বাংলাদেশে অনেক বছর আগে একটি ঘটনা ঘটেছিল। ইয়াসমিন নামের এক মেয়ে, পনেরো বছর বয়স, ঢাকা শহরের কোনও এক মধ্যবিত্তের বাড়িতে কাজ করতো। কিন্তু বাড়ির কর্তাটি ইয়াসমিনকে রাতে রাতে ধর্ষণ করতো। ইয়াসমিন একরাতে পালালো বাড়ি থেকে। যাচ্ছে সে বাপের বাড়ির দিকে। পথে পুলিশ ধরলো। ‘কোথায় যাচ্ছিস’? ‘বাপের বাড়ি’। ‘বাড়ি তো অনেক দূর, চল তোকে পৌঁছে দিই, গাড়িতে ওঠ। ’ পুলিশের গাড়ি অন্ধকার নির্জনতায় থামলো। ওখানে সাত সাতটা পুলিশ ইয়াসমিনকে মনের আশ মিটিয়ে ধর্ষণ করে, ধর্ষণ শেষে গলা টিপে মেরে ফেলে রাখলো আবর্জনার স্তূপে। এলাকার লোকেরা পরদিন মিছিল বের করলো পুলিশের বিরুদ্ধে। সেই মিছিলে গুলি ছুড়লো পুলিশ, সাতজন গ্রামবাসীর মৃত্যু হলো। পরদিন সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি ছিল এরকম, ‘ইয়াসমিন ছিল নষ্ট চরিত্রের মেয়ে, পুলিশ যা করেছে ঠিকই করেছে। ’ এরকম ঘটনা কি শুধু বাংলাদেশেই ঘটে? অন্য কোথাও ঘটে না? আমরা সবাই জানি, ঘটে। রক্ষক সারাক্ষণই ভক্ষক হচ্ছে। হবে না কেন! নারী-ভক্ষণ তো কোনও অন্যায় নয়! কোথায় লেখা আছে অন্যায়! নারী তো ভোগ্য, ভোজ্য, ভক্ষণীয়। এ কথা সকলেই জানে, মানে। পুরোহিত থেকে শুরু করে পাঁচ বছরী পুত্র জানে যে পুরুষ সর্বশক্তিমান। এবং তাদের সর্বময় অধিকার যেমন খুশি নারীকে দলন করা, দমন করা, সর্বময় অধিকার যখন খুশি ধর্ষণ করা, জ্বালিয়ে মারা, পুড়িয়ে মারা। এই জানা মানাটি যেদিন বন্ধ হবে, সেদিনই হয়তো চিরতরে দুঃসময়ের সরে যাবার সময় হবে। নারীকে সম্মান জানানোর রেওয়াজ এই সমাজে নেই। সম্মানের যে সংজ্ঞা পুরুষেরা তৈরি করেছে, তাতে অসম্মান ছাড়া নারীর অন্য কিছু হয় না। বিখ্যাত নারীবাদী ম্যাগাজিন সিজ-এর সম্পাদক রবিন মরগ্যান বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন ধর্ষণ সম্পর্কে। তিনি দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন, ‘যে যৌন সম্পর্কটির উদ্যোক্তা নারী নয়, নারীর সত্যিকার যৌনইচ্ছে থেকে যেটি ঘটে না, সেই যৌন সম্পর্কটি ঘটা মানেই ধর্ষণ ঘটা। ’
পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশে পুরুষের ইচ্ছেয়, পুরুষের আওতায় যে যৌনসম্পর্কটি ঘটে, তাতে বৈষম্য শুধু নয়, প্রকটভাবে অকথ্য অত্যাচার না থাকার কোনও কারণ নেই। সর্বত্র যেখানে বৈষম্য এবং পুরুষাধিপত্য, সেখানে তা থাকবেই। বন্ধ ঘরে বীভৎসতা ঘটিয়ে নাম তার লাভ মেকিং দিলেই যেন সাতখুন মাফ।
রবিন মরগ্যান বলেন, ‘রেপ ইজ দ্য পারফেক্টেড অ্যাক্ট অব মেইল সেক্সুয়ালিটি ইন এ পেট্রিআর্কাল কালচার। ইট ইজ দ্য আলটিমেট মেটাফর ফর ডমিনেশন, ভায়োলেন্স, সাবজুগেশন অ্যান্ড পজেশনস। ’
না, আমাদের নারীবাদীরা এমনভাবে বলেন না। কোনওকালেই বলেননি। পশ্চিমের নারীবাদীদের হাত থেকে খুব কম ধর্ষকই বেঁচে যেতে পারে। ওখানকার নারীরা বহুকাল সংগ্রাম করেছেন এই জঘন্য ঘৃণ্য নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে। কাউকে ছাড় দেননি।
আজ পশ্চিমের যে দেশগুলোয় নারীরা প্রায় পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে পারে, সেখানে প্রেমে, যৌনতায় নারীর উদ্যোগী এবং সক্রিয় হওয়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা। নারীই পুরুষকে পছন্দ করে প্রেমের জন্য, নারীই পুরুষকে শারীরিকভাবে কামনা করে, সেই কামনার কথা প্রকাশ করে এবং যৌনক্রিয়ায় নারীই সক্রিয় হয় বেশি।
এ দেশে নারী যত নিষিদ্ধ হবে, পুরুষের যৌনসাধ তত হৈ রৈ করে বাড়বে। যৌন সম্পর্কের জন্য নিষি নারীকেই পছন্দ করে পুরুষ। নারীবাদীরা বলেন, যৌন অধিকার অর্জনের কোনও দরকার নেই নারীর। দরকার শিক্ষার আর স্বনির্ভরতার। নারীবাদ দেশি ব্র্যান্ড। বটে। শিক্ষা আর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করেও যে সারা জীবন নারী থেকে যায় পুরুষের যৌনদাসী, সে কি তাঁরা জানেন না, নাকি মানেন না? নাকি তলে তলে পুরুষতন্ত্রের গোড়ায় জল সার দিয়ে তাজা রাখেন তন্ত্রটি!
নারীরা এ দেশে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে না। নারীদের কোনও অহংকার থাকতে নেই। সেই কবে ভোটাধিকার আন্দোলনের নেত্রী এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন বলেছিলেন, ‘উই আর, অ্যাজ এ সঙ্গে, ইনফিনিটলি সুপিরিয়র টু ম্যান। ’ ক’টা মেয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে এ কথা বিশ্বাস করে এবং বলে?
আমরা নারীরা পুরুষের চেয়ে সবদিক থেকে বড়। এ কথা বললে পুরুষ যেমন কৌতুকরসে হেসে ওঠে, নারীও হাসে। কেবল লিঙ্গে নয়, বিবেকে বুদ্ধিতে, বিচক্ষণতায়, বিদ্রোহে, বিস্ফোরণে, বীক্ষণে নারী চিরকালই পুরুষের চেয়ে ঊর্ধ্বে। কিন্তু শক্তিকে শেকলে বন্দী করে রাখা হয়েছে আজ হাজার বছর। সোজা এতকালের শেকল ছেঁড়া?
আমি মনে করি পুরুষবিদ্বেষ হলো একটি সম্মানজনক রাজনৈতিক আদর্শ, যে আদর্শে অত্যাচারিতের অধিকার আছে অত্যাচারী শ্রেণির বিরুদ্ধে ঘৃণা ছুড়ে দেওয়া। ক’জন বলে এমন কথা এদেশে? এখন তো লিবারেলিজমের যুগ। যত আপস করো, তত ভালো। যত মেনে নাও, তত তুমি সহিষ্ণু, তত তুমি শান্তিকামী। চিরকাল যারা অশান্তি করে, অশান্তি যাদের রক্তে, মস্তিষ্কের কোষে কোষে, তাদের সঙ্গে কি সত্যিকার কোনও শান্তি চুক্তি হয়, না, হতে পারে?
সেই কতকাল আগে মেরিলিন ফ্রেঞ্চ ‘দ্য উইমেনস রুম’ বইতে লিখেছেন, ‘পুরুষের প্রতি আমার অনুভূতি পুরুষ নিয়ে আমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সত্যি কথা বলতে কী, পুরুষের প্রতি আমার কোনও সহানুভূতি নেই। ডাখাও কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে এক ইহুদি যেমন কোনও তরুণ নািস সেনাকে পেটে গুলি খাওয়া অবস্থায় কাতরাতে দেখে নির্বিকার হেঁটে চলে যায়, তেমন করে আমি পুরুষ দেখি। আমি এমনকী প্রয়োজনও বোধ করি না কাঁধ শ্রাগের। আমি কেয়ার করি না। মানুষ হিসেবে লোকটি কী ছিল, কেমন ছিল, তার ইচ্ছে অনিচ্ছে এগুলো আমার কাছে কোনও বিষয় নয়। ’
