দিল্লির গণধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদ মানিষ রাগলো, এই প্রথম মানুষ ভীষণ রাগলো। নাকি জাগলো? জাগরণ কি এত সহজে ঘটে? তবে এ ঠিক, এই প্রথম হাজার হাজার ছেলে মেয়ে রাস্তায় নেমে মেয়েদের নিরাপত্তার দাবি করলো সরকারের কাছে। ধর্ষকদের ফাঁসি দিতে হবে, এমন দাবিও উঠছে। সরকারের পক্ষে ফাঁসি দেওয়া তো কোনও অসুবিধের ব্যাপার নয়। ফাঁসিতে ঝুটঝামেলা সবচেয়ে কম। এর চেয়ে সহজ কাজ আর কী আছে! কিন্তু ছেলেরা যেন মেয়েদের যৌনবস্তু হিসেবে না দেখে, শৈশব থেকে যেন মানুষ মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখে, এই ব্যবস্থা করাটা বরং সহজ নয়। এই কঠিন কাজটির দায়িত্বই তো সরকারকে দেওয়া উচিত।
অবশ্য শৈশবে তোতাপাখির মতো ‘নারী ও পুরুষের অধিকার সমান, নারীকে ছোটজাতের মানুষ ভাবিয়া অবজ্ঞা করিও না, তাহাদিগকে মারিও না, ধর্ষণ করিও না’ উচ্চারণ করলেই যে তা একেবারে মগজ অবধি পৌঁছবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। পৌঁছোলেও বাড়িতে বা বাড়ির বাইরে যখন ক্রমাগত শিশু-কিশোররা দেখতে থাকে যে পুরুষেরা মাতব্বর আর নারীরা নেপথ্যের লোক,তখন এই দেখার অভিজ্ঞতাই তাদের মগজের বাকি কিছুকে সরিয়ে নিজের জায়গা করে নেয়। যৌবনে পতিতা-অভিজ্ঞতা তাদের আরও একটি জ্ঞান মগজে ঢোকায়, ‘মেয়েদের শরীর নিয়ে যা ইচ্ছে তা করা যায়, শিশুকেও ধর্ষণ করা যায়। সমাজের খুব বেশি কেউ একে ঠিক অন্যায় বলেও মনে করে না’। স্ত্রীর বেলাতেও তাই, স্ত্রীকে ধর্ষণ করা আইনের চোখে অপরাধ হলেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখে মোটেও অন্যায় কিছু নয়। পণপ্রথা আইনের চোখে নিষিদ্ধ হলেও যেমন সমাজের চোখে নয়। পণপ্রথাই প্রমাণ করে নারী নিতান্তই নিচ, নিরীহ নিম্নলিঙ্গ, নির্বাক জীব, পুরুষকে উৎকোচ দিয়ে পুরুষের ক্রীতদাসি বনা ছাড়া তার আর গতি নেই।
বিবাহিত নারীর শরীরে নানারকম চিহ্ন থাকে জানান দেওয়ার যে সে বিবাহিত, কোনও প্রাণহীন ছবির ফ্রেমে যেমন লাল চিহ্ন দিয়ে লেখা থাকে ‘সোল্ড’, মেয়েদের কপালে, সিঁথিতে সিঁদুরের লাল চিহ্নই মেয়েরা যে বিক্রি হয়ে গেছে তা জানান দেওয়ার চিহ্ন। বিবাহিত মেয়েদের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি স্বামীর সম্পত্তি। বিবাহিত স্বামীরা কিন্তু কোনও অর্থেই স্ত্রীর সম্পত্তি নয়। এই সব হাজারো পুরুষতান্ত্রিক প্রথা অক্ষত রেখে এখন যদি মেয়েদের ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়, তাহলে কি ধর্ষণ বন্ধ হবে? এদিকে বলিউডের নিরানব্বই ভাগ ছবিতেই দেখানো হচ্ছে নারী যৌনবস্তু, টেলিভিশনেও একই বার্তা, খবরের কাগজ খুললেই আধন্যাংটো মেয়েদের ছবি, সবখানে মেয়েরা কেবল শরীর, নিভাঁজ নিটোল ত্বক, কেবল স্তন. কেবল যোনী, মস্তিস্ক হলেও মস্তিস্ক নয়, দার্শনিক হলেও দার্শনিক নয়, বিজ্ঞানী হলেও বিজ্ঞানী নয়, চিন্তক হলেও চিন্তক নয়, বুদ্ধিজীবী হলেও বুদ্ধিজীবী নয়। পুরুষ তাদের নাগালের মধ্যে পেলে ধর্ষণ করবে না তো বিজ্ঞান আর দর্শন নিয়ে আলোচনা করবে? মেয়েরা ছোট পোশাক পরুক, বা ন্যাংটো হোক, ধর্ষণ করার অধিকার কারও নেই– এ কথা পুরুষেরা জানে না তা নয়, জানে। কিন্তু এও তো তারা জানে যে পুরুষই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্তা!
পুরুষের পেশি বেশি, পুরুষের দেমাগ বেশি, পুরুষের সাহস বেশি, পুরুষ ঝুঁকি নিতে পারে বেশি, পুরুষের লজ্জা করা বা ভয় পাওয়া মানায় না, পুরুষেরা বীর, নির্ভিক, পুরুষের ক্ষমতা বেশি, গায়ের জোর বেশি, মনের জোর বেশি, পুরুষেরা পারে না এমন কিছু নেই — জন্মের পর থেকে তো তা-ই জেনে আসছে তারা! এসবই তো অনুক্ষণ শেখানো হয়েছে তাদের। ধর্ষণ করলে, পুরুষ মনে করে, পৌরুষের প্রমাণ দেওয়া হয়। সত্যি বলতে কী, পুরুষতন্ত্র নারীর শরীরকে যত ধর্ষণ করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি করছে মনকে। ধর্ষণ করছে মনের স্বাভাবিক বিকাশকে, মনের জীবনীশক্তিকে, প্রাণকে, প্রাণের উচ্ছাসকে, অসীম সম্ভাবনাকে, স্বপ্নকে,স্বাধীনতাকে। শরীরের ক্ষত শুকিয়ে যায়, মনের ক্ষত শুকোয় না।
শতাব্দীর পর শতাব্দী এমনই ঘটছে। বিবর্তিত হতে হতে চলেছি সব প্রাণীই। ক্রমশ ভালো থেকে আরো-ভালো, আরও-ভালো থেকে আরো-আরো-ভালো অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে মানুষ চলেছে বলেই মানুষ প্রজাতি টিকে আছে। একই প্রজাতিকে, শুধু যৌনাঙ্গ ভিন্ন হওয়ার কারণে, যদি অত্যাচার করতেই থাকে পুরুষেরা, তবে এই দুর্ভাগা মানুষ প্রজাতিই হয়তো একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ধর্ষণের ইচ্ছেকে যদি পুরুষেরা সংযত করতে না চায়, জোর খাটিয়ে আনন্দ পাওয়ার অভ্যেসকে যদি বিদেয় করতে না পারে, তবে মানুষের বিবর্তন ভালোর দিকে না এগিয়ে মন্দের দিকে এগোবে। মন্দের দিকে যাওয়া মানে বিলুপ্তির দিকে যাওয়া। হাতে গোণা খুব দুষ্ট কিছু প্রজাতি ছাড়া আর কোনও প্রজাতি নিজের প্রজাতির মেয়েদের দাবিয়ে রাখে না। গণধর্ষণ? মানুষ ছাড়া আর কোনও প্রজাতির চরিত্র এমন বীভৎস নয়।
মানুষ বুদ্ধিমান। বুদ্ধির নিদর্শন অনেক কিছুতে রাখছে। মঙ্গলগ্রহে অবধি মেশিন পাঠিয়ে দিয়েছে, কিন্তু ছোট্ট এই গ্রহে, সমতায়, সমানাধিকারে, সমমর্মিতায়, সমঝোতায় সুখে আর স্বস্তিতে নারী আর পুরুষের বাস করার পরিবেশ আজও তৈরি করতে পারছে না সে কি বুদ্ধি নেই বলে, নাকি ইচ্ছে নেই বলে? আমার তো মনে হয় ইচ্ছে নেই বলে। হ্যাঁ বুঝলাম, পুরুষের গায়ের জোর বেশি বলে ধর্ষণ করে। কিন্তু গায়ের জোরে তো আমরা সমাজটা চালাচ্ছি না, রাজ্যটা বা রাষ্ট্রটা চালাচ্ছি না। চালাচ্ছি বুদ্ধির জোরে। পুরুষেরা কি তাদের বুদ্ধি আর চেতনকে, বিবেক আর হৃদয়কে গণধর্ষণ করে বেহুঁশ করে রেখেছে? চেতনার নাড়ি টেনে বের করে ধর্ষণ করছে নিজেদেরই ভবিষ্যৎকে!
