নস্যির যুগ শেষ।
কিন্তু আমার গল্প এখনও একটু বাকি আছে। আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত ঘটনাটা।
আমাদের ওই ছোট শহরেও মেয়েদের একটা আলাদা কলেজ ছিল। সেই কাদম্বিনী গার্লস কলেজ থেকে সরসীপিসি সদ্য আই-এ পরীক্ষা দিয়েছে। অল্প কয়েকদিন পরেই আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা।
পরীক্ষার অল্পদিন আগে বুঝতে পারলাম পড়াশুনো যা হয়েছে ঠিক আছে, কিন্তু পরীক্ষার আগে একবার ভালভাবে ঝালাই করে নিতে না পারলে সুবিধে হবে না। তবে সে জন্যে এখন যা সময় আছে। তাতে রাত জাগা দরকার। কিন্তু চিরকালই আমি খুব ঘুমকাতুরে, সন্ধে সাড়ে আটটা বাজতে না বাজতে আমার চোখ ঘুমে বুজে আসে।
সরসীপিসির কাছে গেলাম। এক নিমেষে এই সমস্যার সমাধান করে দিলেন দিনি। বললেন, তুই মন্টুদার দোকানে চলে যা, দু পয়সার নস্যি কিনে নিয়ে আয়। এক টিপ নস্যি নাকে দিলে সারারাত ঘুম আসবে না।
আমি কিঞ্চিৎ সন্দেহ ও সংস্কারাচ্ছন্ন চোখে তাকাতে সরসীপিসি বললেন, কোনও দোষ হবে না। আমিও তো বাবার ডিবে থেকে পরীক্ষার আগে নস্যি নিয়ে রাত জাগি।
আমি তখন একটা নতুন অসুবিধের কথা বললাম, নস্যি রাখার কৌটো তো আমার নেই। সরসীপিসি কী ভেবে একটু ঠোঁট টিপে হেসে বললেন, আমার কাছে একটা কৌটো আছে। সেটায় তোর হয়ে যাবে।
এই বলে সরসীপিসি তার পড়ার টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা কৌটো বার করে দিলেন। দাদার ছুঁড়ে মারা সেই গ্রামাফোন পিনের চৌকো কৌটোটা।
একটু পরে কৌটোটা নিয়ে কাছারির মোড়ে মন্টুদার দোকানে গেলাম নস্যি কিনতে। নস্যির তখন বেশি বিক্রিবাটা নেই। কৌটোর নীচে সামান্য তলানি পড়ে আছে। মন্টুদা বললেন, দু পয়সার নস্যি হবে না। তুমি এখন এটুকু দিয়ে কাজ চালাও। দুয়েকদিন পরে দোকানে নস্যি এলে পরে এসে। দু-পয়সার নস্যি নিয়ে যেও।
সেই চৌকো কৌটোয় নস্যিটুকু পুরে বাড়ি চলে এলাম। কিন্তু নস্যি আমার নাকে দেওয়া হয়নি। হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের মধ্যে এক টিপনস্যি ধরে রাখলেই যথেষ্ট, এর চেয়ে বেশি আমার লাগে না। নাকে দেওয়ার দরকার নেই।
ওই তলানি নস্যটুকুতেই ম্যাট্রিক পরীক্ষা পার হয়ে গেল। মন্টুদার দোকান থেকে আর দু পয়সার নস্যি নিয়ে আসার দরকার হল না।
তারপর ম্যাট্রিক পাশ করে ছোট শহরের থেকে মহানগরে চলে এলাম। সেই চৌকো কৌটোর। তলায় সামান্য এক ফোঁটা ঝঝ চলে যাওয়া, বিবর্ণ হয়ে যাওয়া নস্যি। আজও কৌটোটা হাতে নিলেই আমার হয়ে যায়। নাক পর্যন্ত নস্যি পৌঁছনোর দরকার পড়ে না। ইন্টারমিডিয়েট, বি এ, এম এ, চাকরির। পরীক্ষা ওই একই নস্যি ভরসা করে পার হয়ে গেলাম।
তারও পরে তিরিশ চল্লিশ বছর হয়ে গেল। নস্যির কৌটোটা কিন্তু এখনও হারায়নি। একটু চেষ্টা করলেই দেরাজে না আলমারিতে খুঁজে পাব। পুরনো, দোমড়ানো কৌটোর গায়ে অস্পষ্ট হয়ে আসা কবেকার কুকুর আর চোঙার ছবি।
নামাবলী
প্রথমে নাম ছিল কালাচাঁদ হুই। সবাই কালাচাঁদ নামেই ডাকত। কাছাকাছি নিকটজন, পাড়াপ্রতিবেশী অবশ্য বলত কালু, কেউ কেউ আদর করে কেলো।
গুছাইতগঞ্জের নয়নচাঁদ হুইয়ের একমাত্র ছেলে কালাচাঁদ। সাত মেয়ের মধ্যে একমাত্র ছেলে। সাত ভাই চম্পার ঠিক উলটো আর কি! সাত ভাই চম্পা এক বোন পারুল না হয়ে এক ভাই চম্পা সাত বোন পারুল।
পারুল বোনেদের যথাসময়ে যথাস্থানে বিয়ে হয়ে গেছে। তাদের নিয়ে আমাদের কোনও চিন্তার কারণ নেই।
আমাদের এই গল্পে সমস্ত সমস্যা ওই এক ভাই চম্পা কালাচাঁদ হুইকে নিয়ে।
নয়নচাঁদের উপযুক্ত সন্তান কালাচাঁদ। গুছাইতগঞ্জের হুইবংশের নয়নমণি, শিবরাত্রির সলতে কালাচাঁদ হুই তার এই সাদামাটা নাম নিয়ে জীবনের প্রথম সতেরো আঠারোটা বছর বেশ নির্বিবাদেই অতিবাহিত করেছিল।
নামের মধ্যে যে কোনও রকম নতুন-পুরনো, খারাপ-ভাল থাকতে পারে এ ধারণা কালাচাঁদের মাথায় ঢোকেনি ওই আঠারো বছর বয়েস পর্যন্ত।
মুশকিল হল কলেজে ভরতি হয়ে। গুছাইতগঞ্জ হাইস্কুলে কেই বা মাথা ঘামিয়েছে কালাচাঁদের নাম নিয়ে, আর যারা মাথা ঘামাবে তাদের নামেরই বা কী ছিরি। যজ্ঞলাল অথবা গজেশ্বর কী করে বুঝতে পারবে কালাচাঁদ নামটা তাদের থেকে খারাপ, না ভাল।
গুছাইতগঞ্জের লোকেদের নাম প্রায় সকলেরই এই রকম। হেডমাস্টারমশায় ধনুকনাথ কাঞ্জিলাল আর পঞ্চায়েত সভাপতি ভাবল পাল মশায়ের নাম দুটো শুনলেই বাকি আপামর গুছায়েতগঞ্জবাসীর নাম সম্পর্কে মনে কোনও সংশয় থাকে না।
মাধ্যমিক পরীক্ষার বছর প্রিটেস্টের আগে শ্রাবণ মাসে কালাচাঁদ কলকাতায় মামার বাড়ি এসেছিল মামাতো বোনের বিয়েতে। সেখানে কালাচাঁদ হুই নামটা নিয়ে তাকে খুব ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। নব জামাতা অর্থাৎ মামাতো জামাইবাবুর সঙ্গে বাসরঘরে পরিচয় হতেই ঠাট্টা করে বলেছিলেন, এটা নিশ্চয় তোমার নাম নয়, তোমার নামের ওরফে। এরকম নাম তো ছদ্মনাম না হয়ে যায় না।
নতুন জামাইবাবুর এই মন্তব্য শুনে বাসরঘর-ভরতি ফাজিল মেয়েরা হই হই করে হেসে উঠেছিল। লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল কালাচাঁদ।
নতুন জামাই লোকটি খারাপ নয়। তার ওই মন্তব্যে এই গ্রাম্য, সরল ছেলেটি একটু আহত হয়েছে। এটা ভেবে সে পরদিন বাসিবিয়ের সকালে কালাচাঁদের সঙ্গে যেচে আলাপ করে। তারপর পরামর্শ দেয়, তুমি তো এখনও মাধ্যমিক পরীক্ষাই দাওনি। এখন তো নাম পাকাপাকি হয়নি। টেস্টের পরে। মাধ্যমিক পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করার সময় নিজের পছন্দমতো নাম বেছে বসিয়ে দিলেই হবে।
