গম্ভীর চিন্তান্বিত মুখে বটেশ্বরবাবু বললেন, না। না নরেনদা, আপনি ঠিকই বলেছেন।
গ্রাম প্রধানের অভিমত পেয়ে নরেনবাবু এবার উঠলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উদয় হলেন সুরেনবাবু। তারও বলবার কথা কিছু কম নয়। তিনি আবার কৈশোরে একই স্কুলে বটেশ্বরবাবুর সহপাঠী ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বটেশ্বরবাবুর তুই-তোকারির সম্পর্ক। তিনি সুরেনবাবুর সব কথা শুনে কিছুক্ষণ গম্ভীর চিন্তান্বিত মুখে থেকে তারপর তাঁকে বললেন, তুই ঠিকই বলেছিস।
অতঃপর সন্ধ্যার দিকে এবং তারপরে একটু রাতের দিকে এলেন যথাক্রমে ধীরেনবাবু ও। বীরেনবাবু। তাঁদের কথাও খুবই মনোযোগ দিয়ে শুনলেন বটেশ্বরবাবু এবং সব শোনার পরে আলাদা করে দুজনকেই বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ।
বটেশ্বর গৃহিণী এতক্ষণ ঘরের মধ্যে কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে স্বামীর কথাবার্তা শুনছিলেন। এবার শেষ ভাই মানে বীরেনবাবু চলে যাওয়ার পরে গৃহিণী বারান্দায় এসে স্বামীকে বললেন, ওরা চার ভাই, চাররকম কথা বলল। আর তুমি সবাইকে বললে, ঠিকই বলেছ। এতে চক্রবর্তী বাড়ির গোলমাল আরও বেড়ে যাবে। এটা তুমি মোটেই ভাল করলে না। অন্ধকার বারান্দায় তক্তপোশে বসে একটা বিড়ি খাচ্ছিলেন শ্রীযুক্ত বটেশ্বর প্রধান। শেষ সুখটান দিয়ে বিড়িটা উঠোনে ফেলে দিয়ে এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে নির্বিকার কণ্ঠে তিনি গৃহিণীকে বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ।
একটি অখাদ্য গল্প
আমার এ পথে হাঁটা আবার বন্ধ করতে হবে। মনে মনে এই কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরছিলাম। আজ সকালবেলাতেই প্রথম লক্ষ করলাম বাণী শাড়ি ধরেছে। প্রথম বয়সের শাড়িতে মেয়েটাকে ভালই দেখাচ্ছিল, এর দিদিদের মতোই বলা যায় কিংবা তাদের চেয়েও রাণী, মণি দুজনের চেয়েই হয়তো একটু বেশিই সুন্দরী, কিন্তু আমাকে এ পথে হাঁটা বন্ধ করতে হবে।
আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সদরে ট্রামরাস্তার এইটাই সোজা পথ, কিন্তু আবার সেই বাড়ির পেছন ঘুরে সেই উলটোপথ, সেইটাই ধরতে হবে। না, বয়স হয়েছে আর ধাক্কা সামলাতে পারব না। মনে মনে প্রথম যৌবনের সেই দুঃসাহসী দিনগুলির কথা ভাবতে একটু বেদনা, একটু দুঃখও যেন হচ্ছিল। তখন কত কী করা যেত, ওর দিদিদের রাণী-মণিদের আমি থোড়াই তোয়াক্কা করেছি। কিন্তু বয়েস কিছু বাড়ল, একটু সমঝে চলতে হবে।
খোকনদা, এই খোকনদা…, কখন থেকে ডাকছি, মোটেই সাড়া দিচ্ছ না! বুকটা আঁতকে উঠল। পিছনে ফিরে দেখি যাকে এড়ানোর জন্যে এত পরিকল্পনা এত বুদ্ধির মারপ্যাঁচ, ঘোরালো সড়ক, সেই মেয়েই ছুটতে ছুটতে প্রায় পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে। গরমের দিনের সকাল বেলা। এইটুকু ছুটে এসে কপালে ঘামের ফোঁটা জ্বল জ্বল করে জ্বলছে, কঁপতে কাঁপতে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। কয়েকটা স্বচ্ছ তরল স্বেদবিন্দু। শাড়ির বিব্রত বেসামাল ভঙ্গিটা, সব মিলিয়ে বাণীকে যেন অস্বীকার করা যায় না। আমার বুক কাঁপতে লাগল। আমি জানি, জানি এখনি অথবা আগামী কাল ও সেই মারাত্মক প্রস্তাব করবে, এই শাড়ি পরার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রস্তাব সেই আমন্ত্রণের অধিকার ওর জন্মেছে একদিন ওর দিদিদের মতোই।
রাণী-মণির হাত থেকে আমি পরিত্রাণ পাইনি, এবারেও হয়তো পাব না। কিন্তু আর কতকাল! আর বাণীই যদি শেষ হত তাহলে হয়তো চোখ বুজে ঝাঁপিয়ে পড়া যেত। কিন্তু আরও ছোট, আরও ছোট–অনেক, বাণীর বোনেদের সংখ্যা অর্থাৎ ভুবনবাবুর, আমার প্রতিবেশীর, মেয়েদের সংখ্যা আমি শুনে দেখিনি, হয়তো ভুবনবাবুও গুনে দেখেননি। এরা প্রত্যেকে বড় হবে, প্রত্যেকেই মণিরাণীবাণীর মতো একদিন পল্লবিনী হবে কিন্তু কতকাল, আর কতকাল আমি তাদের প্রথম অভিজ্ঞতার শিকার হব। মনের মধ্যে একটা বিদ্রোহের ভাব দেখা দিয়েছে কিন্তু এইটুকু মেয়ের সামনে সেটা দমন করতে হল।
খোকনদা, একেবারে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলে? তুমি কতদিন আমাদের বাসায় আস না। মা বলছিল, ছোড়দি সেদিন শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছিল, তোমার খোঁজ করলে। আমি তোমাকে ডাকতে গিয়েছিলাম। তুমি বাসায় ছিলে না। রাতদিন বাইরে বাইরে কোথায় এত টো-টো করে ঘোরো! বেশ পাকা গিন্নির মতো কথা বলতে লাগল বাণী। তারপর হঠাৎ কথা ঘুরিয়ে বলল, দ্যাখো আমি শাড়ি পরেছি, বেশ ভাল দেখাচ্ছে না! বলেই একটু লজ্জিত হয়ে পড়ল, কথাটা একটু ঘুরিয়ে শাড়ির আঁচলটা বাঁ হাতের একটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে বলল, বাবা কিনে দিয়েছে, শাড়িটা বেশ সুন্দর, তাই না!
এসব কথায় আমার কোনও আপত্তি নেই, আমি শুধু মূল প্রস্তাবটির আশঙ্কা করছিলাম, বললাম, শাড়িটা বেশ সুন্দর, আর তুমিও মন্দ না।
একটু মুখ ঘুরিয়ে হেসে ফেলে বাণী বলল, কিন্তু তুমি কবে আসবে আমাদের বাড়িতে? মুখে বললাম, যেদিন আজ্ঞা করবে সেদিনই। মনে মনে অন্য কুমতলব ভাজতে লাগলাম। তখনকার মতো বাণী চলে গেলো।
যদিও ধরেই নিয়েছিলাম যে আজ-কালের মধ্যেই বাণী আসবে, আর আসবে সেই সাংঘাতিক মর্মান্তিক প্রস্তাব, কিন্তু সে যে এত তাড়াতাড়ি সেটা আশা করিনি। পরদিন সকালে ঘুম থেকে আমি উঠি সাড়ে নটায়, তখন ছটা–মানে আমার মধ্যরাত্রি, সেই সময়ে হাঁকাহাঁকি দরজায় কড়া নাড়া, প্রায় ভেঙে ফেলবার উপক্রম। উঠে দরজা খুলতে হল। খোকনদা, বড়দি এসেছে। আজ শেষ রাত্রিতেই ফিরেছে।
