ধর্মীয় বিশ্বাসের বেলায় অন্ধত্বের প্রয়োজন! অনভিজ্ঞ শিশুরা তাই ধর্ম বিশ্বাসের জন্য চমৎকার। চোখ খুলে যাওয়া লোক ধর্মের রূপকথাকে সহজে মেনে নেয় না। যদি ধর্ম দিয়ে শিশুদের মগজধোলাই আজ থেকে বন্ধ হয়, তবে ধর্ম জিনিসটা বিলুপ্ত হতে খুব বেশি দশকের দরকার হবে না।
যখন ধর্মের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবছি, তখন হিন্দু মৌলবাদীরা মুসলিমদের অনুকরণ করতে ব্যস্ত। দায়িত্ব নিয়েই বলছি, হিন্দু মৌলবাদীরা মুসলিম মৌলবাদীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলছে। মুসলিমরা ভায়োলেন্স করে, সুতরাং হিন্দুরাও করবে। মুসলিমরা বিধর্মীদের ধর্মান্তরিত করে, সুতরাং হিন্দুদেরও তা করতে হবে। মৌলবাদীতে মৌলবাদীতে আসলে খুব একটা পার্থক্য নেই। সব মৌলবাদীর একটিই ধর্ম, একটিই মন্ত্র : সমাজকে নষ্ট করো।
শুনছি ধর্মান্তরণ বিরোধী একটি আইন নাকি জারি হবে। এ আবার বাড়াবাড়ি। জীবনের অন্য যে কোনও বিশ্বাসই পরিবর্তন করার অধিকার মানুষের থাকবে, শুধু ধর্ম পরিবর্তন করার অধিকার থাকবে না। এর কোনও মানে হয়? কোনও একটা নির্দিষ্ট ধর্মের খাঁচায় মানুষকে বন্দি করে রাখা রীতিমত অন্যায়। সংবিধানে যদি গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের কথা লেখা থাকে, তবে ধর্মান্তরণ বিরোধী আইনটি আইনত জারি করা যায় না। আমি বুঝি না এত ভয় কেন ধর্মের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নিয়ে? ধর্মকে কি কোনও শক্তি দিয়ে আঁকড়ে রাখা যায়! কখনও রাখা গেছে? সুমেরীয়, মেসোপটেমীয়, মিশরীয়, গ্রীক, রোমান, ভাইকিং ইত্যাদি কত দাপুটে ধর্ম মরে ছাই হয়ে গেছে। আজকের হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম,ইসলামও একদিন মরবে। প্রকৃতির কাছে প্রার্থণা করি, তখন মিথ্যে, অবিজ্ঞান আর কুসংস্কারনির্ভর নতুন কোনও ধর্ম যেন এই পৃথিবীকে আর না জ্বালাতে আসে।
মানবতন্ত্র বেঁচে থাকুক। কোনও ধর্ম মানব সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখবে না। মানুষের প্রতি মানুষের মমতাই মানবসভ্যতাকে বাঁচাবে। মানুষের মুক্তচিন্তা, কুসংস্কারমুক্তি, বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবুদ্ধিই মানুষকে বাঁচাবে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি ব্যক্তিগত চিঠি
মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা,
অচেনা মানুষ হিসেবে এই চিঠি আপনাকে লিখছি না। আমাকে চেনেন আপনি। দেশে থাকাকালীন বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছিল আপনার সঙ্গে। তখন, নব্বই-একানব্বই সালে আপনাকে শুভাকাঙ্খী হিসেবেই আমি বিশ্বাস করতাম। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে মৌলবাদীদের মিছিল হওয়া, আমার মাথার দাম ঘোষণা হওয়া, লোকের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করেছি এই অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে খালেদা-সরকারের মামলা করা, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া, দেশ ত্যাগ করতে আমাকে বাধ্য করার পর আমি অপেক্ষা করতাম আপনি কবে প্রধানমন্ত্রী হবেন। আমি ভাবতাম আপনি প্রধানমন্ত্রী হলেই আমি দেশে ফিরতে পারবো। ঠিকই একদিন আপনি প্রধানমন্ত্রী হলেন। আমি অধীর আগ্রহে আপনার দিকে তাকিয়ে আছি, কিন্তু দেশে তো আমাকে ঢুকতে দিলেনই না, উল্টে ভয়ংকর একটি কাজ করলেন। নামে আমার আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘আমার মেয়েবেলা’ নিষিদ্ধ করলেন। নিষিদ্ধ করার কারণ, আপনি জানালেন, বইটি অশ্লীল। আমার মেয়েবেলা আমার শৈশবের কাহিনী। এটিকে আপনি ছাড়া আর কেউ অশ্লীল বলেনি। বিদেশের অনেক ভাষায় বইটি ছাপা হয়েছে। গ্রন্থ-সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে, পাঠকপ্রিয়তাও প্রচুর পেয়েছে, এমনকী বইটি বাংলা ভাষার অন্যতম একটি সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছে। বইটি আজও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। সাধারণত যেসব সরকার মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তারা বই নিষিদ্ধ করে। তখন বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মানুষেরা সেইসব সরকারের বই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মামলা করে। গণতান্ত্রিক দেশে মানুষ তাই করে। কিন্তু বাংলাদেশের গণতন্ত্র এমনই অদ্ভুত যে, আমার বই থেকে নিষিদ্ধকরণ তুলে নেওয়ার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস কারওর নেই। নাৎসিরা যখন বই পোড়াতো, তাদের বই পোড়ানোয় কেউ বাধা দিতে পারতো না। নাৎসি সরকারের বিরুদ্ধে কারও বুকের পাটা ছিল না মামলা করে। কিন্তু আপনি তো নাৎসি সরকার নন, কেন মানুষ আপনার সরকারকে ভয় পায়!
আপনি সম্ভবত বই নিষিদ্ধ করাটা শিখেছেন খালেদা জিয়ার কাছে। আপনি বই নিষিদ্ধ করার আগে খালেদা জিয়া আমার ‘লজ্জা’ বইটি নিষিদ্ধ করেছিলেন। খালেদা জিয়ার মতো আপনিও আমার বই পড়ার অধিকার থেকে বাংলাদেশের পাঠকদের বঞ্চিত করছেন। আপনি ‘আমার মেয়েবেলা’ বইটি নিষিদ্ধ করার পর খালেদা জিয়াও ক্ষমতায় এসে পরম উৎসাহে আমার আত্মজীবনী সিরিজের অনেকগুলো বই পর পর নিষিদ্ধ করলেন। লক্ষ করার বিষয় যে, অন্য কারও বই নিষিদ্ধ করলে সরকারকে সামান্য হলেও ঝামেলা পোহাতে হয়। অন্যরা মামলা করে, হাইকোর্ট থেকে বইকে মুক্ত করিয়ে আনে। কিন্তু আমার বই নিষিদ্ধ করলে আপনাদের কোনও ঝামেলা পোহাতে হয় না। এই একটি মানুষ যাকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা যায়, যাকে অকারণে অপবাদ দেওয়া যায়, যাকে যত খুশি অসম্মান করা যায়, জঘন্য অপমান করা যায়—নিশ্চিত, কেউ টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করবে না। আমার বেলায় দেশের অমৌলবাদীরাও মুহূর্তে মৌলবাদী হয়ে ওঠে। আমাকে কখনও আর দেশে ফিরতে না দিলেও, আপনি ভালো জানেন, খালেদা জিয়াও জানেন, আপনাদের কোনও অসুবিধে হবে না, আপনাদের জনপ্রিয়তায় কোনও আঁচড় পড়বে না।
