দেখি একটু পিছনে রাণী দাঁড়িয়ে। কাটিহার না কোথায় বিহারের দিকে এর বিয়ে হয়েছে। আরে এসো এসো, বাধ্য হয়েই আমাকে বলতে হয়। বলতে বলতে আমি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করি। ওরাও পিছে পিছে আসে। তা আজকেই ফিরছ রাণী, কেমন? শ্বশুরবাড়ির খবর কী? যে খবরগুলি না জেনেও অন্যান্য দিনের মতো আজকের দিনটাও কেটে যেতে পারত, সেইগুলিই জানবার জন্যে আমাকে এই মুহূর্তে ভদ্রতার খাতিরে বিশেষ উৎসাহ দেখাতে হয়। রাণী এতসব প্রশ্নের উত্তরে একটু মুচকি হাসে। আজ সকালেই ফিরলে? ফিরেই সাত তাড়াতাড়ি আমার এখানে ছুটলে, মন কেমন করছিল?
এইবার রাণী যেন একটু গম্ভীর হল, পাশের টেবিল থেকে একটা বই তুলে নিয়ে আলগোছে পাতা ওলটাতে লাগল। বাণী কিন্তু এর মধ্যেই একটু ফিক করে হেসে ফেলল। রাণী ধমকে উঠল, থাম ফাজিল কোথাকার! আসলে ধমকটা আমার উদ্দেশেই। সুতরাং আমাকে নিরত হতে হল। এবং সেই মুহূর্তেই লক্ষ করলাম রাণী আর বাণী দুইজনে চোখে চোখে কী একটা কথা আলোচনা করে নিল। আমার অন্তরাত্মায় আমি অনুভব করলাম আমি অবিলম্বে সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনার মুখোমুখি হব।
এইবার বাণী কথা বলল, দিদি আজই ফিরে যাচ্ছে। ওর দেওরের বিয়ে, কিছু কেনাকাটি করতে হবে। তারপর রাত্রেই ফিরে যাবে।
সে কী, আজকেই ফিরে যাবে? আমাকে কিঞ্চিৎ বিস্মিত হতে হয়।
এইবার রাণী বলল, , আর সেইজন্যেই তুমি অনেকদিন আমাদের বাসায় যাও না, আজ দুপুরে আসবে, ওখানেই খাবে। এবং বাণী যোগ করল, জানো খোকনদা, আমি রান্না করব। আমি কেমন সুন্দর রান্না করতে শিখেছি।
আমার মাথায় বজ্রাঘাত হয়। যা ভেবেছি ঠিক তাই হল। রাণী-মণির বেলায় যা হয়েছে, এবারও বাণীর বেলাতে তাই হল। বাণীর প্রথম রান্না, তার স্বাদ আমাকেই সর্বাগ্রে গ্রহণ করতে হবে। আমিই এদের এই প্রাণহরা অভিজ্ঞতার সবচেয়ে সুলভ শিকার। যা এড়াব বলে কালকেই মনে-প্রাণে প্রতিজ্ঞা করেছি, এই দুই তরুণী প্রতিবেশিনীর সামনে কিছুতেই সেটা করা যাবে না সেটা আমি এখনই বুঝলাম। না, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমাকে আবার সেই একই দৃশ্যে অভিনয় করতে হবে।
এই তো রাণী আমার সামনে বসে রয়েছে। সাধারণ সুন্দরী, নববিবাহিতা। চেহারায়, আচরণে একটা স্মিত কোমলতার ছাপ রয়েছে। কিন্তু একে দেখলে কে বুঝতে পারবে এর হাত দিয়েই বেরোতে পারে হাত-বোমার চেয়েও মারাত্মক সেই সব খাবার। সেই মানকচুর চপ। শরীর এখনও রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। যারা আমাকে সম্প্রতি চেনেন, তারা জানেন না, চিরকাল আমার কণ্ঠস্বর এমন ছিল না। এককালে আমি আপনাদের মতোই, সাধারণ মানুষদের মতোই, কোমল কণ্ঠস্বরে কথা বলতে পারতুম। কেউ কি বিশ্বাস করবে, করা কি সম্ভব যে আমার সেই অমায়িকতা এই একটি কোমল-দর্শনা যুবতীর হাতে নিহত হয়েছে!
তবে রাণীর চেয়ে মণি আরও সাংঘাতিক ছিল। এই পৃথিবীতে অনেক খাদ্যদ্রব্য নিশ্চয়ই আছে এবং আমরা সকলেই সেরকম খাবার লোভে পড়ে বা বিপদে পড়ে গ্রহণ করে থাকি যার জন্যে যকৃৎ, প্লীহা বা অন্ত্রাশয়ে নানা অসুবিধা দেখা দেয়। কিন্তু বিশ্বাস করুন আর নাই করুণ মণির তৈরি এক ধরনের পরটা খেয়ে আমার হাঁটুতে, কাঁধের জোড়াতে এবং দাঁতের মাড়িতে ভয়ংকর ব্যথা হয়েছিল, দুহাতের শিরা এক সপ্তাহ ফুলে ছিল, একুশ দিন অফিস যেতে পারিনি। জোড়াসন হয়ে মেজেতে খেতে বসেছিলাম। এদের বোনেদের এবং মায়ের অনুরোধে উপরোধে, বলা উচিত বলপ্রয়োগে, হাঁটু গেড়ে মেজেতে কাঁধের ও হাতের শিরায় শিরায় এবং দাঁতের মাড়িতে শরীরের সমস্ত শক্তি নিবিষ্ট করে পর পর চারটে খণ্ড গলাধঃকরণ করতে হয়েছিল এবং খেয়ে আর উঠতে পারিনি, মেজেতেই শুয়ে পড়েছিলাম। এদের ধারণা সেটা ভোজনাধিক্যবশত, আমার ধারণা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। পরে অবশ্য রোগশয্যায় মণি আমাকে বলেছিল, খাবারটা অবশ্য ভালই হয়েছিল, কিন্তু খোকনদার অতটা খাওয়ার কি দরকার ছিল?
এবং মণির কাছেই তার প্রস্তুত-প্রণালী শুনেছিলাম। এখন ঠিক স্পষ্ট মনে নেই তবে এই ঘটনার প্রতি সন্দেহশীল পাঠকদের (এবং পাঠিকাদের) একটু নমুনা দিচ্ছি। ধৈর্য সহকারে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। প্রথমেই বলা উচিত যে পরটাগুলি গম বা যব, এমনকী কোনও শস্যবীজ থেকেই তৈরি হয়নি, এগুলি ফলজাত। আরেকটু খোলসা করলে হয়তো ভাল হয়। আমের আঁটির ভেতরের সাদা সার গুঁড়ো করে কঁঠালের বিচির সঙ্গে সেটা সেদ্ধ করে রোদ্দুরে শুকনো হয়। তারপর জল দিয়ে চটকে মেখে আবার রোদ্দুরে শুকানো হয়। তারপর একে উপাদেয় করবার জন্য কিঞ্চিৎ মশলা এবং খাদ্যপ্রাণযুক্ত করবার জন্যে পুঁইশাক নিংড়ে তার রস দিয়ে আবার শুকানো হয়। বিজ্ঞানের শিক্ষা এবং মণির উদ্ভাবনী শক্তি দুই-এ মিলে এই মারাত্মক পরিণতি।
সেই রাণী-মণির বোন বাণী, তার হাতের রান্না খেতে হবে আমাকে আবার আজ দুপুরে এবং আমি আবার স্পষ্ট প্রত্যক্ষ করলাম, ওদের সেই ছোট ছোট বোনেরা যারা প্রতিদিন বড় হচ্ছে এবং কাল হোক, পরশু হোক, শাড়ি পরা শুরু করবে আর আবার সেই সঙ্গে সেই রান্না আর আমি। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। একটা কিছু কোনও একটা প্রতিবিধান, একটা প্রতিকার করতেই হবে। বছরের পর বছর এই অত্যাচার আর নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে আমি নিজেকে ঠেলে দিতে পারি না। আজ আবার আমার সেই প্রভুভক্ত কুকুরটির কথা মনে পড়ল। রাস্তা থেকে এনেছিলাম বাচ্চা অবস্থায়, তারপরে শত অপমানে, প্রহারেও গৃহত্যাগ করেনি। মণি একবার এক ধরনের পোলাও তৈরি করেছিল। কী দিয়ে তৈরি করেছিল বলতে পারব না, কিন্তু তৈরি করে একটা ঠোঙায় করে রুমালে বেঁধে দিয়ে বলেছিল, খোকনদা, এটা নিয়ে যাও। আজ খেয়ো না। দু-একদিন পরে খাবে। যত বাসি হবে ততই মুখরোচক হবে। খাবারটি বাসায় এনে আমার টেবিলের উপর রেখেছিলাম, পরদিন সকালে সেই ঠোঙাটি মুখে করে আমার প্রিয় কুকুরটি হঠাৎ ঘরের বাইরে চলে গেল, সেই যে গেল, আর এল না, চিরদিনের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। পরে একবার পাড়ার বাইরে বহুদুরে একটা রাস্তায় হঠাৎ কুকুরটি দেখতে পেয়েছিলাম, কিন্তু আমাকে দেখেই এত ভীত, আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে গেল যে বলার নয়।
