি যে আমাকে খুব দ্রুত অভিযোগটা করতে হবে কারণ ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য তৈরি থাকতে হবে, কিছুদিন বাদে হলে যে পরীক্ষাটা সম্ভব নয়? আমার বিনা অনুমতিতে আমাকে জাপটে ধরে আমার বুক খামচে ধরলেও তো যৌন হয়রানি হয়, নাকি হয় না? বিচ্ছিরি ঘটনাটা পুষে ছিলাম অনেকগুলো বছর। কোর্টেও যাইনি, কাগজেও যাইনি। সেদিন বই ব্যান নিয়ে ওই অনর্গল মিথ্যেটা যদি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় না বলতেন, তাহলে হয়তো হয়রানির কথাটা বলাই হতো না কখনও। কিছু লেখায় দুঃখ করে যেটুকু লিখেছিলাম, সেটুকুই থাকতো। এখন মনে হয়, বলে ভালোই করেছি। কোনও অস্বস্তি মনের মধ্যে পুষে রাখা ঠিক নয়। মহামানবের সম্মান পান, আর তলে তলে যে ওই কীর্তিগুলো ঘটান, তা জানুক মানুষ। মেয়েরা এবার মুখ খুলুক, অনেক তো মুখ বুজে থাকা হলো, আর কত! বাংলাদেশের এক লম্পটের মুখোশ উন্মোচন করেছিলাম বলে সারা দেশ আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করেছে, পশ্চিমবঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছে। যেন সুনীল সম্পর্কে আমি একটি অক্ষর বানিয়ে বলেছি! যে হয়রানির শিকার হয়েছে, তাকে অসম্মান করে, অপমান করে, যে হয়রানি করেছে তাকে মাথায় তুলে সম্মান দেখিয়ে এরা আবারও প্রমাণ করেছে যে এরা কতটা নীচ, কতটা অসভ্য, কতটা নারীবিদ্বেষী!
শুনেছি বাদল বসু ‘বইয়ের দেশ’-এ সুনীলকে মহামানব হিসেবে বর্ণনা করতে গিয়ে আমাকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগালি করেছেন, আমার সম্পর্কে বস্তা বস্তা মিথ্যে ঢেলেছেন। সুনীলের প্রশংসা করতে গেলে তাঁর লেখা নিয়ে কথা বলুন, তাঁর জীবনের ভালো ভালো দিক নিয়ে কথা বলুন, তাতেই তো তাঁকে বড় করা যায়। আমাকে ছোট করে তাঁকে বড় করতে হবে কেন? এত ছলচাতুরী আর মিথ্যের আশ্রয় নিতে হবে কেন? বাদল বসু সুনীলকে আমার চেয়েও বেশি চেনেন। হেনস্থা হয়রানির খবর তাঁর অজানা নয়। কিন্তু পুরুষ পুরুষেরই পক্ষ নেবে। যত বড় লেখকই হই না কেন, আমি তখন কেবলই ‘মেয়েমানুষ’। ‘মেয়েমানুষ’ মুখ খুললে ওঁরা সকলেই খুব রাগ করেন।
১১. এতটা জনপ্রিয়তা আপনার প্রাপ্য ছিল না। মৌলবাদীরা আপনাকে জনপ্রিয় করেছে। কী বলবেন?
উত্তর : একেবারে উল্টো। আমি খুব জনপ্রিয় লেখক ছিলাম বলে মৌলবাদীরা আমার কলম কেড়ে নিতে চেয়েছে বা আমার লেখাকে বন্ধ করতে চেয়েছে বা আমাকে প্রাণে মেরে ফেলতে চেয়েছে। অজনপ্রিয় অনামী লেখককে নিয়ে ওরা মাথা ঘামায় না। ভয় জনপ্রিয় লেখককে, যদি সে লেখক মৌলবাদবিরোধী লেখা লেখে, যে দুটো পিলার মৌলবাদীরা সজোরে অাঁকড়ে ধরে রাখে, ধর্ম আর পুরুষতন্ত্র, সে দুটোতে যদি ফাটল ধরিয়ে দেওয়ার মতো আঘাত করতে থাকে লেখা দিয়ে। আমি যখন বিরানব্বই সালে প্রথম আনন্দ পুরস্কার পাই, তখনও মৌলবাদীরা আমার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেনি বা ফতোয়া জারি করেনি। এর দেড় দুবছর পর করেছে। দেশে বিদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছি, এ তাদের আর সয়নি। মৌলবাদীদের কারণে আমার জনপ্রিয়তা শুধু নষ্টই হয়নি, বরং আকাশ থেকে পাতালে নেমেছে। ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে, আমাকে দেশ থেকে তাড়িয়েছে, আর ওদিকে আমাকে তাড়িয়েও মৌলবাদীরা শান্ত হয়নি, তাদের অসংখ্য প্রচার মিডিয়া নিরন্তর ব্যস্ত থেকেছে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে কুৎসা রটাতে, আমার প্রতি মানুষের ঘৃণার উদ্রেক করতে, মানুষের মন থেকে আমাকে মুছে ফেলতে, আমার বই-পাঠ থেকে পাঠককে বিরত রাখতে। বছরের পর বছর ওরা মগজধোলাই করেছে সাধারণ মানুষের। আমি নাকি বিজেপির টাকা নিয়ে লজ্জা লিখেছি। আমার নাকি চরিত্র ভালো নয়। একটা অল্প শিক্ষিত, ধর্মভীরু, কুসংস্কারাচ্ছন্ন নারীবিরোধী সমাজে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার জাদুর মতো কাজ করেছে। এক এক করে আমার বই নিষিদ্ধ হয়েছে। প্রকাশকেরা বই প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছে। পত্র পত্রিকা আমার লেখা ছাপানো বন্ধ করে দিয়েছে। যে লেখক সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নন্দিত লেখক ছিল বাংলাদেশে, কেবল মৌলবাদী, ধর্মবাদী, নারীবিরোধী পুরুষতান্ত্রিকদের অপপ্রচারে সে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই একটা নিন্দিত আর নিষিদ্ধ বস্তুতে পরিণত হলো। এত বিরোধিতা, এক বিদ্বেষ, এত আক্রমণ, এত নিন্দা, এত কুৎসা, এত অপপ্রচার, এত নিষ্ঠুরতা, এত অসভ্যতা, এত রূঢ়তা, এত অন্যায়, এত অবিচার আমার প্রাপ্য ছিল না।
