দাদা কিন্তু রাগ করল না, দুঃখ পেল না মৌলভি সাহেবের আচরণে, বরং এই এক চড়ে দাদা নিজে থেকেইনস্যি নেওয়া ছেড়ে দিল। আমাদের দালানের বারান্দায় পুব দিকে মুখ করে জোরে ছুঁড়ে ফেলে দিল সেই নস্যির কৌটো। দাদার নস্যির কৌটোটা ছিল একটু অন্যরকম, চৌকো আকারের গ্রামোফোন পিনের খালি কৌটো, যা ওপরে সেই ভুবন বিখ্যাত সংগীতপিপাসু কুকুর ও গ্রামোফোনের চোঙার ছবি। আগের গোল টিনের কৌটোটা সেদিন আবিষ্কার হওয়ার পরে বাজেয়াপ্ত হওয়ায় দাদা তারপর থেকে এই কৌটোটা ব্যবহার শুরু করে, এটার সুবিধে এই যে এর বিসদৃশ আকারের জন্যে এটাকে নস্যির কৌটো বলে হঠাৎ সন্দেহ করা কঠিন।
দাদার মনে কী ছিল জানি না। ভর সন্ধেয় দালানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাদা সজোরে কৌটোটা উঠোনের ওপর দিয়ে ছুঁড়ে দিল। ওপারে জানলার ধারে তন্ময় হয়ে বসে সরসীপিসি লণ্ঠনের আলোয় লেখাপড়া করছিলেন। কী করে যে কী হল, সেই কৌটো কোনাকুনি জানলা দিয়ে ঢুকে লাগল সরসীপিসির ডানচোখের ঠিক ওপরে। তারপর একেবারে যাকে বলে রক্তারক্তি কাণ্ড। সরসীপিসির ডান ভুরুর ওপরে কেটে গিয়েছিল। ঠিক কতটা কেটে গিয়েছিল বলা কঠিন, কারণ আমাদের বাড়ি থেকে কেউই সেটা দেখতে যায়নি বা খোঁজ নিতে যায়নি।
সেই সন্ধ্যায় হাত-পা ছুঁড়ে সরসীপিসির আর্তনাদ, সরসীপিসির হাত ছোঁড়ার ফলে টেবিল থেকে হ্যারিকেন লণ্ঠনটি পড়ে গিয়ে ভেঙে যাওয়া, কিঞ্চিৎ নিস্তব্ধতা, তারপর হই হট্টগোল, চিৎকার চেঁচামেচি, শুধু থানা-পুলিশ হয়নি।
তবে সেদিন আমরা টু শব্দটিও করিনি। করার উপায়ও ছিল না। শুধু ঠাকুমা গোপনে দাদাকে শহরেরই অন্য এক পাড়ায় ঠাকুমার এক দূর সম্পর্কে বোনের বাড়িতে চালান করে দিয়েছিলেন।
আম-পাকার মরশুম চলছে সেটা। এর আগে কয়েকদিন ধরেই দু বাড়িতে ওই লালবাগি তথা কমিগাছের আম নিয়ে অষ্টপ্রহর খিটিমিটি গালাগাল বাকবিতণ্ডা চলছিল। আজ দাদার নস্যির কৌটো ঘেঁড়ায় এবং তজ্জনিত সরসীপিসির আঘাতে ব্যাপারটা চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছল।
পুরো গ্রীষ্মটা এই রকম গেল। ওই একই ধারাবাহিকতায়। তারপর একদিন গাছের সেষ আমটি ফুরোল। এরই মধ্যে একদিন অম্বুবাচীর শেষদিন শেষ রাতে শহরবাসী হঠাৎ ঘুমঘোরে বিছানায় জেগে উঠে শুনতে পেল শোঁ-শোঁ, শোঁ-শোঁ শব্দ; সম্বৎসর যেমন হয়, যমুনার জল তোড়ের মুখে শহরের পাশের ছোট নদী ছাপিয়ে শহরের ভেতরের খালের মধ্যে ঢুকছে তারই উচ্ছাস।
এক সপ্তাহের মধ্যে বেনোজল রাস্তাঘাট পুকুর সব একাকার করে দিয়ে শহরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। আমাদের বাড়িগুলো ছিল ডাঙা জমিতে, নাবাল জমির উঠোন ডুবিয়ে প্রথমদিন সরসীপিসিদের উঠোনে তারপর দিন আমাদের উঠোনেও জল ঢুকে গেল। প্রথমে পায়ের পাতা ডোবা জল, তারপর আধ হাঁটু, হাঁটু শেষপর্যন্ত আধ কোমর জল। তবে জলের দেশের লোক আমরা, আমাদের ঘর-দালানোর ভিটে এত উঁচু করা হত যে কখনওই শোয়ার ঘরের মধ্যে জল ঢুকত না। গোয়ালঘর, ভাড়ারঘর, চেঁকিঘর এসবের ভিটে উঁচু হত না, এসব ঘরে জল ঢুকে যেত।
সরসীপিসিদের একটা দুধের গাই আর বাছুর ছিল। আমাদেরও দুয়েকটা গোরু ছিল। গোয়ালঘরে জল ঢুকতেই আমাদের গোরুগুলোর সঙ্গে বিনা বাক্যব্যয়ে সরসীপিসিদের গাইবাছুর আমাদের বাইরের বারান্দায় স্থানান্তরিত হল।
সরসীপিসির বাবা দেলদুয়ারের গজনভিদের সদর সেরেস্তার নায়েব ছিলেন। তার এক প্রজা বর্ষার ফল এক ধামা অম্লমধুর নটকা দিয়েছিল, তার অর্ধেক আমাদের বাড়িতে এল। ইতিমধ্যে বর্ষার জলের তোড়ে দু বাড়ির ভেতরের দরজা আবার খুলে গেল।
সরসীপিসিদের রান্নাঘরের বারান্দায় অল্প জল উঠেছিল। একদিন সন্ধ্যার দিকে নোয়াঠাকুমা সেই বারান্দা থেকে একটা বড় বেতের ধামা চাপা দিয়ে একটা বেশ বড়, অন্তত তিন চার সের কাতলা মাছ ধরে ফেললেন। বর্ষার জলে মিউনিসিপ্যালিটির পুকুর উপচিয়ে সব বড় বড় মাছ বেরিয়ে গিয়েছিল। এটা তারই একটা।
সেদিন রাতে আমাদের বারান্দায় রীতিমতো ফিস্টি হল। অনেকদিন পরে পেতলের ডুমলণ্ঠনটা মেজে ঘসে বারান্দায় টানায় ঝুলিয়ে দেওয়া হল। সারা সন্ধ্যা ধরে তার আলো দুলতে লাগল উঠোনের জলে।
সামান্য আয়োজন; খিচুড়ি, দু চামচে করে খাঁটি গাওয়া ঘি আর কাতলামাছ ভাজা। স্পেশ্যাল আইটেম ছিল কাতলামাছের কাটার ঝাল-চচ্চড়ি। গাছকোমর করে শাড়ি বেঁধে সারা সন্ধ্যা বসে নিজের হাতে তরকারি কুটে, মশলা বেটে সরসীপিসি সেই চচ্চড়ি রাঁধলেন, মাছের কাটার সঙ্গে কচুর লতি, মিষ্টি কুমড়ো আর বরবটি দিয়ে। এখনও তার স্বাদ জিবে লেগে আছে।
সরসীপিসি যখন রান্না করছেন, কাঠের উনুনের গনগনে আঁচে তার মুখটা লাল হয়ে উঠেছিল, ঘামের বিন্দুতে ভরে গিয়েছিল। হঠাৎ দেখি ঠাকুমা একটা ভিজে গামছা নিয়ে মুখটা মুছিয়ে একটা লণ্ঠন তুলে মুখটা খুব ভাল করে নিরীক্ষণ করলেন। অবিবাহিতা কুমারী মেয়ে সেই যে নস্যির কৌটোর আঘাত লেগেছিল, কোথাও খুঁত হয়ে গেল নাকি?
এইভাবে দিন চলে গেল, মাস, বৎসর। এখন মনে হয় যেন যুগের পর যুগ।
দাদা একাই যে নস্যির কৌটো ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল তা নয়। অনেকেই নস্যি নেওয়া ছেড়ে দিল। সদর হাসপাতালের বড় ডাক্তার মেজর মফিজুল্লা সাহেব নিজেই নাকে নস্যি নিয়ে ক্যানসার হয়ে মারা গেলেন। নস্যির রমরমা চলে গেল। অনেকে টেক্কা বিড়ি খাওয়া আরম্ভ করলেন,নীল সুতো দিয়ে বাঁধা, ছোট ছোট কড়া বিড়ি। পয়সাওলা কেউ কেউ কঁচি সিগারেট ধরলেন।
